অর্গানন অব মেডিসিন (তৃতীয় বর্ষ)
নবম অধ্যায়
ঔষধ প্রয়োগ প্রণালী (২৪৫-২৫১)
অনুচ্ছেদ নং- ২৪৫
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগসমূহের প্রধান বৈচিত্র্যগুলোর উপর এবং এদের আনুসঙ্গিক বিশিষ্ট অবস্থাসমূহের উপর কিভাবে মনোযোগ দেয়া উচিত তা আমরা লক্ষ্য করলাম। ঔষধের প্রয়োগ প্রণালী ও তা প্রয়োগ করার সময় কি কি বিধি নিষেধ পালন করতে হবে- সেই সম্বন্ধে আমরা এখন আলোচনা করব।
অনুচ্ছেদ নং- ২৪৬
চিকিৎসা করার সময় রোগী যখন প্রত্যক্ষভাবে উত্তরোত্তর আরোগ্যের পথে অগ্রসর হতে থাকেন এবং রোগ লক্ষণসমূহ সুস্পষ্টভাবে কমতে থাকে তখন যে কোন ঔষধেরই পুনঃপ্রয়োগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখতে হবে। কারণ পূর্ব প্রদত্ত ঔষধের আরোগ্যকারী-ক্রিয়া এখন সম্পূর্ণতার পথে এগিয়ে চলেছে। অচির রোগের ক্ষেত্রে সর্বদাই এরূপ ঘটে থাকে। কিন্তু অপরদিকে অধিকতর চির রোগীর ক্ষেত্রে সুনির্বাচিত সদৃশ ঔষধের একটি মাত্রার ক্রিয়ারও কোন কোন সময় ধীর গতিতে উন্নতি করলেও আরোগ্য সাধন করে। এরূপ ক্ষেত্রে ঔষধের ক্রিয়াকলাপ স্বাভাবিক ভাবেই ৪০, ৫০, ৬০, ১০০, দিন পর্যন্ত চলতে পারে। কিন্তু কদাচিত এরূপ হয়ে থাকে। উপরন্তু এই সময়কে অর্ধেক এক চতুর্থাংশ বা তার অপেক্ষা ও কম করা সম্ভব হলে রোগীকে আরো অনেক তাড়াতাড়ি আরোগ্য করা যায়। ইহা চিকিৎসক ও রোগী উভয়ের জন্য একান্ত প্রয়োজন। সুখের বিষয় সাম্প্রতিক কালে পুনঃপুনঃ পর্যবেক্ষণের ফলে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে নিম্নলিখিত শর্ত পালন করা হলে সত্বর আরোগ্যের পথ সুগম হবে। চতী শুভীচন্দ্রীীপল মোক
প্রথমত: অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নির্বাচিত ঔষধটি যথার্থ সদৃশ লক্ষণ যুক্ত হতে হবে।)
দ্বিতীয়তঃ ঔষধটিকে সর্বোচ্চ শক্তিতে পরিণত করতে হবে, পানিগুলে দিতে হবে এবং যথাযথ ক্ষুদ্র মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। অভিজ্ঞতায় দেখা যায় নির্দিষ্ট সময় পরপর ঔষধ প্রয়োগ করা হলে অতিসত্বর আরোগ্য সম্পাদিত হয়। কিন্তু পুনঃপ্রয়োগ করার সময় প্রত্যেকটি মাত্রা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মাত্রা হতে যেন কিছুটা পরিবর্তিত শক্তির হয় সেই বিষয় সতর্ক থাকতে হবে। যে জীবনীশক্তিকে সদৃশ ঔষধজ রোগের দ্বারা পরিবর্তিত করতে হবে তা যেন বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জেগে উঠতে না পারে এবং বিদ্রোহ করতে না পারে সেই দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ ঔষধের অপরিবর্তিত মাত্রা সেই দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ ঔষধের অপরিবর্তিত মাত্রা বিশেষত দ্রুত পুনঃপুনঃ মাত্রা প্রয়োগের দ্বারা সর্বদাই বিশেষত সেরূপ হয়ে থাকে।
অনুচ্ছেদ নং- ২৪৭
চালিদ আরোগ্য ত্বরান্বিত করার জন্য অল্পক্ষণ পরপর প্রয়োগ করা অথবা একই শক্তির ঔষধ অপরিবর্তিত মাত্রায় প্রয়োগ করা উচিত নয়। এমন কি একই শক্তির ঔষধ অপরিবর্তিত অবস্থায় দ্বিতীয়বার প্রয়োগ গ্রহন করাও উচিত নয়। কারণ সেরূপ অপরিবর্তিত মাত্রাকে জীবনীশক্তি কখনো বিনা বাধায় গ্রহন করে না। অর্থাৎ আরোগ্য যোগ্য সদৃশ রোগ লক্ষণ ছাড়াও ঔষধের অন্যান্য লক্ষণ বিকশিত হয়। পূর্ববর্তী মাত্রা আগেই জীবনীশক্তির উপর বঞ্চিত পরিবর্তন সাধন করেছেন, কাজেই সে একই ঔষধের গতিশীল সম্পূর্ণ সদৃশ অপরিবর্তিত দ্বিতীয় মাত্রা জীবনীশক্তির মধ্যে ঠিক পূর্বের অবস্থাসমূহ আর দেখতে পায় না। সে ধরনের অপরিবর্তিত শক্তির ঔষধ আরো প্রয়োগ করা হলে রোগী বাস্তবিক পক্ষে আরো অন্যভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে, এমন কি পূর্বাপেক্ষা অধিকতর অসুস্থ হতে পারে কারণ এই অবস্থায় প্রযুক্ত ঔষধের লক্ষণগুলোই ক্রিয়াশীল থাকে, মূল রোগ লক্ষণের সহিত তাদের কোন সাদৃশ্য থাকে না। কাজেই আরোগ্যের পথে কোনরূপ অগ্রগতি সাধিত হয় না। বরং রোগীর অবস্থা বাস্তবিক বৃদ্ধি হয়ে থাকে। কিন্তু যদি পরবর্তী মাত্রাগুলো প্রতিবারেই সামান্য পরিবর্তন করে অর্থাৎ কতটা উচ্চতর শক্তিতে পরিণত করে প্রয়োগ করা হয়। তবে জীবনী শক্তি সে ঔষধের সাহায্যে কোনরূপ বাধা ছাড়াই পরিবর্তিত হয় অর্থাৎ প্রাকৃতিক রোগের অনুভূতি কমতে থাকে এভাবে আরোগ্য অধিকতর নিকটবর্তী হয়।
অনুচ্ছেদ নং- ২৪৮
এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আমরা ঔষধ মিশ্রিত শিশিকে সম্ভবত ৮, ১০, ১২ বার ঝাঁকি দিয়ে নতুন করে শক্তিকৃত করি এবং তা হতে রোগীকে এক বা বর্ধিতভাবে কতিপয় চা চামচ মাত্রায় সেবন করতে দেই। দীর্ঘস্থায়ী চিররোগে প্রতিদিন বা একদিন পর পর অচির রোগে দুই হতে ছয় ঘন্টা পর পর এবং অত্যন্ত সাংঘাতিক রোগের ক্ষেত্রে প্রতি ঘন্টায় বা আরো ঘন ঘন ঔষধ প্রয়োগ করি। এইভাবেই চিররোগের ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি সুনির্বাচিত ঔষধ এমন কি দীর্ঘ ক্রিয়াা ঔষধও অধিকতর সাফল্যের সহিত মাসের পর মাস ধরে প্রত্যহ পুনঃপুনঃ প্রয়োগ করা যেতে পারে। ঔষধ মিশ্রিত শিশিটি যদি ৭ বা ১৫ দিনে শেষ হয়ে যায় এবং ঐ ঔষধের লক্ষণ যদি তখনও বর্তমান থাকে তাহলে সে ঔষধেরই উচ্চতর শক্তি এক বা কতিপয় অনুবটিকা নিয়ে পরবর্তী মিশ্রন প্রস্তুত করতে হবে। রোগীর ক্রমোন্নতি অব্যাহত থাকলে এবং জীবনে কখনো ভোগ করেন নাই এমন কোন লক্ষণ এসে উপস্থিত না হলে এভাবেই ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে। এরূপ ঘটলে অর্থাৎ নতুন দেখা দিলে রোগের বাদবাকী লক্ষণ সমষ্টি একটির পর একটি মিলিত হয়ে পরিবর্তিত অবস্থায় প্রকাশিত হলে গত ঔষধটির বদলে আর একটি অধিকতর সদৃশ ঔষধ নির্বাচন করে একইভাবে পুনঃপুনঃ প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু মিশ্রণের প্রতিটি মাত্রার শক্তি কে প্রয়োগের পূর্বে খুব জোরে ঝাঁকি দিয়ে কিছুটা পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত করার কথা মনে রাখতে হবে। পক্ষান্তরে সুনির্বাচিত ঔষধ প্রায় প্রতিদিন সেবন করার সময় চিররোগের শেষের দিকে তথাকথিত হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি দেখা দিলে রোগের অবশিষ্ট লক্ষণরাজী কিছুটা আবার বৃদ্ধি হয়েছে বলে মনে হয়। মূল রোগের সদৃশ ঔষধজনিত রোগই এখন শুধু ক্রমাগত বিকশিত হতে থাকে। এমতবস্থায় ঔষধের মাত্রাকে আরো কমাতে হবে এবং দীর্ঘদিন পর প্রযোগ করতে হবে এবং আরোগ্য উন্মুক্ত অবস্থায় (Convalescence) আর ঔষধের প্রয়োজন আছে কিনা দেখবার জন্য সম্ভবত কয়েকদিন ঔষধ বন্ধ রাখতে হবে। ঔষধের আধিক্যবশত আপাত লক্ষণসমূহ শিঘ্রই অন্তর্হিত হয় এবং তৎক্ষেত্রে অবিকৃত স্বাস্থ্যই বিরাজ করে। রোগীকে ঔষধ সেবন করানো সম্ভবপর না হলে সুনির্বাচিত শক্তিকৃত ঔষধের ঘ্রান দিয়ে চিকিৎসা করতে হলে ছোট এক ড্রাম শিশির মধ্যে পানি মিশ্রিত সুরাসার (Dilute alcohol) নিয়ে তন্মধ্যে নির্বাচিত ঔষধের একটি অনুবটিকা ঝাঁকি দিয়ে মিলিয়ে দুই, তিন বা চারদিন পর পর ঘ্রাণের দ্বারা প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিবার ঘ্রাণ নিতে দেবার আগে শিশিটিকে ৮/১০ বার সজোরে ঝাঁকি দিতে হবে।
অনুচ্ছেদ নং- ২৪৯
রোগীকে প্রদত্ত কোন ঔষধের ক্রিয়া প্রকাশ করার সময় নতুন এবং কষ্টকর লক্ষণসমূহ উপস্থিত হলে এবং সে সমস্ত লক্ষণের সহিত রুগ্ন অবস্থার কোন সম্বন্ধ না থাকলে সে ঔষধ প্রকৃত উপকার সাধন করতে সক্ষম হবে না। ঔষধ কে সদৃশ বিধান অনুসারে সুনির্বাচিত হয়েছে বলেও ধরা যাবে না। সুতরাং রোগ অত্যাধিক বৃদ্ধি হলে সদৃশ লক্ষণে পরবর্তি অধিকতর সুনির্বাচিত ঔষধ প্রয়োগ করার পূর্বে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কোন প্রতিষেধক ঔষধের দ্বারা তার আগের ভুল ঔষধের কার্যকারীতা কে কতটা নষ্ট করে দিতে হবে। অথবা ঐ কষ্টকর লক্ষণসমূহের প্রকৃতি অত্যন্ত প্রচন্ড না হলে পূর্বেকার ভুল নির্বাচিত ঔষধের স্থলে অচিরে পরবর্তী ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে।
অনুচ্ছেদ নং- ২৫০
দূরদৃষ্টি সম্পন্ন চিকিৎসক নিখুঁতভাবে রোগের অবস্থা অনুসন্ধান করলে মারাত্মক রোগের ক্ষেত্রে ৬, ৮, ১০, ১২ ঘন্টা পরই তাঁর শেষ ঔষধটির নির্বাচন যে অনুপযোগী হয়েছে তা বুঝতে পারেন। সেরূপ ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা খুব ধীরে ধীরে হলেও স্পষ্টভাবে নতুন লক্ষণ ও যন্ত্রণার দ্বারা ঘন্টায় ঘন্টায় ক্রমশ অবনতির দিকে যেতে থাকে। এমন অবস্থায় শুধু উপযোগী হলে চলবে না বরং সর্বতোভাবে উপযোগী ঔষধ নির্বাচন ও প্রয়োগ করে তার ভুল সংশোধন করা কেবল সংগত নয় বরং কর্তব্য।
অনুচ্ছেদ নং- ২৫১
কতগুলো ঔষধের যেমন ইগ্নেসিয়া, ব্রায়োনিয়া, রাসটক্স কোন কোন সময় বেলাডোনা মানব স্বাস্থ্য পরিবর্তন করার শক্তি প্রধাণতঃ তাদের পর্যায়ক্রমিক ক্রিয়ার দ্বারাই গঠিত হয় উহারা- এক ধরনের প্রাথমিক ক্রিয়া সজ্ঞাত লক্ষণ, সেগুলো আংশিক ভাবে পরস্পরের বিপরীত যথার্থ সদৃশ নীতির উপর ভিত্তি করে ইহাদেও কোন একটি ঔষধ কে প্রয়োগ করার পরও চিকিৎসা বিজ্ঞানী কোন উপকার দেখতে না পেলে সে ঔষধই অনুরূপ ক্ষুদ্রমাত্রায় অনেকেই সহসা আরোগ্য ল করতে সমর্থ হবেন।
১। প্রশ্ন: আংশিক সদৃশ্য ঔষধ কখন প্রয়োগ করবে? ০৮, ১২, ১৪
বা, কখন আংশিক সদৃশ ঔষধ প্রয়োগ করতে হয়?
আংশিক সদৃশ ঔষধ প্রয়োগ করার সময়:
মহাত্মা ডাঃ হ্যানিম্যান কর্তৃক আবিষ্কৃত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতি লক্ষণ ভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থা। যখন কোন রোগীর পরিপূর্ণ লক্ষণ পাওয়া না যায় বা প্রয়োজনের তুলনায় অতি অল্প সংখ্যক লক্ষণ পাওয়া যায় যা সদৃশ বিধান মতে রোগারোগ্যে জন্য ঔষধের লক্ষণের সাথে রোগীর রোগ লক্ষণের আংশিক মিল পাওয়া যায়, তখন আংশিক সদৃশ ঔষধ প্রয়োগ করতে হয়।
২। প্রশ্ন: হোমিওপ্যাথিক ঔষধ রোগীকে প্রয়োগের পথ কয়টি এবং কি কি? সংক্ষেপে আলোচনা কর। ১২, ১৪
হোমিওপ্যাথিক ঔষধ রোগীকে প্রয়োগের পথ তিনটি:
(i) মুখ গহবর: সাধারণতঃ সহ্য ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
(ii) ঘ্রাণে: দীর্ঘকাল রোগ ভোগের পর কোন রোগী দুর্বল হয়ে পড়লে, সে রোগী যদি স্নায়ুবিক প্রবণ হয় এবং সামান্য মাত্রার ঔষধ সেবনে প্রতিক্রিয়াও সহ্য করতে পারে না। তখন এ ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে ঘ্রাণে ঔষধ প্রয়োগ করা হয়।
(iii) চর্মে: মর্দনের মাধ্যমে স্নায়ুসমূহকে উদ্দীপিত করে, অধিক স্থানে সঞ্চালিত করা হয়।
সূক্ষ্মমাত্রার সংজ্ঞা: একই আকৃতির ১০০টা অনুবটিকা ওজন এক গ্রেণ হয়,
এমন একটা অনুবটিকা শক্তিকৃত ঔষধের দ্বারা ঔষধিকৃত করে ইহাকে মাত্রা হিসাবে রোগীকে সেবন করতে দেয়াকে সূক্ষ্মমাত্রা বলে। ডাঃ হ্যানিম্যান বলেছেন যে, এক ফোঁটা ঔষধ ৫০০টির বেশি অনুবটিকাকে সিক্ত করে ফুটিং পেপারে শুকিয়ে নিলে এর একটি অনুবটিকা যে টুকু ঔষধ ধারণ করতে প তাকে সূক্ষ্মমাত্রা বলে।
৩। প্রশ্ন: ক্ষুদ্রতম মাত্রা কি? হোমিওপ্যাথিতে ক্ষুদ্রতম মাত্রার গুরুত্ব লিখ? বা "সূক্ষ্ম মাত্রা অধিক কার্যকর"-ব্যাখ্যা কর। ০৯, ১৩
ক্ষুদ্রতম মাত্রা/ সূক্ষ্মমাত্রাঃ
একই আকৃতির ১০০টা অনুবটিকা ওজন এক গ্রেণ হয়, এমন একটা অনুবটিকা শক্তিকৃত ঔষধের দ্বারা ঔষধিকৃত করে, ইহাকে মাত্রা হিসাবে রোগীকে সেবন করতে দেয়াকে ক্ষুদ্রতম বা সূক্ষ্মমাত্রা বলে।
মহাত্মা ডাঃ হ্যানিম্যান বলেছেন যে, এক ফোঁটা ঔষধ ৫০০টির বেশি অনুবটিকাকে সিক্ত করে ব্লটিং পেপারে শুকিয়ে নিলে এর একটি অনুবটিকা যে টুকু ঔষধ ধারণ করতে পারে, তাকে সূক্ষ্ম বা ক্ষুদ্রতম মাত্রা বলে।
হোমিওপ্যাথিতে ক্ষুদ্রতম মাত্রার গুরুত্ব/"সূক্ষ্ম মাত্রা অধিক কার্যকর":
হোমিওপ্যাথির অন্যতম নীতি হচ্ছে সদৃশ নিয়মে চিকিৎসা পদ্ধতি। সদৃশ লক্ষণ মতে সদৃশ লক্ষণ সম্পন্ন রোগে সদৃশ ঔষধ দ্বারা রোগারোগ্য করতে হলে ঔষধের অতি সূক্ষ্ম মাত্রাই প্রয়োজন হয়ে থাকে। উচ্চ শক্তি সম্পন্ন ঔষধ, মাত্রা ক্ষুদ্র হওয়ায়, ঔষধের প্রভাব শরীর হতে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই দূরীভূত হয়ে যায়। ক্ষুদ্রতম মাত্রার ঔষধ ব্যবহার করার অর্থই হল সদৃশ লক্ষণ মতে ব্যবহার করার পর ঔষধশক্তি রোগশক্তির স্থানসমূহ দখল করে এবং রোগশক্তিকে দূরীভূত করার পর ঔষধশক্তির প্রাবল্যতা দেহের অর্গানসমূহের মধ্যে তখনও স্বল্প সময়ের জন্য থাকে। ক্ষুদ্রতম মাত্রা দেয়ার কারণে ঔষধের স্থিতিকাল ও আক্রান্ত কোষ বা টিস্যুসমূহকে স্বল্প সময়ের জন্য প্রভাবিত করে। মাত্রা যত ক্ষুদ্র হবে হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি তত সামান্য ও ক্ষণস্থায়ী হবে। বৃহৎমাত্রায় ঔষধ প্রয়োগ করলে ইহার ক্রিয়া দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, ফলে রোগীকে দুর্বল করে ও রোগারোগ্য হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি বেশি হয়।
সুতরাং মহাত্মা ডাঃ হ্যানিম্যানের মতে, আর্দশ আরোগ্য করতে হলে, ক্ষুদ্রতম মাত্রা ব্যবহার করতে হবে। অতএব, হোমিওপ্যাথিতে ক্ষুদ্রতম মাত্রার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অপরিসীম।
৪। ঔষধ প্রয়োগের উপযুক্ত সময় কখন? ১২, ১৪
বা, ঔষধ প্রয়োগের সর্বাপেক্ষা যথার্থ ও উপযুক্ত সময় কখন এবং কেন? ১৫, ১৬
ঔষধ প্রয়োগের উপযুক্ত সময়:
মহাত্মা বিজ্ঞানী ডাঃ হ্যানিম্যান "অর্গানন অব মেডিসিন" গ্রন্থের ২৩৬-২৩৭ নং অনুচ্ছেদে ঔষধ প্রয়োগের উপযুক্ত সময় সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
রোগের তীব্রতা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বা স্বল্পকাল পরে রোগী যখন কিছুটা স্বস্তিবোধ করতে থাকে এই সকল ক্ষেত্রে তখনই ঔষধ প্রয়োগ করার সর্বাপেক্ষা যথার্থ ও উপযুক্ত সময়। স্বাস্থ্য পুনরায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য ঔষধটি তখন দেহতন্ত্রে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধন করার সময় পায়। তাতে বিশেষ কোন গোলযোগ বা প্রচন্ড প্রতিক্রিয়া হয় না। উপরন্তু রোগের পুনরাক্রমণের ঠিক পূর্বে যথার্থ সুনির্বাচিত ঔষধও প্রয়োগ করা হলে ঔষধের ক্রিয়া এবং স্বাভাবিকভাবে পুনরাবর্তিত রোগ এক সঙ্গে মিলিত হয়। ফলে শরীরতন্ত্রে তখন প্রচন্ড প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় যে জীবন সংশয় হয়ে উঠে। প্রাণ হানী না হলেও রোগী মর্মান্তিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু রোগের তীব্রতা কমে যাবার সঙ্গে সঙ্গে অর্থাৎ জ্বরমুক্ত অবস্থা আরম্ভ হবার সময়ে এবং পরবর্তী পুনরাক্রমনের অবস্থা আসার দীর্ঘ সময় আগে ঔষধ প্রয়োগ করা হলে জীবনীশক্তি ঔষধের দ্বারা শান্তভাবে পরিবর্তিত হবার সর্বোত্তম সুযোগ পায় এবং স্বাস্থ্য এভাবে আবার প্রতিষ্ঠিত হয়।
অনেকগুলো দুষ্ট প্রকৃতির জ্বরেও দেখা যায় যে জ্বরযুক্ত অবস্থা খুবই অল্পক্ষণ স্থায়ী হয়। এমনও দেখা গেছে পূর্ববর্তী আক্রমণের অবশিষ্ট যন্ত্রণাসমূহ জ্বর মুক্ত অবস্থাকে আরো গোলযোগপূর্ণ করে তোলে এমতাবস্থায় ঘাম কমতে আরম্ভ করলে অথবা ক্ষয়িষ্ণু তীব্রতার পরবর্তী অবস্থা সমূহ হ্রাস পেতে আরম্ভ হলেই হোমিওপ্যাথিক ঔষধ প্রয়োগ করা উচিত।
৫। প্রশ্ন: ঘ্রাণে ঔষধ প্রয়োগ কি? কখন ঘ্রাণে ঔষধ প্রয়োগ করা হয়? ০৯, ১৪
ঘ্রাণে ঔষধ : মহাত্মা হ্যানিম্যান অর্গানন অব মেডিসিনের
২৮৪ নং অনুচ্ছেদে ঘ্রাণে ঔষধ প্রয়োগের কথা বলেছেন। ঘ্রাণে ঔষধ প্রয়োগ বলতে বুঝায় নাক দিয়ে তরল ঔষধের ঘ্রাণ নেয়া এবং শ্বাস গ্রহন করা। অথবা কোন রোগী যখন অচেতন অবস্থায় বা স্পর্শকাতর অবস্থায় থাকে তখন রোগীকে মুখের মাধ্যমে না দিয়ে ঘ্রাণের মাধ্যমে দেয়া হয়। দীর্ঘকাল রোগ ভোগের পর কোন রোগী দুর্বল হয়ে পড়লে সে রোগী যদি স্নায়ুবিক প্রবণ হয় তবে এই সকল রোগীর সামান্য মাত্রার ঔষধের প্রতিক্রিয়াও সহ্য করতে পারে না। এ সকল রোগীর ক্ষেত্রে ঘ্রাণে ঔষধ প্রয়োগ করা হয়।
রোগীকে ঔষধ সেবন করানো সম্ভবপর না হলে সুনির্বাচিত শক্তিকৃত ঔষধের ঘ্রাণ দিয়ে চিকিৎসা করতে হলে ছোট এক ড্রাম শিশির মধ্যে পানি মিশ্রিত সুরাসার নিয়ে তন্মধ্যে নির্বাচিত ঔষধের একটি অনুবটিকা ঝাঁকি দিয়ে মিলিয়ে দুই, তিন বা চারদিন পর পর ঘ্রাণের দ্বারা প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিবার ঘ্রাণ নিতে দেবার আগে শিশিটিকে ৮/১০ বার সজোরে ঝাঁকি দিতে হবে।
৬। প্রশ্ন: ঘ্রাণে ঔষধ প্রয়োগ পদ্ধতি বর্ণনা কর। ০৯
কখন ঘ্রাণে ঔষধ প্রয়োগ করা হয়? ইহার পদ্ধতি আলোচনা কর। ১৬
ঘ্রাণে ঔষধ প্রয়োগ পদ্ধতি বর্ণনা:
যে সকল রোগী অত্যধিক স্নায়ুবিক প্রবণ এবং সে জন্য অতিক্ষুদ্রতম মাত্রায় প্রয়োগকৃত ঔষধের প্রতিক্রিয়াও সহ্য করতে পারে না, তাদের ক্ষেত্রে সুনির্চিত ঔষধটিকে ঘ্রাণে প্রয়োগ করতে হয়। ঘ্রাণে ঔষধ প্রয়োগ করতে হলে একটি পরিষ্কার ১২০ মিঃ লিঃ শিশিতে চার ভাগের তিন ভাগ পরিশ্রুত পানিতে ৮/১০ ফোঁটা সুরাসার যোগ করতে হবে এই সুরাসার মিশ্রিত পানিতে সুনির্বাচিত ঔষধের দুইটি অনুবটিকা
ফেলে দ্রবীভূত করতে হবে। প্রতিদিন সকাল বেলা ঔষধ মিশ্রিত শিশিটিকে ১০ বার সজোরে ঝাঁকি দিয়ে শিশির কর্ক খুলে খালিপেটে রোগীকে একবার ঘ্রাণ গ্রহন করতে দিতে হবে। এভাবে কয়েকদিন ঔষধের ঘ্রাণ গ্রহন করার পর রোগীর উন্নতি পরিলক্ষিত হলে ঘ্রান নেয়া বন্ধ করতে হবে।
৭।প্রশ্ন: স্থুল মাত্রায় ঔষধ প্রয়োগে অসুবিধা সমূহ আলোচনা কর। ১০, ১২ বা, স্থুল মাত্রায় ঔষধ প্রয়োগে অসুবিধা কি? ১৬
স্থুল মাত্রায় ঔষধ প্রয়োগে অসুবিধাসমূহ নিম্নরূপ:
স্কুলমাত্রায় ঔষধের কুফলসমূহ বা বৃহৎমাত্রা ব্যবহারের ফলাফল নিম্নে উল্লেখ করা হল-
(i) স্কুলমাত্রার ঔষধ প্রয়োগের ফলে সদৃশ লক্ষণ হলেও রোগীর মধ্যে ঔষধের পরিমাণ বেশি মাত্রায় হওয়ার কারণে বৃদ্ধি লক্ষণ বৃদ্ধি পায়, একে হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি বলে।
(ii) স্থুলমাত্রার ঔষধের ব্যবহারের কারণে ইহার ক্রিয়া দীর্ঘকাল থাকার ফলে রোগীকে অত্যন্ত দুর্বল করে ফেলে।
(iii) স্থুলমাত্রায় ঔষধ প্রয়োগ করলে ঔষধের প্রাথমিক বা মূখ্য ক্রিয়ায় কিছুটা উপশম হলেও গৌণ বা জীবনীশক্তির প্রতিক্রিয়ার কুফল এ রোগী আরও অধিকতর ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
(iv) ঔষধ নির্বাচন সঠিক হলেও স্কুলমাত্রার কারণে ঔষধজ রোগে রোগীর জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে।
(v) শক্তিকৃত হোমিওপ্যাথি ঔষধ বড় মাত্রায় প্রয়োগের ফলে ইহার তীব্রতায় রোগীর মৃত্যু হতে পারে।
উপরিউক্ত বর্ণনা হতে ইহার প্রতীয়মান হয় যে, স্কুলমাত্রার ঔষধ দেহের বিশেষ কোন অর্গান বা দেহের বৃহৎ স্নায়ুতন্ত্রের উপর প্রভাব বিস্তারে রোগীর প্রচন্ড ক্ষতিসাধন করে।
৮। প্রয়োগকৃত ঔষধ ভুল হলে চিকিৎসকের কর্তব্য কি? ০৮, ০৯ প্রয়োগকৃত ঔষধ ভুল হলে চিকিৎসকের কর্তব্য।
প্রয়োগকৃত ঔষধ ভুল হলে চিকিৎসক তা রোগের হ্রাস-বৃদ্ধি দেখে বুঝতে পারেন। তরুণ বা পুরাতন রোগের ঔষধ প্রয়োগের পর অনেক সময় রোগীরা তাদের রোগের সামান্য হ্রাস বা বৃদ্ধির কথা জানায়। কিন্তু ঐ সামান্য হ্রাস বা বৃদ্ধির কথা সকলে হয়ত লক্ষ্য নাও করতে পারে এ ক্ষেত্রে রোগীর মানসিক ও সর্বাঙ্গীন অবস্থা দ্বারা ঔষধের প্রকৃত ক্রিয়া বুঝতে পারা যায়। রোগের সামান্য বৃদ্ধির সাথে সাথে রোগী আক্রান্ত বিমর্ষ ও নিরাশ হয়ে পড়ে এবং তার ভাবভঙ্গি ও ক্রিয়া কলাপ দ্বারাই বুঝতে পারা যায় বা প্রকাশ হয়ে পড়ে যে রোগীর রোগ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তখন তার মানসিক যন্ত্রনাগুলি বাক্য দ্বারা প্রকাশ করা না গেলেও রোগীকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করলেই বেশ বুঝতে পারা যায় যে তার রোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইহা হতেই চিকিৎসক বুঝতে পারেন যে অনুপোযুক্ত ঔষধ প্রদত্ত হয়েছে অর্থাৎ ব্যবস্থাপত্র ভুল হয়েছে। তখন চিকিৎসক সাথে সাথে রোগীকে উক্ত ঔষধের ক্রিয়ানাশক ঔষধ প্রয়োগ করবে।
৯। প্রশ্নঃ কি অবস্থায় পরিবর্তিত শক্তিতে প্রয়োগকৃত ঔষধ পুনঃপ্রয়োগ
করা হয়? ১০, ১১, ১২, ১৪
বা, ঔষধের পুনঃ প্রয়োগে কি কি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিৎ? ০৯ ঔষধের পুনঃপ্রয়োগে নিম্নলিখিত সতর্কতা অবলম্বনঃ
(i) রোগীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষন করতে হবে।
(ii) রোগীর স্নায়ুবিক বা দুর্বল হলে ঔষধ সূক্ষ্মমাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
(iii) ঔষধ প্রয়োগের পর উহার ক্রিয়া আরম্ভ হলে ঔষধ প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে।
(iv) বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিবার আক্রমণের পর আর একটি করে মাত্রা প্রয়োগ করা উচিত।
(v) মাত্রা পুনঃপ্রয়োগের নবতর নিয়ম অনুসারে প্রতিটি পরবর্তী মাত্রা প্রয়োগ করার পূর্বে শিশিকে সজোরে ১০/১২ বার ঝাঁকি দিয়ে ঔষধের শক্তিকে বর্ধিত করে প্রয়োগ করতে হবে।
১০। একক সময়ে একটি মাত্র ঔষধ প্রয়োগের কারণ কি? ১০ একক সময়ে একটি মাত্র ঔষধ প্রয়োগের কারণ:
ডাঃ হ্যানিম্যান তাঁর বিখ্যাত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা আইন "অর্গানন অব মেডিসিন” গ্রন্থে আদর্শ চিকিৎসকের বৈশিষ্ট্য, লক্ষ্য, গুণাবলী এবং রোগ ও রোগী, ঔষধ প্রস্তুত প্রয়োগ, আরোগ্য পথে বাধা বিভিন্ন ধরণের রোগ চিকিৎসা পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে আলোকপাত করেছেন। তাঁর মতে প্রাকৃতিক আরোগ্যনীতি- সিমিলিয়া সিমিলিবাস কিউরেন্টার অর্থাৎ সদৃশ দ্বারা সদৃশ আরোগ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
হোমিওপ্যাথিতে ঔষধ প্রুভ হয়েছে এককভাবে সুস্থ, শিক্ষিত সৎ আদর্শবান ব্যক্তির উপর। ইহাতে প্রতিটি ঔষধের সুনির্দিষ্ট লক্ষণ প্রকাশিত হয়েছে। প্রয়োগনীতি হল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও বস্তুস্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে ঔষধ নির্বাচন করা। অর্থাৎ ব্যক্তিগত রোগীর রোগচিত্রের অনুরূপ ঔষধের একটি কৃত্রিম রোগচিত্র অনুসারে ঔষধ প্রয়োগ করা। হোমিওপ্যাথিক অনন্য বিধান বস্তু ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যতার কারণে একাধিক ঔষধ কখনও সদৃশ্য হতে পারে না। দুইটি ঔষধ একত্রে প্রয়োগ করলে উভয়ের ক্রিয়ার মধ্যে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠে। হোমিওপ্যাথির নিয়মনীতি অনুসারে কখনও দুইটি ঔষধ একত্রে পরীক্ষিত হয় নাই। সুতরাং আকাঙ্খিত আদর্শ আরোগ্য আশা করা যায় না।
অতএব উপরোক্ত কারণে একবার একটিমাত্র ঔষধ প্রমোশ করা উচিত।
১১। প্রশ্ন: অপরিমিত মাত্রায় ঔষধ পুনঃপ্রয়োগের কুফল আলোচনা কর। ০৮
বা, একই শক্তির ঔষধ অপরিবর্তিত অবস্থায় দ্বিতীয় বার প্রয়োগ করা অযৌক্তিক -কারণ ব্যাখ্যা কর। ১৪
অপরিমিত মাত্রায় ঔষধ পুনঃপ্রয়োগের কুফল:
চিকিৎসা ক্ষেত্রে নির্বাচিত ঔষধের শক্তি অপরিবর্তিতভাবে প্রয়োগ করলে জীবনীশক্তি তা কখনও অবাধে গ্রহন করে না। কারণ ঔষধের প্রথম মাত্রাই আরোগ্য সাধনকালে জীবনীশক্তি আকাংখিত পরিবর্তন করে। কাজেই ঐ একই শক্তি দ্বিতীয় মাত্রা পরিবর্তন জীবনীশক্তির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে পারে না। তাই অপরিবর্তিত শক্তির ঔষধ পুনঃপ্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে।
আরোগ্য ত্বরান্বিত করার জন্য অল্পক্ষণ পরপর প্রয়োগ করা অথবা একই শক্তির ঔষধ অপরিবর্তিত মাত্রায় প্রয়োগ করা উচিত নয়।
এমন কি একই শক্তির ঔষধ অপরিবর্তিত অবস্থায় দ্বিতীয়বার প্রয়োগ গ্রহন করাও উচিত নয়। কারণ সেরূপ অপরিবর্তিত মাত্রাকে জীবনীশক্তি কখনো বিনা বাঁধায় গ্রহন করে না। অর্থাৎ আরোগ্য যোগ্য সদৃশ রোগ লক্ষণ ছাড়াও ঔষধের অন্যান্য লক্ষণ বিকশিত হয়। পূর্ববর্তী মাত্রা আগেই জীবনীশক্তির উপর বঞ্চিত পরিবর্তন সাধন করেছেন, কাজেই সে একই ঔষধের গতিশীল সম্পূর্ণ সদৃশ অপরিবর্তিত দ্বিতীয় মাত্রা জীবনীশক্তির মধ্যে ঠিক পূর্বের অবস্থা সমূহ আর দেখতে পায় না। সে ধরনের অপরিবর্তিত শক্তির ঔষধ আরো প্রয়োগ করা হলে রোগী বাস্তবিক পক্ষে আরো অন্যভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে, এমন কি পূর্বাপেক্ষা অধিকতর অসুস্থ হতে পারে কারণ এই অবস্থায় প্রযুক্ত ঔষধের লক্ষণগুলোই ক্রিয়াশীল থাকে, মূল রোগ লক্ষণের সহিত তাদের কোন সাদৃশ্য থাকে না। কাজেই আরোগ্যের পথে কোনরূপ অগ্রগতি সাধিত হয় না। বরং রোগীর অবস্থা বাস্তবিক বৃদ্ধি হয়ে থাকে। কিন্তু যদি পরবর্তী মাত্রাগুলো প্রতিবারেই সামান্য পরিবর্তন করে অর্থাৎ কতটা উচ্চতর শক্তিতে পরিণত করে প্রয়োগ করা হয়। তবে জীবনী শক্তি সে ঔষধের সাহায্যে কোনরূপ বাধা ছাড়াই পরিবর্তিত হয় অর্থাৎ প্রাকৃতিক রোগের অনুভূতি কমতে থাকে এভাবে আরোগ্য অধিকতর নিকটবর্তী হয়।
১২। প্রশ্ন: হোমিওপ্যাথিতে একাধিক ঔষধ প্রয়োগ করা হয় না কেন? বা, কেন একবারে একটি মাত্র ঔষধ রোগীকে প্রয়োগ করা উচিত? ১১ বা, একাধিক ঔষধের মিশ্রণ প্রয়োগের ফলাফল আলোচনা কর। ১৩
হোমিওপ্যাথিতে একাধিক ঔষধ প্রয়োগ না হওয়ার কারণ:
ডাঃ হ্যানিম্যান তাঁর বিখ্যাত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা আইন "অর্গানন অব মেডিসিন” গ্রন্থে আদর্শ চিকিৎসকের বৈশিষ্ট্য, লক্ষ্য, গুণাবলী এবং রোগ ও রোগী, ঔষধ প্রস্তুত-প্রয়োগ, আরোগ্য পথে বাধা বিভিন্ন ধরণের রোগ চিকিৎসা পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে আলোকপাত করছেন। তার মতে প্রাকৃতিক আরোগ্যনীতি, সিমিলিয়া সিমিলিবাস কিউরেন্টার অর্থাৎ সদৃশ দ্বারা সদৃশ আরোগ্য হোক, এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হোমিওপ্যাথিতে ঔষধ প্রুভ হয়েছে এককভাবে, সুস্থ, শিক্ষিত সৎ আদর্শবান ব্যক্তির উপর। ইহাতে প্রতিটি ঔষধের সুনির্দিষ্ট লক্ষণ প্রকাশিত হয়েছে। প্রয়োগনীতি হল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও বস্তুস্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে ঔষধ নির্বাচন অর্থাৎ ব্যক্তিগত রোগীর রোগচিত্রের অনুরূপ ঔষধের একটি কৃত্রিম রোগচিত্র অনুসারে ঔষধ প্রয়োগ করা হোমিওপ্যাথিক অনন্য বিধান। বস্তু ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যতার কারণে একাধিক ঔষধ কখন ও সদৃশ্য হতে পারে না। দুইটি ঔষধ একত্রে প্রয়োগ করলে উভয়ের ক্রিয়ার মধ্যে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠে। সুতরাং আকাঙ্খিত আরোগ্য আশা করা যায় না। এট অতএব হোমিওপ্যাথিতে একাধিক ঔষধ প্রয়োগ করা হয় না
১৩। প্রশ্ন: কখন ঔষধের পুনঃপ্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে? ০৯ কখন ঔষধের পুনঃপ্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে:
নিম্নলিখিত অবস্থায় ঔষধে পুনঃপ্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে।
(i) যতক্ষণ পর্যন্ত প্রদত্ত ঔষধ ক্রিয়া করছে বলে প্রতীয়মান হবে ততক্ষণ ঔষধের পুনঃপ্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে।
(ii) প্রদত্ত ঔষধের ক্রিয়াজনিত লক্ষণ যতক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান থাকবে ততক্ষণ পুনঃপ্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে।
(iii) রোগীর ভাললাগা বোধ যতক্ষণ পর্যন্ত অক্ষুন্ন থাকবে ততক্ষণ পুনঃপ্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে।
(iv) পুরাতন চর্মরোগ বা অন্য কোন উদ্ভেদ পুরাতন ক্ষত, ফিশ্চুলা ইত্যাদি পুনরায় দেখা দিলে ঔষধের পুনঃপ্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে।
১৪। প্রশ্ন: প্রয়োগকৃত ঔষধের পুনঃ প্রয়োগ এর শর্তাবলী লিখ। ১৩ প্রয়োগকৃত ঔষধের পুনঃ প্রয়োগ এর শর্তাবলী:
রোগীর ক্রমোন্নতি অব্যাহত থাকলে এবং জীবনে কখনো ভোগ করেন নাই এমন কোন লক্ষণ এসে উপস্থিত না হলে এভাবেই ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে। এরূপ ঘটলে অর্থাৎ নতুন কোন লক্ষণ দেখা দিলে রোগের বাদবাকী লক্ষণ সমষ্টি একটির পর একটি মিলিত হয়ে পরিবর্তিত অবস্থায় প্রকাশিত হলে গত ঔষধটির বদলে আর একটি অধিকতর সদৃশ ঔষধ নির্বাচন করে একইভাবে পুনঃপুনঃ প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু মিশ্রণের প্রতিটি মাত্রার শক্তি কে প্রয়োগের পূর্বে খুব জোরে ঝাঁকি দিয়ে কিছুটা পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত করার কথা মনে রাখতে হবে। পক্ষান্তরে সুনির্বাচিত ঔষধ প্রায় প্রতিদিন সেবন করার সময় চিররোগের শেষের দিকে তথাকথিত হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি দেখা দিলে রোগের অবশিষ্ট লক্ষণসমূহ কিছুটা আবার বৃদ্ধি হয়েছে বলে মনে হয়। মূল রোগের সদৃশ ঔষধ জনিত রোগই এখন শুধু ক্রমাগত বিকশিত
হতে থাকে। এমতাবস্থায় ঔষধের মাত্রাকে আরো কমাতে হবে এবং দীর্ঘদিন পর প্রয়োগ করতে হবে এবং আরোগ্য উন্মুক্ত অবস্থায় আর ঔষধের প্রয়োজন আছে কিনা দেখবার জন্য সম্ভবত কয়েকদিন ঔষধ বন্ধ রাখতে হবে। ঔষধের আধিক্যবশত আপাত লক্ষণসমূহ শীঘ্রই অন্তর্হিত হয় এবং তৎক্ষেত্রে অবিকৃত স্বাস্থ্যই বিরাজ করে।
১৫। প্রশ্ন: নতুন শক্তির মাতৃশক্তির ২১ এর প্রস্তুত প্রণালী আলোচনা কর। ১২
নতুন শক্তির মাতৃশক্তির ৭১ এর প্রস্তুত প্রণালী:
যে সব ভেষজ পদার্থ আঠাল, পিচ্ছিল, যাদের রস চটচটে এবং এলকোহলে সহজে দ্রবীভূত হয় না এরূপ পদার্থ হতে মূল অরিষ্ট প্রস্তুত করার জন্য যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, তাকে মেসারেশন বলে। কোন চূর্ণ ভেষজ পদার্থকে অনেক দিন যাবৎ কোন দ্রবণীয় মাধ্যমে সিক্ত করে রাখা হয় ও মাঝে মাঝে নাড়াচাড়া করা হয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না দ্রবণীয় মাধ্যমে দ্রবীভূত বস্তুর কৌষিক গঠন সম্পূর্ণরূপে মিশে যায়। ভেষজ দ্রব্য হতে ঔষধ তৈরীর বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে মেসারেশন পদ্ধতি অন্যতম।
দশমিক পদ্ধতিঃ ঔষেধের ( ১ প্রস্তুত করতে হলে ২ ভাগ মূল অরিষ্ট এবং ৮ ভাগ ক্ষীণ সুরাসার মিশ্রিত করে দশবার ঝাঁকি দিতে হয়।
শততমিক পদ্ধতি: মূল ঔষধের শক্তি ১/২ হওয়ায় ২১ প্রস্তুত করতে হলে মূল অবিষ্টের ২ ভাগ এবং ক্ষীণ সুরাসার ৯৮ ভাগ মিশ্রিত করতে হয়।
0 মন্তব্যসমূহ