অর্গানন অব মেডিসিন (তৃতীয় বর্ষ)
দশম অধ্যায়
রোগীর রোগ আরোগ্যের নিদর্শন ও রোগের হ্রাস-বৃদ্ধি (২৫২-২৫৬)
অনুচ্ছেদ নং- ২৫২
অন্যান্য সুনির্বাচিত এন্টিসোরিক ঔষধসমূহ যথাযথ ক্ষুদ্রতম মাত্রায় প্রয়োগ করার পরও চির প্রকৃতির সোরাজাত রোগীর ক্ষেত্রে কোন উন্নতি পরিলক্ষিত না হলে নিশ্চিতভাবে বুঝতে হবে রোগের উত্তেজক কারণটি এখনো বর্তমান রয়েছে। রোগীর জীবনযাত্রা প্রণালী বা পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে কোন ব্যতিক্রম হয়েছে। স্থায়ীভাবে আরোগ্য সাধনের জন্য এই সমস্ত নিশ্চিতভাবে দূর করতে হবে।
অনুচ্ছেদ নং- ২৫৩
সর্ব প্রকারের রোগে বিশেষ করে সংকট জনক রোগ সমূহের ক্ষেত্রে উপশম বা বৃদ্ধির সামান্য সূচনা সকলের কাছে বোধগম্য হয় না।
কিন্তু অন্যান্য লক্ষণের মধ্যে মানসিক অবস্থা ও রোগীর সামগ্রিক চালচলন হতে আমরা সর্বাপেক্ষা নিশ্চিত ও শিক্ষাপ্রদ তত্ত্ব পেয়ে থাকি।
একটুখানি উন্নতি হলেই রোগী অধিকতর স্বস্তিবোধ করতে থাকেন এবং রোগীর মানসিক শান্তি স্বাচ্ছন্দতা ও প্রফুল্লতা বেড়ে যেতে থাকে। রোগী প্রায় স্বাভাবিক অবস্থায় পুনরায় ফিরে যেতে আমরা দেখতে পাই। পক্ষান্তরে সামান্য মাত্র বৃদ্ধি আরম্ভ হলেই আমরা ইহার বিপরীত অবস্থা লক্ষ্য করি। যেমন রোগীর প্রকৃতিতে মানসিক অবস্থায় অথবা সর্বপ্রকার আচরনে অঙ্গভঙ্গীতে, ভাবভঙ্গীতে ও কাজকর্মে, অস্বাচ্ছন্দ্যতা, অসহায় শোচনীয় অবস্থা মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করলে সহজেই প্রতিয়মান হয় কিন্তু তা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না।
অনুচ্ছেদ নং- ২৫৪
অপরাপর নতুন বা বৃদ্ধি প্রাপ্ত লক্ষণ সমূহ দেখলে অথবা পক্ষান্তরে নতুন কোন লক্ষণের বিকাশ ছাড়াই মূল লক্ষণ সমূহ কমে গেলেই সতর্ক পর্যবেক্ষক ও অনুসন্ধিৎসু চিকিৎসা বিজ্ঞানীর মন হতে রোগের বৃদ্ধি বা উপশমের ব্যাপারে অচিরেই সর্বপ্রকার সন্দেহ বিদূরিত হয়ে যাবে। অবশ্যই রোগীদের মধ্যে কেহ কেহ হ্রাস বৃদ্ধির বিবরণ দিতে সমর্থ হন না বা সে বিষয় স্বীকার করতে চান না।
অনুচ্ছেদ নং- ২৫৫
রোগীলিপিতে পূর্ব বিবৃত লক্ষণরাজী একে একে রোগীর সাথে আলোচনা করলে সেগুলো ছাড়া অন্য কোন নতুন অস্বাভাবিক লক্ষণের কথা রোগী না বললেও পুরাতন অবস্থার কোনরূপ বৃদ্ধি না ঘটলে এই হ্রাস-বৃদ্ধির বিষয় ঐ ধরণের অজ্ঞ ও কপট রোগীদের সম্বন্ধে আমরা সন্দেহমুক্ত হতে পারি। এরূপ ঘটলে এবং রোগীর প্রকৃতি ও মানসিকতার উন্নতি পরিলক্ষিত হলেই বুঝতে হবে ঔষধ নিশ্চিতভাবেই রোগীর উপকার সাধন করেছে অথবা যদি এই জন্য অর্থাৎ উপশমের জন্য প্রয়োজনীয় সময় এখনো অতিবাহিত না হয়ে থাকে তাহলে সুনির্বাচিত ঔষধ অচিরেই কার্যকরী হবে। তারপরেও উন্নতির লক্ষণ পরিস্ফুট হতে বিলম্ব ঘটলে বুঝতে হবে রোগীর জীবনযাপন প্রণালীতে কোন ত্রুটি আছে অথবা পরিবেশের মধ্যে কোন গোলযোগ আছে।
অনুচ্ছেদ নং- ২৫৬
আবার যদি দেখা যায় রোগী কোন নতুন দূর্ঘটনা বা প্রয়োজনীয় লক্ষণের কথা প্রকাশ করলেই বুঝতে হবে ঔষধটি যথার্থ সদৃশ বিধান মতে হয় নাই। ফুসফুসে স্ফোটক যুক্ত যক্ষ্মা রোগীরা সচরাচর যেমন বলে থাকেন। তেমনি সৌজন্য বশতঃ এই ক্ষেত্রেও যদি রোগী ভাল আছেন বলে আশ্বাস প্রদান করলে সেই আশ্বাসে আমাদের বিশ্বাস করা উচিত নয় বরং সে অবস্থা রোগের বৃদ্ধি জনিত বলে বিবেচনা করতে হবে। এই শীঘ্রই তা সম্যকরূপ পরিস্ফুট হয়ে উঠবে।
১। প্রশ্নঃ ঔষধর্জঃ বৃদ্ধি এবং হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় কর।
০৮, ১০, ১৪
বা, হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি এবং ঔষধজ বৃদ্ধির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় কর। ১৬ হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি ও ঔষধজ বৃদ্ধির মধ্যে পার্থক্য:
হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি
১। সদৃশ বিধানে নির্বাচিত ঔষধ সঠিক হলে এবং ঔষধের মাত্রা বেশি হওয়ার কারণে হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি দেখা দেয়।
২। ইহা ক্ষণস্থায়ী।
৩। ইহাতে রোগীর জীবনীশক্তির তেমন ক্ষতি হয় না।
৪। ইহাতে রোগীর কষ্ট বৃদ্ধি স্বত্বেও রোগী সামগ্রিকভাবে সুস্থ্যতা অনুভব করে।
৫। হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি মোটামুটি শুভ।
ঔষধজ বৃদ্ধি
১। রোগীর দেহে প্রয়োগকৃত ঔষধ ভুল হলে ঔষধজ বৃদ্ধি দেখা দেয়।
২। ইহা দীর্ঘস্থায়ী।
৩। ইহাতে রোগীর জীবনীশক্তির বিপর্যয় ঘটে।
৪। ইহাতে রোগীর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে যায়।
৫। ঔষধজ বৃদ্ধি রোগীর জন্য অশুভ, এতে রোগীর জীবনে আর্দশ আরোগ্য ব্যাঘাত ঘটে।
২। প্রশ্ন: হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি কি? ইহার কারণ আলোচনা কর। ০৯, ১৪
বা. হোমিওপ্যাথিক এগ্রাভেশন বলিতে কি বুঝ? ০৮, ১২
হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি:
সদৃশ বিধান মতে সুনির্বাচিত ঔষধের স্বল্পমাত্রার প্রয়োগে রোগ নিরূপদ্রবে দূরীভূত হয়ে যায়। কিন্তু যদি নির্বাচিত ঔষধ অতিরিক্ত মাত্রায় প্রয়োগ করা হয় তখন রোগশক্তির চেয়ে ঔষধশক্তি বেশি হওয়ায় সদৃশ বিধান মতে জীবনীশক্তি রোগশক্তির কবল হতে মুক্ত হলে ও প্রবলতর ঔষধশক্তি স্বাভাবিক নিয়মে সদ্যমুক্ত জীবনীশক্তিকে আক্রমন করে পীড়িত করে। হোমিওপ্যাথিক সদৃশ ঔষধের কারণে এই বৃদ্ধি ঘটে থাকে বলে, ইহাকে হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি বলে।
হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধির কারণ:
জীবনীশক্তির এই পীড়িত লক্ষণ বিগত রোগের লক্ষণের চেয়ে প্রবলতর কারণ ইহা ঔষধজনিত। রোগী মনে করে যে, তার মূল রোগটি বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে উহা কিঞ্চিত বর্ধিত আকারে ঔষধের রোগ ছাড়া আর কিছুই নয়। হোমিওপ্যাথিক সদৃশ ঔষধের কারণে এই বৃদ্ধি ঘটে। রোগশক্তি অপেক্ষা সদৃশ লক্ষণে অধিকতর শক্তিশালী ঔষধ শক্তির প্রয়োগ ফল।
৩। প্রশ্ন: মেডিসিনাল এগ্রাভেশন কাকে বলে? ০৮, ১০, ১২
মেডিসিনাল এগ্রাভেশন:
ডাঃ স্যামুয়েল হ্যানিম্যান "অর্গানন অব মেডিসিন” গ্রন্থের ১৫৭নং অনুচ্ছেদে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় চিকিৎসকের মেডিসিনাল এগ্রাভেশন সম্বন্ধে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
সদৃশ বিধান মতে নির্বাচিত ঔষধ উহার উপযুক্ততা ও মাত্রার ক্ষুদ্রতার জন্যই অন্য কোন বিসদৃশ লক্ষণ প্রকাশ না করে অর্থাৎ নতুন কোন গুরুতর বিশৃংঙ্খলা উৎপাদন না করে সদৃশ অচির রোগকে স্বাচ্ছন্দে অপসারিত ও ধ্বংস করে, তথাপি মাত্রা যথেষ্ট ক্ষুদ্র না হলে ঔষধ প্রয়োগের অব্যবহিত পরেই প্রথম ঘন্টায় বা কয়েক ঘন্টার জন্য রোগের সামান্য একটু বৃদ্ধি দেখা যায়। এই বৃদ্ধি মূল রোগের এত সদৃশ হয় যে রোগী মনে করে ইহা তার নিজ রোগের বৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু ইহা প্রকৃত পক্ষে মূল রোগ অপেক্ষা কিছু বেশী শক্তিশালী সদৃশ ঔষধজাত রোগ ছাড়া আর কিছুই নয়।
৪। প্রশ্নঃ ঔষধ কাকে বলে? ঔষধজঃ বৃদ্ধি বলতে কি বুঝ? ১০
ঔষধ এর সংজ্ঞা (Medicine): বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে ফার্মাকোপিয়ার নির্দিষ্ট ফর্মুলা অনুযায়ী ভেষজ পদার্থ হতে প্রস্তুতকৃত পদার্থ যা চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুসারে আভ্যন্তরিন বা বাহ্যিক প্রয়োগে রোগারোগ্য এবং রোগ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়, তাকে ঔষধ বলে।
ওষুধজঃ বৃদ্ধিঃ
সদৃশ বিধান মতে নির্বাচিত ঔষধ উহার উপযুক্ততা ও মাত্রার ক্ষুদ্রতার জন্যই অন্য কোন বিসদৃশ লক্ষণ প্রকাশ না করে অর্থাৎ নতুন কোন গুরুতর বিশৃংঙ্খলা উৎপাদন না করে সদৃশ অচির রোগকে স্বাচ্ছন্দে অপসারিত ও ধ্বংস করে, তথাপি মাত্রা যথেষ্ট ক্ষুদ্র না হলে ঔষধ প্রয়োগের অব্যবহিত পরেই প্রথম ঘন্টায় বা কয়েক ঘন্টার জন্য রোগের সামান্য একটু বৃদ্ধি দেখা যায়। এই বৃদ্ধি মূল রোগের এত সদৃশ হয় যে রোগী মনে করে ইহা তার নিজ রোগের বৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু ইহা প্রকৃত পক্ষে মূল রোগ অপেক্ষা কিছু বেশী শক্তিশালী সদৃশ ঔষধজাত রোগ ছাড়া আর কিছুই নয়।
৫। প্রশ্নঃ ঔষধ কি? অমোঘ ঔষধ বলিতে কি বুঝ?
বা, অমোঘ ঔষধ বলতে কি বুঝ। বর্ণনা কর।
ডাঃ স্যামুয়েল হ্যানিম্যান "অর্গানন অব মেডিসিন” গ্রন্থের ১৪৭নং অনুচ্ছেদে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় অমোঘ ঔষধ ব্যবহার সম্বন্ধে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
তাঁর মতে "মানব স্বাস্থ্য পরিবর্তন করার শক্তি সম্বন্ধে যে সকল ঔষধ অনুসন্ধান করা হয়েছে এদের মধ্যে যে ঔষধটির লক্ষণাবলীর সহিত কোন প্রাকৃতিক রোগের লক্ষণসমষ্টির সর্বাধিক সাদৃশ্য হবে সে ঔষধটিই ঐ রোগের সর্বাপেক্ষা উপযোগী ও সুনিশ্চিত হোমিওপ্যাথিক ঔষধ। এ রোগের জন্যই ইহা অমোঘ (Specific) ঔষধরূপে পরিগণিত হবে।"
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি। এখানে লক্ষণের গুরুত্ব সর্বাধিক। অতএব, সুস্থ মানুষের দেহে পরীক্ষিত ঔষধের লক্ষণের সাথে যদি রোগীর রোগ লক্ষণের সাথে মিলে যায়, তবে তাই ঐ রোগীর জন্য অমোঘ ঔষধ।
৬। প্রশ্নঃ রোগের হ্রাস-বৃদ্ধি সম্পর্কে আলোচনা কর। ১৩
রোগের হ্রাস-বৃদ্ধি সম্পর্কে আলোচনাঃ
সর্ব প্রকারের রোগে বিশেষ করে সংকট জনক রোগ সমূহের ক্ষেত্রে উপশম বা বৃদ্ধির সামান্য সূচনা সকলের কাছে বোধগম্য হয় না। কিন্তু অন্যান্য লক্ষণের মধ্যে মানসিক অবস্থা ও রোগীর সামগ্রিক চালচলন হতে আমরা সর্বাপেক্ষা নিশ্চিত ও শিক্ষাপ্রদ তত্ত্ব পেয়ে থাকি। একটুখানি উন্নতি হলেই রোগী অধিকতর স্বস্তিবোধ করতে থাকেন এবং রোগীর মানসিক শান্তি স্বাচ্ছন্দতা ও প্রফুল্লতা বেড়ে যেতে থাকে। রোগী প্রায় স্বাভাবিক অবস্থায় পূনরায় ফিরে যেতে আমরা দেখতে পাই। পক্ষান্তরে সামান্য মাত্র বৃদ্ধি আরম্ভ হলেই আমরা ইহার বিপরীত অবস্থা লক্ষ্য করি। যেমন- রোগীর প্রকৃতিতে মানসিক অবস্থায় অথবা সর্বপ্রকার আচরনের অঙ্গভঙ্গীতে, ভাবভঙ্গীতে ও কাজকর্মে অস্বাচ্ছন্দতা অসহায় শোচনীয় অবস্থা মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করলে সহজেই প্রতীয়মান হয় কিন্তু তা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না।
৭। প্রশ্নঃ কিভাবে বুঝবে, ইহা হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি?
নিম্নলিখিতভাবে বুঝবো, ইহা হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধিঃ
সদৃশ বিধানে নির্বাচিত ঔষধ সঠিক হলে এবং ঔষধরে মাত্রা বেশি হওয়ার কারণে হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি দেখা দেয়। ইহা ক্ষণস্থায়ী। ইহাতে রোগীর জীবনীশক্তির তেমন ক্ষতি হয় না। ইহাতে রোগীর কষ্ট বৃদ্ধি স্বত্বেও রোগী সামগ্রিকভাবে সুস্থ্যতা অনুভব করে। হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি মোটামুটি শুভ। ঔষধ প্রয়োগ বন্ধ রাখলে হোমিওপ্যাথি বৃদ্ধিতে প্রকাশিত লক্ষণাবলী দূরীভূত হয়।
0 মন্তব্যসমূহ