মানসিক রোগ ও চিকিৎসা - অর্গানন অব মেডিসিন, তৃতীয় বর্ষ - ষষ্ঠ অধ্যায়

 ষষ্ঠ অধ্যায়
মানসিক রোগ ও চিকিৎসা
অর্গানন অব মেডিসিন 
তৃতীয় বর্ষ -   ষষ্ঠ অধ্যায়



মানসিক রোগ ও চিকিৎসা (২১০-২৩০)

অনুচ্ছেদ নং- ২১০
                        পূর্বোক্ত একদৈশিক বলে খ্যাত রোগ সমূহের মধ্যে প্রায় সবগুলোই সোরা বিষ হতে সৃষ্টি। এই সকল ক্ষেত্রে একক সাধারণ এবং সুস্পষ্ট লক্ষণের প্রভাবে অন্যান্য লক্ষণসমূহ আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সেজন্যই এদের আরোগ্য করা দুঃসাধ্য। মানসিক রোগসমূহ এই প্রকৃতির। অন্যান্য রোগ হতে এগুলোর কোন বিশেষ পার্থক্য নেই, কারণ সর্বপ্রকার তথাকথিত দৈহিক রোগই রোগীর মানসিক প্রকৃতি সর্বদা পরিবর্তিত হয়ে থাকে। অতএব যে সকল রোগী আমরা দেখি তাঁদের প্রত্যেকটির ক্ষেত্রেই রোগের যথার্থ আলেখ্য অংকন করে সদৃশ বিধান মতে চিকিৎসা করে সফলতা অর্জন করার সংকল্প আমাদের মধ্যে থাকে তাহলে রোগ লক্ষণ সমষ্টির মধ্যে রোগীর মানসিক অবস্থার প্রতি আমাদের বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।

অনুচ্ছেদ নং- ২১১
                ইহা খুবই সত্য কথা যে রোগীর মানসিক লক্ষণই বেশির ভাগ সদৃশ ঔষধ নির্বাচনের প্রধান অবলম্বন হিসাবে পরিগণিত হয়। কারণ খুব নিশ্চিতভাবে চরিত্রগত লক্ষণ বলেই তা কোন যথার্থ অনুসন্ধানী চিকিৎসকের দৃষ্টি এড়াতে পারে না।

অনুচ্ছেদ নং- ২১২
                সর্ব প্রকার রোগের প্রধান বৈচিত্র স্বরূপ এ প্রকৃতিগত এবং মানসিক বিকৃতি সম্বন্ধে রোগ আরোগ্যকারী বস্তু সমূহের স্রষ্টাও বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন কারণ পৃথিবীতে এমন কোন ঔষধ নেই যা পরীক্ষাকারী সুস্থ ব্যক্তির প্রকৃতিতে ও মানসিক অবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধন করতে অপারগ। প্রত্যেকটি ঔষধই বিভিন্নভাবে ইহা করে থাকে।

অনুচ্ছেদ নং- ২১৩
                অতএব প্রত্যেকটি রোগীর ক্ষেত্রে এমন কি অচির রোগীর ক্ষেত্রেও আমরা যদি অন্যান্য লক্ষণের সঙ্গে রোগীর মানসিক ও প্রকৃতিগত পরিবর্তন লক্ষ্য না করি এবং রোগীর যন্ত্রণা দূর করার জন্য অন্যান্য সদৃশ লক্ষণের সহিত রোগীর স্বভাব ও মানসিক অবস্থার সদৃশ রোগ সৃষ্টিকারী শক্তি ঔষধরাজী হতে নির্বাচন না করি তাহলে আমরা কখনও প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসারে অর্থাৎ সদৃশ বিধান মতে আরোগ্য সাধন করতে সমর্থ হবে না।

অনুচ্ছেদ নং- ২১৪
                মানসিক রোগ সমূহের আরোগ্য করার ক্ষেত্রে আমার নতুন কোন উপদেশ দেওয়ার নেই। কারণ অন্যান্য রোগের মত উহাদের ও চিকিৎসা করতে হবে। সুস্থ ব্যক্তির শারিরীক ও মানসিক প্রকৃতিতে চিকিৎসাধীন রোগের সদৃশ লক্ষণ সমষ্টি সৃষ্টি করার শক্তি যে ঔষধে বর্তমান থাকে সে ঔষধ দ্বারা এক্ষেত্রেও চিকিৎসা করতে হবে। এক্ষেত্রে ও আরোগ্য সাধনের অন্য কোন পন্থা নেই।

অনুচ্ছেদ নং ২১৫
                তথাকথিত মানসিক ও ভাবাবেগজনিত প্রায় সকল রোগই শারীরিক রোগ ছাড়া আর কিছুই নয়। ইহাদের ক্ষেত্রে শুধু দৈহিক লক্ষণ সমূহ দ্রুত অথবা বিলম্বে কমে গিয়ে প্রত্যেকের বৈশিষ্টতা অনুসারে মানসিক ও স্বভাবগত বিকৃতি জ্ঞাপক লক্ষণ সমূহ বেড়ে যেতে থাকে অবশেষে স্থানীয় রোগ মন ও স্বভাবে অদৃশ্য সূক্ষ্ম অংগে ইহা সুস্পষ্ট একদৈশিক অবস্থা প্রাপ্ত হয়।

অনুচ্ছেদ নং- ২১৬
                এমন ঘটনাও কম নয় যে, একটি তথাকথিত মারাত্মক ভীতিজনক দৈহিক রোগ যেমন ফুসফুসে পুঁজ জমা বা অন্য কোন প্রয়োজনীয় অঙ্গের অপচয় বা প্রসবাস্তিক রোগের মত কোন তরুণ প্রকৃতির রোগ, উন্মাদ রোগ, চিত্ত অবসাদ বা রোগ বাতিক (mania) ইত্যাদিতে রূপান্তরিত হয়। সেখানে
পূর্ব হতেই কতকগুলো মানসিক লক্ষণ বর্তমান থাকে, সেগুলো দ্রুত বিকৃতি কল্পনায় পর্যবসিত হয় এবং দৈহিক লক্ষণ সমূহের বিপজ্জনক অবস্থা কেটে গিয়ে প্রায় পূর্ণস্বাস্থ্যে উন্নীত হয় অথবা সেগুলো এমন ভাবে কমে যায় যে তাতে প্রচ্ছন্ন উন্নীত হয় অথবা সেগুলো এমন ভাবে কমে যায় যে তাদের প্রচ্ছন্ন অবস্থান একমাত্র অধ্যবসায়ী ও সূক্ষ্ম দৃষ্টি সম্পন্ন চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণেই ধরা পড়ে। এভাবেই সেগুলো একদৈশিক অবস্থায় এমন একটি স্থানে স্থানীয় রোগে রূপান্তরিত হয় যে, যে চিত্ত বিকার আগে সামান্যমাত্র ছিল তাই এখন প্রধান লক্ষণ রূপে বর্ধিত হয়ে অপর দৈহিক লক্ষণসমূহের অধিকাংশই আয়ত্ত্ব করে নেয় এবং এদের তীব্রতাকে সাময়িকভাবে দমন করে।
ফলে স্কুল দৈহিক রোগগুলো যেন প্রায় সূক্ষ্ম অশরীরী মানসিক অবস্থায় ও আবেগ-প্রবণ অঙ্গসমূহে প্রেরিত হয়। শরীর সংস্থানবিদ (Anatomist) তাঁর ছুরিকার দ্বারা আজ পর্যন্ত ইহার সন্ধান পান নাই এবং ভবিষ্যতেও পাবেন না।

অনুচ্ছেদ নং- ২১৭
                    এই সকল রোগে দৈহিক লক্ষণ বিশেষত মানসিক ও প্রকৃতিক অবস্থা যথার্থ ভাবে বুঝবার জন্য তার প্রধাণ লক্ষণের বিশিষ্টতা যুক্ত সমগ্র অবস্থার সংগে সতর্কভাবে আমাদের পরিচিত হতে হবে। ইহার দ্বারা সম্পূর্ণ রোগকে ধ্বংস করার জন্য যে সকল ঔষধের চরিত্র আমাদের জানা আছে সেগুলো হতে সদৃশ লক্ষণ সম্পন্ন ঔষধরূপে রোগ সৃষ্টিকারী শক্তি নির্বাচন করতে হবে। অর্থাৎ এমন একটি ঔষধ যার লক্ষণ তালিকায় আমাদের চিকিৎসাধীন রোগীর শুধুমাত্র শারীরিক লক্ষণ নয় বিশেষত মানসিক লক্ষণ সমূহের সাদৃশ্য অধিক পরিমানে বর্তমান তা নির্বাচন করতে হবে।

অনুচ্ছেদ নং- ২১৮
                    এই লক্ষণসমূহের মধ্যে পূর্বেকার তথাকথিত দৈহিক রোগের লক্ষণগুলোই সর্বপ্রথম দেখা যায়। ইহা ক্রমশ একদৈশিকভাবে মানসিক লক্ষণে (Psychological Symptoms) রূপান্তরিত হয়ে অবশেষে মনের ও স্বভাবের রোগে পর্যবসিত হয়। রোগীর বন্ধু বান্ধবদের বিবৃতি হতে জানা যায়।

অনুচ্ছেদ নং- ২১৯
                সুস্পষ্টভাবে বুঝতে না পারলেও কিন্তু রোগের শান্ত অবস্থায় ও মানসিক রোগের সাময়িক উপশমের সময় কখনো কখনো ইহা বুঝতে পারা যায়। দৈহিক রোগের আগেকার অনেক লক্ষণের জের তখনও বর্তমান থাকে। তুলনা করলে দেখা যায় যে অস্পষ্টভাবে হলেও তারা তখনও বিরাজমান রয়েছে।

অনুচ্ছেদ নং- ২২০
                   রোগীর বন্ধু বান্ধব এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানী নিজে যথার্থভাবে পর্যবেক্ষণ করে রোগীর মানসিক ও দৈহিক অবস্থা ইহার সহিত সংযুক্ত করলে আমরা রোগের একটি সম্পূর্ণ চিত্র পেয়ে থাকি। হোমিও বিধান মতে আরোগ্য করার জন্য এন্টিসোরিক ঔষধরাজি হতে যথার্থ সদৃশ লক্ষণ সৃষ্টিকারী একটি ঔষধ নির্বাচন করতে হবে। বহুদিন ধরে মানসিক রোগে ভুগতে থাকলে মানসিক বিকৃতি উৎপাদনকারী ঔষধই প্রয়োগ করতে হবে।

অনুচ্ছেদ নং- ২২১
                উন্মত্ততা ও চিত্তবিকার প্রায় ক্ষেত্রেই অগ্নিশিখার মতো আভ্যন্তরীণ সোরা হতে উৎপন্ন হয়। কিন্তু কোন কোন রোগীর স্বাভাবিক শান্ত অবস্থায় হঠাৎ উন্মাদ অবস্থা বা চিত্ত বিকার যেমন ভয়, বিরক্ত, মদের অপব্যবহার প্রভৃতি হতে সৃষ্টি ইত্যাদি নতুন রোগ হিসাবে দেখা যায়। এরূপে অচির রোগ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে তাকে এন্টিসোরিক ঔষধের দ্বারা চিকিৎসা করা উচিৎ নয়। প্রথমে অন্য শ্রেণীর পরীক্ষিত ঔষধসমূহ (যেমন-একোনাইট, বেলেডোনা, স্ট্রামোনিয়াম, হায়োসিয়ামাস প্রভৃতি) হতে ইহার উপযোগী ঔষধ উত্তমরূপে শক্তিকৃত করে ক্ষুদ্র ও সদৃশ মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। তাতে ইহা সাময়িকভাবে উপশমিত হয়ে সোরা পূর্বেকার সুপ্ত অবস্থায় ফিরে যাবে এবং রোগীও সম্পূর্ণ সুস্থ বলে মনে হবে।

অনুচ্ছেদ নং- ২২২
                কিন্তু এরূপ রোগী অচির মানসিক বিকৃতি ও আবেগ প্রবণতা হতে এই সকল অগভীর (non-antiposoric) ঔষধের দ্বারাযুক্ত হলেও আরোগ্য হয়েছে বলে মনে করা কখনো উচিত নয়। উপরন্তু এন্টিসোরিক ঔষধের দ্বারা দীর্ঘকাল ধরে চিকিৎসা করে তাকে পুরাতন সোরা দোষের হাত হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করার জন্য কাল বিলম্ব না করে চেষ্টা করা উচিত। ইহা আবার সুপ্ত অবস্থায় ফিরে গেছে একথা সত্য কিন্তু যে কোন মূহুর্তে আবার নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকে। রোগী বিশ্বস্ততার সহিত আহার বিহারের (Diet and regimen) নির্দেশ মেনে চললে এই চিকিৎসার পর পুনরায় সেই রোগে আক্রান্ত হবার ভয় থাকে।

অনুচ্ছেদ নং- ২২৩
                এন্টিসোরিক চিকিৎসা করা না হলে মানসিক বিকৃতির প্রথমবারে কারণ অপেক্ষা নিতান্ত সামান্য কারণেই একটি নতুন অধিকতর দীর্ঘস্থায়ী ও প্রচন্ড আক্রমণ সহসা ঘটতে পারে বলে আমরা নিশ্চিতভাবেই ধরে নিতে পারি। তখন সাধারণত সোরা সম্পূর্ণ বিকাশ লাভ করে মানসিক বিকৃতি সাময়িক বা স্থায়ীভাবে আত্মপ্রকাশ করে। এ অবস্থায় তাকে এন্টিসোরিক (এন্টিসোরিক চিকিৎসা) ঔষধ প্রয়োগ করে আরোগ্য করা অপেক্ষাকৃত দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।

অনুচ্ছেদ নং- ২২৪
                মানসিক রোগ সম্পূর্ণভাবে বিকশিত না হলে এবং ইহা শারিরীক রোগ হতে সৃষ্টি হয়েছে অথবা শিক্ষাগত ত্রুটি, কু-অভ্যাস, চরিত্রদোষ, অসংযম, কু-সংস্কার বা অজ্ঞতা হতে সৃষ্টি হয়েছে এই জাতীয় কোন সন্দেহ এসে উপস্থিত হলে তা এইভাবে সমাধান করতে হবে- পরবর্তী কোন কারণে মানসিক রোগ দেখা দিলে। বন্ধুভাবে সংগত পরামর্শ সান্তনাপূর্ণ, যুক্তি,. হৃদয়গ্রাহী আবেদন সৎ উপদেশ প্রভৃতি দ্বারা রোগ কমে যাবে এবং রোগীরও উন্নতি সাধিত হবে। কিন্তু প্রকৃত নৈতিক ও মানসিক রোগ সমূহ (Real moral or mental melody) দৈহিক রোগ হতে উৎপন্ন হলে এই প্রথায় সহসা বেড়ে যাবে। শুধু তাই নয়, বিষন্নতা আরো বৃদ্ধি পাবে, কলহপ্রিয় হবে,
সান্তনা দিলেও শান্ত হবে না। এবং রোগী গম্ভীর প্রকৃতির হয়ে পড়বে। রোগীর হিংসা পরায়ণ উন্মত্ততা আরো প্রখর এবং ভয়ংকর হয়ে উঠবে। বাচালের বোকামী আরো বেশী আত্মপ্রকাশ করবে।

অনুচ্ছেদ নং- ২২৫
                  এখানে উল্ল্যেখ করা হয়েছে যে, এমন কতকগুলো আবেগ প্রবণ রোগ নিশ্চিতভাবেই বিদ্যমান আছে যারা কেবলমাত্র দৈহিক রোগ হতে উৎপন্ন হয়ে বর্তমান অবস্থায় পরিণত হয় নাই। সেগুলো বিপরীতভাবে উৎপন্ন হয়। সামান্য দৈহিক অস্বস্তিকর অবস্থায় ভাবপ্রবণতা হতে সেগুলো উৎপন্ন ও অধিষ্ঠিত হয়। একটানা উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, বিরক্তি, ভ্রান্তি এবং বারবার ভয়ংকর আশংকা ও ভীতিই এই প্রকার রোগের কারণ। এরূপ ভাবপ্রবণ রোগ কালক্রমে দৈহিক স্বাস্থ্য প্রায়ই খুব বেশি বিনষ্ট করে থাকে।

অনুচ্ছেদ নং- ২২৬
                    শুধুমাত্র এরূপ আবেগপ্রবণ রোগসমূহ মনহতেই সৃষ্টি হয় এবং মানসিক স্তরেই অবস্থান করে। অত্যন্ত তরুণ অবস্থায় ও শরীর তন্ত্রের অতিশয় ক্ষতি সাধন করার পূর্বেই মানসিক চিকিৎসার দ্বারা এরূপ রোগীদের অতি সত্বর সুস্থ মানসিক অবস্থা সেই সঙ্গে উপযুক্ত পথ্য ও পরিচর্যার দ্বারা সুস্থ শারীরিক অবস্থা দৃশ্যত আবার ফিরে আসে। আশ্বাস দেয়া, বন্ধুভেবে পরামর্শ দেয়া, সঙ্গত উপদেশ দেয়া ও অনেক ক্ষেত্রে সতর্কভাবে গুপ্ত প্রবঞ্চনা (well disguised deception) করা প্রভৃতির দ্বারা মানসিক রোগের চিকিৎসা করতে হয়।

অনুচ্ছেদ নং- ২২৭
                লক্ষ্য করলে বুঝতে পারা যায় যে, এই সব রোগের মূল কারণ সোরা কেবল এই ক্ষেত্রে তা এখনো পূর্ণ বিকশিত হয় নাই। কাজেই আবার যাতে সহজে সেরূপ মানসিক রোগ ভোগ করতে না হয় সেরূপ নিরাপত্তার জন্য ঐ আপাত সুস্থ রোগীকে এন্টিসোরিক ঔষধ দ্বারা যথাযথ চিকিৎসা করা প্রয়োজন।

অনুচ্ছেদ নং- ২২৮
                  দৈহিক রোগ হতে উৎপন্ন মানসিক ও আবেগ প্রবণ রোগ সমূহ সদৃশ বিধানমতে এন্টিসোরিক চিকিৎসার দ্বারাই শুধু আরোগ্য করা যায়। সেই সঙ্গে জীবনযাত্রা প্রণালীকে সুনিয়ন্ত্রিত করতে হবে। আনুসাঙ্গিক মানসিক অবস্থার জন্য রোগীর আত্মীয় পরিজন ও চিকিৎসক কে অত্যন্ত নিষ্ঠাসহকারে যথাযথ আন্তরিকতা প্রদর্শন করতে হবে। প্রচন্ড উন্মত্ততায় অবিচল সাহস ও শান্ত দৃঢ় সংকল্প করুণ শোক ও অসন্তুষ্ট অনুযোগের জন্য দৃষ্টি ও ভঙ্গিমায়, নির্বাক সমবেদনা অর্থহীন বাচালতার সম্পূর্ণ অমনোযোগী না হয়ে নিরূত্তর থাকা, বিরক্তি, নিন্দনীয় ব্যবহার ও অনুরূপ আচরণে সম্পূর্ণ অমনোযোগীতা প্রদর্শন করা কর্তব্য। রোগীকে তাঁর কাজ কর্মের জন্য তিরষ্কার না করে যাতে চারিপাশের জিনিষপত্র নষ্ট বা ক্ষতি করতে না পারে সেই দিকে শুধু নজর দিতে হবে। সর্বপ্রকার দৈহিক শান্তি ও উৎপীড়ন পরিহার করার জন্য জিনিষপত্র সুরক্ষিত অবস্থায় গুছিয়ে রাখতে হবে। অতি সহজেই এরূপ ব্যবস্থা করা যায়। একমাত্র ঔষধ প্রয়োগের ক্ষেত্রে দরকার হলে বল প্রয়োগ করা সংগত কিন্তু সেরূপ বল প্রয়োগেরও কোন প্রয়োজন হয় না। সুনির্বাচিত হোমিওপ্যাথিক ঔষধের ক্ষুদ্র মাত্রার কোন স্বাদ নেই। কাজেই রোগীর অজ্ঞাত সারেই পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে তা প্রয়োগ করা যেতে পারে।

অনুচ্ছেদ নং- ২২৯
                অপরপক্ষে এরূপ রোগীরা প্রতিবাদ সাগ্রহ ব্যাখ্যা রূঢ়ভাবে সংশোধন ও কটুক্তি আদৌ সহ্য করেন না। দুর্বলতা ও ভয়ের কাছে বশ্যতা। স্বীকার তাঁরা করেন না। মানসিক ও আবেগ প্রবণ রোগীদের নিকট এই সকল ব্যবহার সমান ক্ষতিকর। এইরোগীদের অধিকাংশ অত্যন্ত ক্রোধী হয়। বিদ্রুপ, শত্রুতা, প্রতারণা বুঝতে পারলেই এদের রোগ বেড়ে যায়। রোগীদের বিচার বিবেক অক্ষুন্ন রয়েছে- চিকিৎসক এবং পরিচর্যাকারীদের সবসময় এমন ভান করতে হবে। তাদের জ্ঞান ও প্রবৃত্তির নিকট হতে বিরক্তিকর সর্বপ্রকার বাহ্যিক প্রভাব সাধ্যমত অপসারিত করতে হবে। বিষাদগ্রস্ত মনের নিকট কোন আমোদ-প্রমোদ উপভোগ্য নয়। কোন হিতকর আকর্ষণ নির্দোষ, আলোচনার সুফল বই পুস্তক পাঠ বা অন্য কোন ভাবে ইহারা শান্তি পায় না। রুগ্নদেহে আবদ্ধ বিধবস্ত মন আরোগ্য ব্যতিত অন্য কিছুতেই সজীবতা ফিরে পায় না। শারীরিক অবস্থার উন্নতির সঙ্গেই তাদের মানসিক সাম্য ও শান্তি আবার ফিরে পায় না। শারিরীক অবস্থার উন্নতির সঙ্গেই তাদের মানসিক সাম্য ও শান্তি আবার ফিরে আসে।

অনুচ্ছেদ নং- ২৩০
                মানসিক এবং ভাবাবেগ জনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে বিশ্বাস করা কঠিন। এই জাতীয় প্রত্যেকটি বিশেষ রোগীর জন্য সদৃশ বিধান মতে সুনির্বাচিত এন্টিসোরিক ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে। এই জন্য বিশ্বস্ততার সংঙ্গে রোগ চিত্র গ্রহন করা দরকার। এই ধরনের অনেকগুলো ঔষধের প্রকৃত কার্যকারীতা জানা থাকলে এবং ধৈর্য সহকারে অনুসন্ধান করলে অতি সহজেই যথার্থ সদৃশ ঔষধ নির্বাচন করা যায়। আবেগময় মানসিক অবস্থা এই জাতীয় রোগীর প্রধাণ লক্ষণরূপে নির্ভুলভাবেই বোধগম্য হয়।
এভাবে চিকিৎসা করা হলে অতিসত্বর রোগীর বিশেষ উন্নতি পরিলক্ষিত হয়। রোগীকে আমরণ অনুপযোগী ঔষধ বড় মাত্রায় বার বার প্রয়োগ করা হলেও আরোগ্যদান করা যায় না। ঐ সকল রোগ দৈহিক রোগ হতে উৎপন্ন হয় অথবা যুগপৎ উহাদের সঙ্গেই সৃষ্টি হয়। আমার জানা কোন চিকিৎসা প্রণালী মানসিক রোগ চিকিৎসায় এরূপ সাফল্যের গৌরব বহন করে না। প্রকৃতপক্ষে বহুদিনের পুরাতন মানসিক ও আবেগপ্রবণ রোগসমূহের আরোগ্যকারীতায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় শ্রেষ্ঠত্বের কথা প্রভূত অভিজ্ঞতায় নিঃসন্দেহে আমি বলতে পারি।



১। প্রশ্ন: মানসিক রোগের সংজ্ঞা লিখ। ইহার চিকিৎসা পদ্ধতি আলোচনা কর। ০৮, ১০, ১২
বা মানসিক রোগ বলতে কি বুঝ? ইহার চিকিৎসা কিভাবে করবে?
বা, মানসিক রোগীর চিকিৎসা পদ্ধতি আলোচনা কর। ১৬

মানসিক রোগের সংজ্ঞা:
যে সকল একদৈশিক রোগ মানুষের মনোবৃত্তি ও আচরনের উপর প্রভাব বিস্তার করে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রার বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে, তাকে মানসিক রোগ বলে। ইহার লক্ষণাবলি মনোবৃত্তি ও আচরনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
মানসিক রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি নিম্নরূপ:
ডাঃ হ্যানিম্যান তাঁর বিখ্যাত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা আইন "অর্গানন অব মেডিসিন" গ্রন্থের ২২৮-২৩০নং অনুচ্ছেদে মানসিক রোগের চিকিৎসা সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে আলোকপাত করেছেন।
(i) রোগীর আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সেবাকারীর কাছ থেকে রোগীর বিবরণ সংগ্রহ করে রোগের কারণ অনুসন্ধান করতে হবে।
(ii) রোগীলিপি প্রস্তুতের পর ডাঃ হ্যানিম্যানের মতে সর্বপ্রথম লক্ষণ সদৃশ্যে উপযুক্ত এন্টিসোরিক ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে।
(iii) তারপর যদি সাইকোসিস ও সিফিলিস মায়াজমের প্রভাব থাকে, তাহলে যথাক্রমে এন্টিসাইকোটিক ও এন্টিসিফিলিটিক ঔষধ দিতে হবে।
(iv) রোগীর যদি কোন প্রকারে কু-অভ্যাসজনিত কারণে রোগের সৃষ্টি হয়, তাহলে তা দূর করার ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন- মাদকাসক্তি।
(v) মানসিক আঘাতজনিত হলে, তাকে মানসিক প্রশান্তির ব্যবস্থা করতে হবে। (vi) রোগীকে কোন প্রকারের দৈহিক ও মানসিক আঘাত করা যাবে না।
(vii) রোগীর সাথে বন্ধুসুলভ আচরন করতে হবে।
(viii) রোগীকে জোরপূর্বক ঔষধ প্রয়োগ করা যাবে না।
(ix) রোগীর ইচ্ছা অনুযায়ী খাদ্য সামগ্রী ব্যবস্থা করতে হবে।



২। প্রশ্ন: মানসিক রোগের সংজ্ঞা লিখ। ইহা কত প্রকার ও কি কি?
মানসিক রোগের সংজ্ঞা:
যে সকল একদৈশিক রোগ মানুষের মনোবৃত্তি ও আচরনের উপর প্রভাব বিস্তার করে এবং স্বাভাবিক জীবন-যাত্রার বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে, তাকে মানসিক রোগ বলে। ইহার লক্ষণাবলী মনোবৃত্তি ও আচরনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
মানসিক রোগের প্রকারভেদ:
মানসিক রোগ প্রধানতঃ চার প্রকার। যথা:
(i) দৈহিক রোগজনিত মানসিক রোগ।
(ii) আবেগময় মানসিক রোগ।
(iii) অভ্যাসজনিত মানসিক রোগ।
(iv) অপ্রত্যাশিত মানসিক রোগ।



৩। প্রশ্ন: মানসিক রোগের কারণ সমূহ উল্লেখ কর। ১০, ১২
মানসিক রোগের কারণসমূহ:
মহাত্মা ডাঃ হ্যানিম্যান তাঁর বিখ্যাত হোমিওপ্যাথির চিকিৎসা আইন "অর্গানন অব মেডিসিন” গ্রন্থের ২১০-২৩০নং অনুচ্ছেদে "মানসিক রোগ" সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন।
ডাঃ হ্যানিম্যানের মতে, মানুষের দেহে প্রধানতঃ দুইটি কারণে রোগের সৃষ্টি বা প্রকাশ পায়। যথাঃ- ক) মূলকারণ ও খ) উত্তেজক/আনুসাঙ্গিক কারণ।
মূলকারণ: ১। সোরা, ২। সাইকোসিস, ৩। সিফিলিস এবং
৪। টিউবারকুলার ডায়াথেসিস।
উত্তেজক/আনুসাঙ্গিক কারণ: ১। বংশগত, ২। শোক-দুঃখ, ৩। ব্যর্থ
প্রেম, ৪। মানসিক আঘাত, ৫। শারীরিক আঘাত। ৬। দৈহিক রোগজনিত কারণে-দেহের বিভিন্ন রোগ।



৪। প্রশ্ন: মানসিক রোগে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা উৎকৃষ্ট কেন? ১০ মানসিক রোগে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা উৎকৃষ্ট কারণ:
ডাঃ হ্যানিম্যান তাঁর বিখ্যাত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা আইন "অর্গানন অব মেডিসিন” গ্রন্থের ২২৮- ২৩০নং অনুচ্ছেদে "মানসিক রোগ" চিকিৎসা সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে আলোকপাত করেছেন।
আরোগ্য সাধন প্রক্রিয়াটা সম্পূর্ণভাবেই নির্দিষ্ট নিয়মের উপর নির্ভর করে। এটা সদৃশ নিয়ম অর্থাৎ সিমিলিয়া সিমিলিবাস কিউরেন্টার নিয়মের দ্বারা অনুশাসিত। এ যাবৎ যত আরোগ্য সাধিত হয়েছে তা এ সদৃশ্য বিধান অনুযায়ী হয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যেক স্থলেই যে ঔষধ আরোগ্য সম্পাদন করেছে তা ঐ আরোগ্য সাধিত লক্ষণারাজি উৎপাদন করতেও সক্ষম। এ যাবৎ অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির দ্বারা যে আরোগ্য সাধন হয়নি এমন নয়। তবে যা হয়েছে তা জ্ঞাতে হোক বা অজ্ঞাতে হোক এ সদৃশ বিধান মতেই হয়েছে। যেমন কুইনাইন খেয়ে যদি কোনও প্রকার জ্বর বাস্তবিকই আরোগ্য হয়ে থাকে তবে বুঝতে হবে সুস্থ শরীরে কুইনাইন সেবন করলে ঐ প্রকারের জ্বর নিশ্চয়ই উৎপন্ন হয়। কুইনাইনের যে কুইনাইন দ্বারা আরোগ্য প্রাপ্ত হয়, তা প্রমানিত সত্য।
সদৃশ বিধানে চিকিৎসা বলতে রোগীর শারীরিক ও মানসিক অস্বাচ্ছন্দ্যতার সদৃশ ধর্মী ঔষধ প্রয়োগ বুঝায়।



৫। প্রশ্ন: প্রচন্ড উন্মাদ রোগীর ক্ষেত্রে কিরূপ চিকিসা করতে হবে?
প্রচন্ড উন্মাদ রোগীর ক্ষেত্রে নিম্নরূপ চিকিত্সা:
উন্মত্ততা ও চিত্তবিকার প্রায় ক্ষেত্রেই অগ্নিশিখার মতো আভ্যন্তরীণ সোরা হতে উৎপন্ন হয়। কিন্তু কোন কোন রোগীর স্বাভাবিক শান্ত অবস্থায় অকস্মাৎ উন্মাদ অবস্থা বা চিত্ত বিকার যেমন ভয়, বিরক্ত, মদের অপব্যবহার প্রভৃতি হতে সৃষ্টি ইত্যাদি নতুন রোগ হিসাবে দেখা যায়। এরূপে অচির রোগ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে তাকে এন্টিসোরিক ঔষধের দ্বারা চিকিৎসা করা উচিৎ নয়। প্রথমে অন্য শ্রেণীর পরীক্ষিত ঔষধসমূহ যেমন- একোনাইট, বেলেডোনা, স্ট্রামোনিয়াম, হায়োসিয়ামাস প্রভৃতি এর উপযোগী ঔষধ উত্তমরূপে শক্তিকৃত করে ক্ষুদ্র ও সদৃশ মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। তাতে ইহা সাময়িকভাবে উপশমিত হয়ে সোরা পূর্বেকার সুপ্ত অবস্থায় ফিরে যাবে এবং রোগীও সম্পূর্ণ সুস্থ বলে মনে হবে।
কিন্তু এরূপ রোগী অচির মানসিক বিকৃতি ও আবেগ প্রবণতা হতে এই সকল স্বল্পক্রিয়াশীল ঔষধের আরোগ্য হয়েছে বলে মনে করা কখনো উচিত নয়। উপরন্তু এন্টিসোরিক ঔষধের দ্বারা দীর্ঘকাল ধরে চিকিৎসা করে, তাকে পুরাতন সোরা দোষের হাত হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করার জন্য কাল বিলম্ব না করে চেষ্টা করা উচিত। ইহা আবার সুপ্ত অবস্থায় ফিরে গেলে রোগী সম্পূর্ণ আরোগ্য হবে। পরবর্তীতে রোগীকে যদি সঠিক আহার-বিহার ও জীবনযাত্রার নির্দেশনা মেনে চলে এই চিকিৎসার পর পুনঃরায় সেই রোগে আক্রান্ত হবার ভয় থাকে না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ