অর্গানন অব মেডিসিন (তৃতীয় বর্ষ)
পঞ্চদশ অধ্যায়
হোমিওপ্যাথিক ঔষধের শক্তি ও মাত্রা এবং ঔষধ প্রয়োগের কৌশল
(২৯৫-২৮৫)
অনুচ্ছেদ নং- ২৭৫
রোগীর ক্ষেত্রে ঔষধের উপযোগীতা কেবলমাত্র যথার্থ সদৃশ। নির্বাচনের ওপরই নির্ভর করে না, মাত্রার উপযুক্ত আকার অর্থাৎ ক্ষুদ্রত্বের উপরও ঔষধের উপযোগিতা নির্ভর করে। আমাদের চিকিৎসিত কোন একটি রোগীর রুগ্নাবস্থার সম্পূর্ণ সদৃশ ঔষধও আমরা যদি অত্যন্ত বড় মাত্রায় প্রয়োগ করি তাহলে ইহার নিজস্ব সহজাত হিতকারী চরিত্র থাকা সত্বেও কেবল পরিমাপের আধিক্যবশত ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হয়। তা সদৃশ বিধানমতে সদৃশ ক্রিয়া প্রকাশ করে জীবনীশক্তিকে আক্রমন করে এবং তার মাধ্যমে শরীরতন্ত্রেও অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও প্রাকৃতিক রোগের দ্বারা অংগসমূহের উপর অনাবশ্যক ও প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে।
অনুচ্ছেদ নং- ২৭৬
এই জন্যই কোন ঔষধ রোগীর ক্ষেত্রে সদৃশ বিধানমতে উপযোগী হওয়া সত্বেও মাত্রা অত্যন্ত বড় হলে তার প্রতিটি মাত্রায় ক্ষতি সাধন করে এবং ঔষধ যত বেশী রোগের সদৃশ হয় ও যতই উচ্চশক্তিতে নির্বাচিত হয় তার বড় মাত্রাসমূহ ততোধিক ক্ষতি করে। উহা অসদৃশ ও রুগ্নাবস্থায় সম্পূর্ণ অনুপযোগী ঔষধের ঐরূপ বড় মাত্রা অপেক্ষা আরো বেশী ক্ষতিকর হয়ে থাকে। সুনির্বাচিত হোমিওপ্যাথিক ঔষধের বড় মাত্রাসমূহ বিশেষ করে ঘনঘন প্রয়োগ করা হলে স্বাভাবিক নিয়মেই প্রভূত ক্ষতি সাধন করে। এরা অর্থাৎ বড় মাত্রাসমূহ প্রায়ই রোগীর জীবন বিপন্ন করে তোলে অথবা রোগকে অসাধ্য করে দেয়। জীবনীশক্তির অনুভূতির দিক হতে এরা প্রাকৃতিক রোগকে ধ্বংস করে দেয় এবং হোমিওপ্যাথিক ঔষধের বড় মাত্রা ব্যবহারের সময় হতে রোগ আর মূলরোগ ভোগ করে না ঠিকই কিন্তু তার ফলে রোগী সদৃশ অধিকতর উগ্র ঔষধজাত রোগের দ্বারা অধিকতর রুগ্ন হয়ে পড়েন। সেই রোগ দূর করা সর্বাপেক্ষা দুঃসাধ্য।
অনুচ্ছেদ নং- ২৭৭
সেই একই কারণে এবং যেহেতু কোন ঔষধের মাত্রা যত বেশী ক্ষুদ্র হবে যথা বেশী সদৃশভাবে সুনির্বাচিত হবে তা তত বেশী হিতকারী ও আশ্চার্যজনক ভাবে কার্যকরী হবে। সেজন্য কোন ঔষধ যথার্থ সদৃশভাবে নির্বাচিত হলেও তার মাত্রাকে স্বাচ্ছন্দ আরোগ্যের উপযোগী পর্যায়ে হ্রাস করা হলে তা অধিকতর হিতকারী হয়।
অনুচ্ছেদ নং- ২৭৮
এখানে একটি সংশয় দেখা দিতে পারে সুনিশ্চিত স্বাচ্ছন্দ আরোগ্যের পক্ষে সর্বাপেক্ষা উপযোগী মাত্রার ক্ষুদ্রত্বের পর্যায় কি? অর্থাৎ কোন রোগের সর্বোত্তম আরোগ্যের জন্য সদৃশ বিদানমতে নির্বাচিত প্রত্যেকটি ঔষধের মাত্রাকে কতখানি ক্ষুদ্র করতে হবে? এই সমস্যার সমাধানের জন্য এবং প্রত্যেকটি ঔষধের কি পরিমান মাত্রা আরোগ্য সাধনের জন্য যথেষ্ট অথচ এত ক্ষুদ্র যে তার দ্বারা সর্বাপেক্ষা স্বাচ্ছন্দ ও দ্রুত আরোগ্য বিধান করা যায়। এই প্রশ্নের সমাধান কি আনুমানিক চিন্তায় সূক্ষ্মযুক্তিতে অথবা লম্বা চওড়া কুতর্কের দ্বারা আশা করা যায়: সর্ব প্রকার কাল্পনিক রোগের একটি অগ্রিম তালিকা প্রস্তুত করার মতই তা অসম্ভব। নির্ভুল পরীক্ষা প্রতিটি রোগীর অনুভূতির সতর্ক পর্যবেক্ষণ এবং যথার্থ অভিজ্ঞতাই প্রত্যেকটি রোগীর ক্ষেত্রে ইহা স্থির করতে পারে। পুরাতন পদ্ধতির অনুপযোগী এ্যালোপ্যাথিক ঔষধ সমূহের স্কুল মাত্রার কথা এখানে উত্থাপন করা অসংগত। কারণ এরা শরীরতন্ত্রের রুগ্ন অংশসমূহকে সদৃশ বিধান সম্মতভাবে স্পর্শ করে না বরঞ্চ রোগের দ্বারা বিকৃত হয় নাই এমন অংশকেই আক্রমণ করে। কিন্তু তা সম্পূর্ণ বিপরীত সদৃশ আরোগ্যের জন্য ক্ষুদ্রমাত্রা প্রয়োজনীয়তার কথা বিশুদ্ধ অভিজ্ঞতা হতেই আমরা লাভ করি।
অনুচ্ছেদ নং- ২৭৯
বিশুদ্ধ অভিজ্ঞতা হতে ইহা ব্যাপকভাবে (universally) পরিলক্ষিত হয় যে, রোগটি যদি স্পষ্টতঃ দেহের প্রধাণ তন্ত্রের বিশেষ অপচয়ের উপর নির্ভর না করে এমন কি ইহা যদি চির ও জটিল প্রকৃতির রোগের অর্ন্তভুক্ত হয় এবং চিকিৎসাকালে রোগীকে যদি সর্বপ্রকার বিরুদ্ধ ঔষধের প্রভাব হতে দূরে রাখা হয়, তাহলে কোন গুরুতর রোগে বিশেষতঃ চিররোগের চিকিৎসা আরম্ভ করতে প্রস্তুত করা যায় না যা প্রাকৃতিক রোগ অপেক্ষা অধিকতর শক্তিশালী হবে না অথবা তাকে অন্ততঃ আংশিকভাবে পরাভূত করতে পারবে না এবং জীবনীশক্তির অনুভূতির স্তর হতে ইহাকে নিরসণ করে আরোগ্যের সূচনা করতে সক্ষম হবে না।
অনুচ্ছেদ নং- ২৮০
নতুন কষ্টকর উপসর্গ সৃষ্টি না করে ঔষধের যে মাত্রাটির দ্বারা উপকার পাওয়া যায় এবং যতদিন স্বাভাবিক উন্নতি অব্যাহত থেকে রোগী এক বা একাধিক পুরাতন প্রাথমিক যন্ত্রনা মৃদুভাবে উপলব্দি করতে আরম্ভ না করে ততদিন সেই মাত্রাকে ক্রমোন্নত শক্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। প্রত্যেকবার ঝাঁকি দিয়ে পরিবর্তিত ক্রমোন্নতির শক্তির মাত্রাসমূহ প্রয়োগ দ্বারা আরোগ্য যে নিকটবর্তী হচ্ছে তাই নির্দেশিত হয়। প্রাকৃতিক রোগের অনুভুতি হতে মুক্ত হবার জন্য জীবনীশক্তির আর ঔষধজ রোগের দ্বারা আক্রান্ত হবার প্রয়োজন নাই ইহার দ্বারা তাই সুচিত হয়। ইহাতে বুঝতে পারা যায় যে, জীবনীশক্তি প্রাকৃতিক রোগের কবলমুক্ত হয়ে বর্তমানে কিছুটা ঔষধজ রোগ ভোগ করতে আরম্ভ করেছে। ইহাই হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি (Homoeopathic aggravation) বলে এ যাবৎ পরিচিত হয়ে আসছে।
অনুচ্ছেদ নং- ২৮১
এই ক্ষেত্রে সুনিশ্চিত হবার জন্য রোগীকে আট/দশ/পনের দিন কোন ঔষধ না দিয়ে কেবল দুগ্ধ শর্করার মাত্রা প্রয়োগ করে রাখতে হবে। শেষের দিকে আগত উপসর্গগুলো মূল রোগেরলক্ষণ সমূহের অনুরূপ
ঔষধজনিত লক্ষণ হলে তারা কয়েক ঘন্টা বা কয়েকদিনের মধ্যেই অন্তর্হিত হয়ে যাবে। ঔষধ বিহীন সময়ে উত্তম স্বাস্থ্যনীতি পালন করা হলে এবং মূল রোগের আর কোন লক্ষণ দেখা না গেলে সম্ভবতঃ রোগী আরোগ্য লাভ করেছে বলে মনে করতে হবে। কিছু দিনের মধ্যে পূর্বেকার রুগ্নলক্ষণ সমূহ কিছু কিছু পুনরায় আত্মপ্রকাশ করলে সেগুলো হবে মূলরোগের অবশিষ্ট অংশ সেগুলো সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় নাই। পূর্ব নির্দেশ অনুসারে ঔষধের উচ্চতর শক্তির দ্বারা সেগুলোকে নতুনভাবে চিকিৎসা করতে হবে। আরোগ্য বিধান করতে হলে প্রথম দিকের ক্ষুদ্র মাত্রাসমূহকে অনুরূপভাবে আবার ক্রমোন্নত করতে হবে। তবে তা কম অসহিষ্ণু রোগীতে যেমন অধিকতর দ্রুত গতিতে উচ্চতর শক্তিতে অগ্রসর হয়, অধিকতর অসহিষ্ণু রোগীর ক্ষেত্রে কম এবং আরো ধীরে ধীরে ক্রমোন্নত শক্তিতে অগ্রসর হয়। এমন অনেক রোগী আছে যাদের অনুভূতির প্রবণতার হার (impressionablity) অনুভূতিবিহীনের তুলনায় ১০০০:১।
অনুচ্ছেদ নং- ২৮২
চিকিৎসাকালে বিশেষতঃ চিররোগের চিকিৎসায় প্রথম মাত্রাতেই যদি তথাকথিত হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি অর্থাৎ প্রথমে পরিলক্ষিত মূলরোগের সুস্পষ্ট বৃদ্ধি ঘটে তাহলে মাত্রা যে অত্যন্ত বড় হয়েছে ইহা তারই নির্দেশ। ঔষধ প্রয়োগ করার প্রত্যেকটি পুনঃ প্রযুক্ত মাত্রাকে ঝাঁকি দিয়ে যতই পরিবর্তিত এবং অধিক শক্তি সঞ্চারিত করা হোক না কেন এরূপ বৃদ্ধিই ঘটতে থাকবে।
অনুচ্ছেদ নং- ২৮৩
এজন্য প্রকৃতির সহিত সম্পূর্ণভাবে সংগঠিত রেখে কাজ শেষ করার জন্য প্রকৃত আরোগ্য শিল্পী সর্বতোভাবে উপযোগী ঔষধ সুনির্বাচিত করে এত সূক্ষ্মমাত্রায় রোগীকে প্রয়োগ করেন। কারণ তিনি মানবীয় দুর্বলতবশতঃ যদি অনুপযোগী ঔষধ প্রয়োগ করে ভ্রান্তপথে পরিচালিত হন তা হলে রোগের সহিত ঔষধের ভুল সম্বন্ধের জন্য প্রতিক্রিয়া এত অল্প হয় যে তা রোগী জীবনীশক্তির সাহায্য এবং সদৃশ লক্ষণে সুনির্বাচিত ঔষধের এবং তাও সূক্ষ্মতম আশু বাধা প্রদানের দ্বারা দ্রুত দূর করে সে ক্ষতি প্রতিকার করতে পারেন।
অনুচ্ছেদ নং- ২৮৪
ঔষধ প্রয়োগের ফলে জিহ্বা, মুখ ও পাকাশয় অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে অভিভূত হয়। নাক ও শ্বাসতন্ত্র দ্বারা ঘ্রান নিলে এবং মুখ দ্বারা শ্বাস গ্রহন করলে তরল ঔষধের ক্রিয়া গ্রহন করে বা গ্রহণ করতে পারে। অধিকন্তু শরীরে অবশিষ্ট উপত্বকাবৃত (clothed with epidermis) সমস্ত অংশ ও ঔষধজ মিশ্রনের ক্রিয়া গ্রহনে উপযোগী বিশেষত যদি ঔষধ মর্দনের সঙ্গে সঙ্গে উহাকে আভ্যন্তরীণ প্রয়োগ করা হয়।
অনুচ্ছেদ নং- ২৮৫
এরূপে চিকিৎসক যে ঔষধ আভ্যন্তরিণ প্রয়োগ করেছেন ও যা আরোগ্যকর বলে পরিলক্ষিত হয়েছে তার বাহ্যিক প্রয়োগে পিঠে বাহুতে হাত পায়ে মর্দন করে অতীব চির রোগের আরোগ্য বিধান দ্রুততর করতে পারা যায়। এভাবে ঔষধ প্রয়োগ করার সময় ব্যথা আক্ষেপ উদ্ভেদযুক্ত অংশ সমূহ অবশ্যই পরিত্যাগ করবেন। মাত্রা ও মাত্রাতত্ত্ব (posology)
১। প্রশ্ন: মাত্রা বলতে কি বুঝ? ০৯
মাত্রার সংজ্ঞা:
গ্রীক শব্দ (posos) থেকে ইংরেজী (dose) শব্দটি উৎপন্ন হয়েছে। এর অর্থ পরিমাণ, কোন কিছুর নির্দিষ্ট পরিমাণকে মাত্রা বলে। যেমন-১টা ১০ নং অনুবাটিকা, ১ ফোঁটা, ১ গ্রেণ ইত্যাদি।
২। প্রশ্ন: মাত্রাতত্ত্ব বলতে কি বুঝ?
মাত্রাতত্ত্ব (posology): গ্রীক শব্দ (posos) ও (logos) নামক শব্দ দুইটি দ্বারা ইংরেজী (posology) শব্দটি উৎপন্ন হয়েছে। যার অর্থ যথাক্রমে "পরিমাণ" ও জ্ঞান।
অর্থাৎ মাত্রাতত্ত্ব (posology) শব্দটার অর্থ পরিমাণ সম্পর্কে জ্ঞান। চিকিৎসা বিজ্ঞানের যে শাখায় পরিমাণ বিষয়ক জ্ঞান সম্পর্কে আলোচনা করে, তাকে মাত্রাতত্ত্ব (posology) বলে।
৩। প্রশ্ন: হোমিওপ্যাথি মাত্রাতত্ত্ব সম্বন্ধে বর্ণণা দাও।
হোমিওপ্যাথিক মাত্রাতত্ত্ব সম্বন্ধে বর্ণনা:
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতির যে অংশে ঔষধ প্রস্তুত সংরক্ষণ, প্রুভিং রোগীর উপরে ঔষধ প্রয়োগের সময় ইত্যাদি অবস্থায় ঔষধের পরিমাণ সম্পর্কে আলোচনা করে, তাকে হোমিওপ্যাথির মাত্রাতত্ত্ব (Homoeopathic posology) বলে।'
হোমিওপ্যাথি বা সদৃশ বিধান আবিষ্কারের পূর্বে তৎকালীন প্রচলিত এলোপ্যাথিক মাত্রায় ঔষধ প্রয়োগে রোগারোগ্য হলে ও রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ না হয়ে আরও কতগুলি নতুন লক্ষণ বা কষ্ট দ্বারা আক্রান্ত হত। ডাঃ হ্যানিম্যান ইহার কারণ সম্বন্ধে বলেন- সুস্থ দেহে ঔষধ সেবন করলে যেমন কতগুলি কৃত্রিম লক্ষণ প্রকাশিত হয়, প্রাকৃতিক রোগাক্রান্ত দেহে ঔষধ প্রয়োগ করলে সে লক্ষণগুলি দূরীভূত হয়।
ঔষধজনিত লক্ষণগুলি রোগ লক্ষণগুলিকে পরাজিত করে বিতাড়িত হয়। ইহাই হোমিওপ্যাথির প্রাকৃতিক আরোগ্য নীতি।
বৃহৎমাত্রায় ঔষধের লক্ষণ অধিক প্রবল হয় যে রোগারোগ্যের পরও উহা থাকে এবং রোগীর ভীষণ ক্ষতিসাধন করে। ঔষধের এ ক্ষতিকর অবস্থা দূর করার জন্যই ডাঃ হ্যানিম্যান মাত্রাতত্ত্ব আবিষ্কার করেন। ঔষধের রোগাৎপাদিকা শক্তিই তার আরোগ্যদায়িনী শক্তি। হোমিওপ্যাথিক ঔষধ শক্তিকৃত অবস্থায় প্রয়োগ করার পর, ইহা জীবনী শক্তির উপর সূক্ষ্ম স্তরে ক্রিয়া প্রকাশ করে থাকে। তাই মাত্রা বৃহৎ হলে ঔষধশক্তি রোগশক্তি দূরীভূত করার পরও জীবনীশক্তির উপর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ফলে ডাঃ হ্যানিম্যানের মতে আদর্শ আরোগ্য সম্পাদিত হতে বাধা সৃষ্টি করে।
অতএব, ইহাই প্রতীয়মান যে, হোমিওপ্যাথির মাত্রাতত্ত্ব ডাঃ হ্যানিম্যানের এক যুগান্তকারী গবেষণা ফসল যা রোগারোগ্যের বিশেষ ভূমিকা রাখে।
৪। প্রশ্নঃ ক্ষুদ্রতম মাত্রা কি? হোমিওপ্যাথিতে ক্ষুদ্রতম মাত্রার গুরুত্ব লিখ?
বা "সুক্ষ্ম মাত্রা অধিক কার্যকর"-ব্যাখ্যা কর।
ক্ষুদ্রতম মাত্রা:
একই আকৃতির ১০০টা অনুবটিকার ওজন এক গ্রেণ হয়, এমন একটা অনুবটিকা শক্তিকৃত ঔষধের দ্বারা ঔষধিকৃত করে, ইহাকে মাত্রা হিসাবে রোগীকে সেবন করতে দেয়াকে ক্ষুদ্রতম বা সূক্ষ্মমাত্রা বলে।
মহাত্মা ডাঃ হ্যানিম্যান বলেছেন যে, এক ফোঁটা ঔষধ ৫০০ টির বেশি অনুবটিকাকে সিক্ত করে ব্লটিং পেপারে শুকিয়ে নিলে এর একটি অনুবটিকা যে টুকু ঔষধ ধারণ করতে পারে, তাকে সূক্ষ্ম বা ক্ষুদ্রতম মাত্রা বলে।
হোমিওপ্যাথিতে ক্ষুদ্রতম মাত্রায় গুরুত্ব/"সূক্ষ্ম মাত্রা অধিক কার্যকর":
হোমিওপ্যাথির অন্যতম নীতি হচ্ছে সদৃশ নিয়মে চিকিৎসা পদ্ধতি। সদৃশ লক্ষণ মতে সদৃশ লক্ষণ সম্পন্ন রোগে সদৃশ ঔষধ দ্বারা রোগারোগ্য করতে হলে ঔষধের অতি সূক্ষ্মমাত্রাই প্রয়োজন হয়ে থাকে।
উচ্চ শক্তি সম্পন্ন ঔষধ, মাত্রা ক্ষুদ্র হওয়ায়, ঔষধের প্রভাব শরীর হতে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই দূরীভূত হয়ে যায়। ক্ষুদ্রতম মাত্রার ঔষধ ব্যবহার করার অর্থই হল সদৃশ লক্ষণ মতে, ব্যবহার করার পর ঔষধশক্তি রোগশক্তির স্থানসমূহ দখল করে এবং রোগাশক্তিকে দূরীভূত করার পর ঔষধশক্তির প্রাবল্যতা দেহের অর্গানসমূহের মধ্যে তখনও স্বল্প সময়ের জন্য থাকে। ক্ষুদ্রতম মাত্রা দেয়ার কারণে ঔষধের স্থিতিকাল ও আক্রান্ত কোষ বা টিস্যুসমূহকে স্বল্প সময়ের জন্য প্রভাবিত করে। মাত্রা যত ক্ষুদ্র হবে হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি তত সামান্য ও ক্ষণস্থায়ী হবে। বৃহৎ মাত্রায় ঔষধ প্রয়োগ করলে ইহার ক্রিয়া দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, ফলে রোগী দুর্বল ও রোগারোগ্যে হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি বেশি হয়।
সুতরাং মহাত্মা ডাঃ হ্যানিম্যানের মতে, আর্দশ আরোগ্য করতে হলে, ক্ষুদ্রতম মাত্রা ব্যবহার করতে হবে। অতএব, হোমিওপ্যাথিতে ক্ষুদ্রতম মাত্রায় প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অপরিসীম।
৫। প্রশ্নঃ স্কুল মাত্রার ঔষধের কুফলগুলি উল্লেখ কর?
বা বৃহৎমাত্রা ব্যবহারের ফলাফল আলোচনা কর। ১০
বা, অপরিমিত মাত্রায় ঔষধ প্রয়োগের ফলাফল আলোচনা কর।
স্কুলমাত্রার ঔষধের কুফলসমূহ/অপরিমিত মাত্রায় ঔষধ প্রয়োগের ফলাফল নিম্নরূপ:
স্কুলমাত্রার ঔষধের কুফলসমূহ বা বৃহৎমাত্রা ব্যবহারের ফলাফল/ অপরিমিত মাত্রায় ঔষধ প্রয়োগের ফলাফল নিম্নরূপ:-
(i) স্কুলমাত্রার ঔষধ প্রয়োগের ফলে সদৃশ লক্ষণ হলেও রোগীর মধ্যে ঔষধের পরিমাণ বেশি মাত্রায় হওয়ার কারণে বৃদ্ধি লক্ষণ বৃদ্ধি পায়, একে হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি বলে।
(ii) স্থুলমাত্রার ঔষধের ব্যবহারের কারণে ইহার ক্রিয়া দীর্ঘকাল থাকার ফলে রোগীকে অত্যন্ত দুর্বল করে ফেলে।
(iii) স্থলমাত্রায় ঔষধ প্রয়োগ করলে ঔষধের প্রাথমিক বা মূখ্য ক্রিয়ায় কিছুটা উপশম হলেও গৌণ বা জীবনীশক্তির প্রতিক্রিয়ার কুফল এ রোগী আরও অধিকতর ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
(iv) ঔষধ নির্বাচন সঠিক হলেও স্কুলমাত্রার কারণে ঔষধজ রোগে রোগীর জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে।ল তে
(v) শক্তিকৃত হোমিওপ্যাথি ঔষধ বড় মাত্রায় প্রয়োগের ফলে ইহার তীব্রতায় রোগীর মৃত্যু হতে পারে।২৪ ৭১নেপচুন্সী
উপরিউক্ত বর্ণনা হতে ইহার প্রতীয়মান হয় যে, স্কুল মাত্রার ঔষধ বিশেষ কোন অর্গান বা দেহের বৃহৎ স্নায়ুতন্ত্রের উপর প্রভাব বিস্তার রোগীর প্রচন্ড ক্ষতি সাধন করে।
৬। প্রশ্নঃ পরিমিত মাত্রা কাকে বলে?
পরিমিত মাত্রা (Moderate dose) 8
যখন কোন ভেষজ বা ঔষধের জড়তা যথা সম্ভব অপসারিত না করে যে মাত্রা নির্ণীত হয়, তাকে পরিমিত মাত্রা বলে।
৭। প্রশ্নঃ ভেজষ ও পথ্য এর মধ্যে পার্থক্য লিখ।
ভেজষ ও পথ্য এর মধ্যে পার্থক্য:
ভেজষ:-
১। যে সকল পদার্থ সুস্থ শরীরে প্রয়োগ করলে শরীর অসুস্থ হয়, তাকে ভেষজ বলা হয়। অর্থাৎ যে সকল পদার্থের রোগ উৎপাদিকা ও ফার্মাকোপিয়া মতে শক্তিকৃত করার পর প্রয়োগে রোগনাশক উভয় শক্তিই বর্তমান থাকে, তাকে ভেজষ বা ড্রাগ বলে। কাজেই ভেষজ হল ঔষধী গুণ সম্পন্ন বস্তু যা থেকে ঔষধ প্রস্তুত করা হয়।
২ । ইহা. ঔষধ প্রস্তুতের কাঁচামাল,পদার্থের মধ্যে ঔষধি গুণ থাকলেই, উহা ভেষজ।
৩। ভেষজ খাদ্য হিসাবে গ্রহন করলে সচরাচর কোন প্রতিক্রিয়া হয় না।
৪। ইহাকে স্থুল মাত্রায় প্রয়োগে রোগোৎপাদিকা শক্তি আছে।
পথ্য:-
১। পথ্য রোগ আরোগ্য সহায়ক এবং যা গ্রহনে ব্যক্তি সুস্থ ও সবল এবং রোগ মুক্ত থাকে।
২। ইহার রোগ উৎপাদন ও রোগ আবোগ্যের উভয় ক্ষমতা নাই।
৩। ইহা সুস্থ মানব শরীরে পরীক্ষিত নয় কিন্তু পুষ্টিগত দিক থেকে মাননিয়ন্ত্রিত।
৪। ইহা রোগ আরোগ্যে জীবনীশক্তিকে সহায়তা করে।
৮। প্রশ্ন: শক্তি কি? শক্তি ও মাত্রার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় কর। ০৯, ১১, ১৩ বা, ঔষধের মাত্রা ও শক্তির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় কর।
শক্তি ও মাত্রার মধ্যে পার্থক্য নিম্নরূপ:
শক্তি:-
১। হোমিওপ্যাথিক ফার্মাকোপিয়ার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার অনুসারে মূল আরককে (ধাতব বা কঠিন জাতীয় পদার্থকে) দুগ্ধ শর্করা সহযোগে বিচূর্ণ করে সূক্ষ্ম হতে সূক্ষ্মতর অংশে বিভাজিত করা এবং মূল আরককে তরল ভেষজবহ সহযোগে সূক্ষ্ম হতে সূক্ষ্মতম অংশে বিভাজিত করার পদ্ধতিকে শক্তিকরণ বলে। আর সুক্ষ্মতম অংশে বিভাজিত করা অংশকে ঔষধের শক্তি বলে।
২। বিচুর্ণ বা সাক্কাশন পদ্ধতির মাধ্যমে ঔষধের শক্তির সৃষ্টি করা হয়। যেমন- দশমিক পদ্ধতিতে 1x, শততমিক-১, সহস্রতমিক পদ্ধতিতে- M/১ ইত্যাদি।
৩। ঘর্ষণ, ঝাঁকির মাধ্যমে ঔষধের শক্তি পরিবর্তন করা হয়।
৪। ইহাতে ঔষধের শক্তি যত বাড়তে ৪ থাকে সেই অনুপাতে ভেষজ পদার্থের পরিমাণ তত কমতে থাকে।.
মাত্রা:-
১। Posos গ্রীক শব্দটি হতে উৎপন্ন Dose যার অর্থ হল পরিমাণ। মাত্রা বলতে ঔষধের পরিমাণকে বুঝায়। সাধারণতঃ কোন রোগীকে একবার যতটুকু ঔষধ প্রয়োগ করা হয়, তাকে মাত্রা বলে।
২। ভেষজ S ভেষজবহের সংমিশ্রনের ঔষধের মাত্রা তৈরী করা হয়। যেমন- ১টি ১০নং অনুবটিকা, ১ গ্রেন, ১ ফোঁটা ইত্যাদি।
৩। শক্তিকৃত ঔষধের সাথে ভেষজবহের পরিমাণ বাড়িয়ে ঔষধের মাত্রা তৈরী করা হয়।
৪। ইহাতে ঔষধের শক্তির সাথে ভেষজবহের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
0 মন্তব্যসমূহ