আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা সমূহ, দ্বিতীয় বর্ষ- দ্বিতীয় অধ্যায়

 দ্বিতীয় অধ্যায়
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা সমূহ
(আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা)



প্রশ- আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলির নাম লিখ।
উত্তর : আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলির নাম- বিশ্বব্যাপী সংক্রামক ব্যাধি রোধকল্পে আন্তর্জাতিকভাবে চুক্তি ও সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন সমিতি গঠন করা হয়। এইগুলিই আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলির নাম নিম্নে দেওয়া হইল। যথা-
i) প্রথম আন্তর্জাতিক সেনিটারী কনফারেন্স।
ii) প্যান আমেরিকান সেনিটারী ব্যুরো।
iii) অফিস ইন্টারন্যাশনাল ডি হাইজিন পাবলিক।
iv) লীগ অব নেশনস এর স্বাস্থ্য সংস্থা।
v) জাতিসংঘের ত্রাণ ও পূর্নবাসন প্রশাসন।
vi) বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা
vii) আন্তর্জাতিক রেডক্রস।


প্রশ্ন- "পৃথিবীতে রোগের চেয়ে বেশী আন্তর্জাতিক কিছুই নাই"-আলোচনা কর।
উত্তর : পৃথিবীতে রোগের চেয়ে বেশী আন্তর্জাতিক কিছুই নাই- সমগ্র বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য এবং রোগব্যাধি বিরাজমান। স্বাস্থ্য এবং রোগ ব্যাধির কোন ভৌগলিক এবং রাজনৈতিক সীমারেখা নাই। রোগ সংক্রমণ এবং বিস্তারের ধারা বিশ্বব্যাপী একই ধরণের। কোন একটি রোগের নামকরণও সকল দেশে একই প্রকারের। পৃথিবীর যে কোন এক প্রান্তে কোন পীড়ার উদ্ভব হইলেও অপর প্রান্তের জন্য উহা আশংকার কারণ। তাই পীড়াকে একটি আন্তর্জাতিক বিপদ বলিয়া মানিয়া নিতে হয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করিলে দেখা যায় যে, বিভিন্ন বাণিজ্যিক পথে কোন রোগ রাষ্ট্রীয় ও ভৌগলিক সীমারেখা অতিক্রম করিয়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়াইয়া পড়ে এবং ব্যাপকভাবে রোগ বিস্তার লাভ করিয়া জনপদ বিপন্ন করিয়া তোলে। বর্তমানে মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে এবং কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে প্রতিনিয়ত দেশান্তরে গমন করিতেছে। আবার বিদেশ হইতে নিজ দেশেও ফিরিয়া আসিতেছে। বিভিন্ন রোগ জীবাণু সুপ্তাবস্থায় মানবদেহে থাকিয়া তাহাকে বাহক হিসাবে অবলম্বন করিয়া অন্য দেশে বা অন্য দেশ হইতে নিজ দেশে সংক্রমণ সৃষ্টি করে। রোগ সংক্রমিত হইয়া ব্যাপকাকার ধারণ করে এবং মহামারী প্রভৃতি দেখা দেয়। বিশেষতঃ প্লেগ, বসন্ত, কলেরা, থ্যালাসিমিয়া প্রভৃতি সংক্রামক পীড়া মহামারী আকারে বিস্তার লাভকরে। বর্তমানে সবচেয়ে যে পীড়াটি আন্তর্জাতিকভাবে সারা বিশ্বে আতঙ্কের সৃষ্টি করিয়াছে তাহার নাম এইডস্। ভ্রমণকারীর দেহে থাকিয়া তাহাকে বাহক হিসাবে অবলম্বন করিয়া এইডস্ ভাইরাস পৃথিবীর সকল দেশেই সংক্রামিত হইতেছে। তাই বিশ্বব্যাপী ব্যাধির সংক্রমণ রোধ করার জন্য আন্তর্জাতিক ভাবে সহযোগীতা প্রয়োজন। সে কারণেই বলা হইয়া থাকে যে "পৃথিবীতে রোগের চেয়ে বেশী আন্ত র্জাতিক কিছুই নাই"।


প্রশ্ন- প্রথম আন্তর্জাতিক সেনিটারী কনফারেন্স (১৮৫১) সম্বন্ধে আলোচনা কর।
উত্তর : প্রথম আন্তর্জাতিক সেনিটারী কনফারেন্স (১৮৫১) বিশ্বব্যাপী রোগ সংক্রমণের ব্যাপকতা রোধ করার জন্য ১৮৫১ খৃষ্টাব্দে প্যারিসে বিশ্বের প্রথম আন্ত র্জাতিক স্বাস্থ্য সম্মেলন আহ্বান করা হয়। ইহাই প্রথম আন্তর্জাতিক সেনিটারী কনফারেন্স। ইউরোপীয় দেশসমূহ প্রধানতঃ গ্রেট বৃটেন, ফ্রান্স, গ্রীস, পর্তুগাল, অস্ট্রিয়া, স্পেন, রাশিয়া এবং ইটালী ও তুরস্ক প্রভৃতি দেশসমূহ ইহাতে অংশগ্রহণ করে। এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য খুবই সীমিত ছিল। কিছু কিছু আদেশ সংযুক্ত করা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গ রোধ আইনের সমতা বিধান করাই ছিল ইহার উদ্দেশ্য। এই সম্মেলনে ছয় মাস যাবত সংক্রমণ নিবারণের জন্য নানাবিধ বিধিবিধান প্রণয়ন এবং সঙ্গরোধ আইনের সমতা বিধানের চেষ্টা করা হইলেও কয়েকটি দেশ সঙ্গরোধ প্রথার বিরুদ্ধাচরণ করায় ঐ প্রচেষ্টা ফলপ্রসু হয় নাই। বিভিন্ন দিক দিয়া বিরোধিতা করা সত্বেও সম্মেলনে একটি আন্তর্জাতিক সেনিটারী আইন প্রস্তুত করা হয়। ঐ আইনে কলেরা, প্লেগ ও ইয়োলো ফিভার সম্পর্কে ১৩৭টি ধারা অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এই আইন কখনও কার্যকরী করা সম্ভব হয় নাই, কারণ প্রথমতঃ ফ্রান্স, পর্তুগাল ও সারাদিনা সমর্থন করিলেও পরবর্তীকালে তাহাদের মধ্যে মতবিরোধ ঘটে এবং ১৮৬৫ খৃষ্টাব্দে সারাদিনা ও পর্তুগাল তাহাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে। ফলে ১৮৫১ খৃষ্টাব্দের এই কনফারেন্স ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ১৮৫১ হইতে ১৯২০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত দশটি সম্মেলন অনুষ্টিত হইলেও 'সঙ্গরোধ' সম্পর্কে চুক্তি সম্পাদনে দেশসমূহ ব্যর্থ হয়।


প্রশ্ন- প্যান আমেরিকান সেনিটারী ব্যুরো (১৯০২) সম্বন্ধে যাহা জান লিখ। 
উত্তর : প্যান আমেরিকান সেনিটারী ব্যুরো (১৯০২)- খৃষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত প্যান আমেরিকান সেনিটারী ব্যুরো হইল আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক স্যানিটারী কনফারেন্সের পরই ইহা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রাথমিকভাবে ইহা যুক্তরাষ্ট্রের ভিতরে সঙ্গরোধ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে। আমেরিকান সরকার প্যান আমেরিকান সেনিটারী কোড নামক একটি দলিল প্রস্তুত করে এবং ১৯২৪ খৃষ্টাব্দে আমেরিকান সরকার কর্তৃক অনুমোদন লাভ করে। ১৯৪৭ খৃষ্টাব্দে উক্ত ব্যুরো পুনর্গঠিত হইয়া "প্যান আমেরিকান সেনিটারী অর্গানাইজেশন" (PASO) নামে নামকরণ করা হয়। এই PASO সংস্থা একচুক্তির বলে ১৯৪৯ খৃষ্টাব্দ হইতে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) আঞ্চলিক অফিস হিসাবে কাজ করিতেছে। ১৯৫৮ খৃষ্টাব্দে ইহাকে প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন (PAHO) নামকরণ করা হয়। অনেক বৎসর পর PAHO ক্ষুদ্র তথ্য কেন্দ্র হইতে বৃহৎ স্বাস্থ্য সংস্থায় পরিণত হয়। বর্তমানে ওয়াশিংটন ডি. সিতে ইহার প্রধান কার্যালয় অবস্থিত।


প্রশ্ন- অফিস ইন্টারন্যাশনাল ডি হাইজিন পাবলিক (১৯০৭) সম্বন্ধে যাহা জান লিখ।
উত্তর : অফিস ইন্টারন্যাশনাল ডি হাইজিন পাবলিক (১৯০৭)- ১৯০৭ খৃষ্টাব্দে প্যারিসে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থা অফিস ইন্টারন্যাশনাল ডি হাইজিন পাবলিক প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংস্থার উদ্দেশ্য ছিল সংক্রামক ব্যাধি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা এবং সঙ্গরোধ আইনের তদারকি করা ও আইন নিশ্চিত করা। প্রথম পর্যায়ে ইহা ছিল ইউরোপ প্রধান কিন্তু পরবর্তীতে প্যান আমেরিকান সেনিটারী ব্যুরোর সহিত ইহার সহযোগীতা প্রতিষ্ঠিত হয়। বৃটেন ও ভারতসহ ষাটটি দেশ ইহার সহিত পরবর্তীকালে অংশগ্রহণ করিলে ইহা একটি আন্তর্জাতিক রূপ লাভকরে। অফিস ইন্টারন্যাশনাল ডি হাইড্রিনের কোন ফিল্ড স্টাফ না থাকিলেও ইহা সংক্রামক ব্যাধি ও আন্তর্জাতিক সমস্যা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ১৯৫০ খৃষ্টাব্দের পর ইহা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) অন্তর্ভূক্ত হয়।


প্রশ্ন- "লীগ অব নেশনস এর স্বাস্থ্য সংস্থা (১৯২৩)" সম্বন্ধে আলোচনা কর।
উত্তর: লীগ অব নেশনস এর স্বাস্থ্য সংস্থা (১৯২৩)- প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সারা বিশ্বব্যাপী রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্দেশ্যে লীগ অব নেশনস্ এর অধীনে একটি স্বাস্থ্য সংস্থা গঠন করা হয়। ১৯২৩ খৃষ্টাব্দে এই স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজনৈতিক কারণে লীগ অব নেশনস এর পতন ঘটিলেও ইহার স্বাস্থ্য সংস্থা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। এই স্বাস্থ্য সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ, পুষ্টি, গৃহ ও পল্লী স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান প্রভৃতি কার্যক্রম পর্যন্ত ইহার বিস্তৃতি 'ঘটে। ইহা সিঙ্গাপুরে ফার ইস্টার্ণ ব্যুরো নামক একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে। ইহা টেকনিক্যাল পাঠের ভিত্তি স্থাপন করে যাহা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বর্তমানে অনুসরণ করিতেছে। ১৯৪৯ খৃষ্টাব্দে লীগ অব নেশনস ভাঙ্গিয়া গেলেও ইহার স্বাস্থ্য সংস্থা জেনেভাতে কাজ চালাইতে থাকে।


প্রশ্ন- জাতিসংঘের ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রশাসন (১৯৪৩) সম্পর্কে আলোচনা কর।
উত্তর: জাতিসংঘের ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রশাসন (১৯৪৩)- ১৯৪৩ খৃষ্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য জাতিসংঘের ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রশাসন" নামক একটি সংস্থা গঠিত হয়। ইহার অধীনে একটি স্বাস্থ্য বিভাগ কাজ করে। এই স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্দেশ্য ছিল লক্ষ লক্ষ দুস্থ মানুষের স্বাস্থ্যের উন্নতি বিধান করা এবং মহামারী ও সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের কার্যাবলী গ্রহণ করা। জাতিসংঘের ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রশাসনের স্বাস্থ্য বিভাগ গ্রী-।, ইটালী ও সারাদিনা হইতে 'ম্যালেরিয়া নির্মূলের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করিয়া কৃতকার্য হয়। ১৯৪৬ খৃষ্টাব্দের পর এই সংস্থার অস্তিত্ব বিলীন হইয়া যায়। কিন্তু ইহার স্বাস্থ্য বিভাগ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীনে (WHO) চলিয়া যায়।


প্রশ্ন- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) জন্ম সম্বন্ধে আলোচনা কর।
উত্তর : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) জন্ম- ১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাসে সানফ্রান্সিসকোতে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সম্মেলনে (WHO) এর জন্ম হয়। এই স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৪৬ সালে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সম্মেলনে ইহার গঠনতন্ত্র প্রস্তুত করা হয়। ১৯৪৮ সালের ৭ই এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জাতিসংঘের এজেন্সী হিসাবে গৃহীত হয় এবং মূলতঃ ঐ তারিখেই WHO এর জন্ম হয়। প্রতি বৎসর ৭ই এপ্রিল তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালন করা হয়।


প্রশ্ন- বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কি?
উত্তর : বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)- বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা জাতিসংঘের একটি বিশেষ অরাজনৈতিক স্বাস্থ্য সংস্থা। ইহার প্রধান কার্যালয় জেনেভাতে। ১৯৪৬ খৃষ্টাব্দে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সম্মেলনে ইহার গঠনতন্ত্র প্রস্তুত করা হয়। এই গঠনতন্ত্র ১৯৪৮ সালের ৭ই এপ্রিল কার্যকারিতা লাভ করে এবং মূলতঃ ঐ তারিখেই বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার জন্ম হয়। প্রতি বৎসর ৭ই এপ্রিল 'বিশ্বস্বাস্থ্য দিবস' পালন করা হয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার উদ্দেশ্য হইল বিশ্বের সকল মানুষের উন্নততর স্বাস্থ্য বিধান করা। ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বের সকল মানুষের জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণ এই সংস্থার বর্তমান উদ্দেশ্য এবং এই উদ্দেশ্য সফল হইলে মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।


প্রশ- বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (WHO এর উদ্দেশ্যসমূহ কি কি?
উত্তর : বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (WHO এর উদ্দেশ্যসমূহ- বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর উদ্দেশ্য হইল বিশ্বের সকল মানুষের স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন করা। এই সংস্থার বর্তমান লক্ষ্য হইল ২০২০ সালের মধ্যে "সবার জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।


প্রশ্ন- বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) এর গঠন ও কার্যাবলী লিখ।
উত্তর : বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) এর গঠন: WHO নিম্নলিখিত তিনটি অঙ্গ লইয়া গঠিত। যথা-
i) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংসদ (World Health Assembly)
ii) কার্যনির্বাহী বোর্ড (Executive Board)
iii) সদর দপ্তর (Secretariate)
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) এর কার্যাবলী : বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার কার্যাবলী।
নিম্নরূপ-
i) বিশেষ বিশেষ রোগের প্রতিরোধ ও প্রতিকার।
ii) পারিবারিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন।
iii) স্বাস্থ্য পত্র ও তথ্য প্রকাশ।
iv) স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান।
v) বায়ো মেডিকেল রিসার্চ।
vi) অন্যান্য সংস্থার সাথে সহযোগীতা করা।


প্রশ্ন- বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর আঞ্চলিক সংস্থা কয়টি ও কি কি?
উত্তর : বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর আঞ্চলিক সংস্থাসমূহ- বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রয়োজন অনুযায়ী ইহাকে ৬টি আঞ্চলিক সংস্থায় বিভক্ত করা হইয়াছে।
যথা-
১) দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অঞ্চল- প্রধান কার্যালয় ভারতের নয়াদিল্লীতে।
২) আফ্রিকা অঞ্চল- প্রধান কার্যালয় ব্রাজিলে।
৩) আমেরিকা অঞ্চল- প্রধান কার্যালয় ওয়াশিংটন।
৪) ইউরোপ অঞ্চল- প্রধান কার্যালয় ডেনমার্কের কোপেন হেগেনে।
৫) পূর্ব ভূমধ্য সাগরীয় অঞ্চল- প্রধান কার্যালয় মিশরের আলেকজান্দ্রিয়াতে।
৬) পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল- প্রধান কার্যালয় ফিলিপাইনের ম্যানিলাতে।


প্রশ্ন- WHO এর সদস্যসংখ্যা কত?
উত্তর: WHO এর সদস্যসংখ্যা- ১৯৪৮ সালে WHO এর সদস্য সংখ্যা ছিল ৫৬। ২০১৪ সালে এসে ইহার সদস্যসংখ্যা ১৯৪।


প্রশ্ন- বাংলাদেশ কোন সালে WHO এর সদস্যপদ লাভ করে? 
উত্তরঃ বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে WHO এর সদস্য পদ লাভ করে।"


প্রশ- বাংলাদেশ WHO এর কোন অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত এবং প্রধান কার্যালয় কোথায়?
উত্তরঃ বাংলাদেশ WHO এর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। ইহার প্রধান কার্যালয় ভারতের নয়াদিল্লীতে অবস্থিত।


প্রশ্ন- WHO এর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের বর্ণনা দাও।
উত্তর : WHO এর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অঞ্চল- WHO এর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক অফিসের (SEARO) প্রধান কার্যালয় ভারতের নয়াদিল্লীতে। অফিসের ঠিকানা ওয়াল্ড হেল্থ হাউজ, ইন্দ্রাপ্রস্থ ইস্টেট, নয়াদিল্লীতে। এই অঞ্চলের সদস্য সংখ্যা ১১। WHO এর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের কার্যাবলী বহুমুখী ও ব্যাপক। যেমন- ম্যালেরিয়া নির্মূল। যক্ষ্মা প্রভৃতি সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য ল্যাবরেটরী সার্ভিসেস এবং টিকা প্রস্তুতকরণ, পাবলিক হেল্থ এডমিনিস্ট্রেশান ও নার্সিং পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান, পুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য, দন্ত স্বাস্থ্য, মেডিকেল পুর্নবাসন, রেডিয়েশন, ঔষধের মান নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা স্বাস্থ্য প্রভৃতি।


প্রশ- WHO এর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের দেশসমূহের নাম এবং সদস্যপদ লাভের বৎসর লিখ।
উত্তর: WHO এর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের দেশসমূহ- WHO এর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলির নাম নিম্নে প্রদান করা হইল। যথা-
(১) ভারত                   ১৯৪৮    সালে সদস্যপদ লাভ করে।
(২) বার্মা                     ১৯৪৮    সালে সদস্যপদ লাভ করে।
(৩) শ্রীলঙ্কা                ১৯৪৮    সালে সদস্যপদ লাভ করে।
(৪) থাইল্যান্ড:            ১৯৪৭    সালে সদস্যপদ লাভ করে।
(৫) ইন্দোনেশিয়া       ১৯৫০    সালে সদস্যপদ লাভ করে।
(৬) নেপাল                ১৯৫৩    সালে সদস্যপদ লাভ করে।
(৭) মঙ্গোলিয়া            ১৯৬২    সালে সদস্যপদ লাভ করে।
(৮) মালদ্বীপ              ১৯৬৫    সালে সদস্যপদ লাভ করে।
(৯) বাংলাদেশ            ১৯৭২    সালে সদস্যপদ লাভ করে।
(১০) কোরিয়া             ১৯৭৩    সালে সদস্যপদ লাভ করে।
(১১) ভুটান                 ১৯৮২    সালে সদস্যপদ লাভ করে।


প্রশ্ন- আন্তর্জাতিক রেডক্রস সোসাইটির বর্ণনা দাও।
উত্তর : আন্তর্জাতিক রেডক্রস সোসাইটি- হেনরি ডুনান্ট নামের একজন সুইস ব্যবসায়ী কোন এক যুদ্ধের দৃশ্যে আহত ও দুর্দশাগ্রস্ত সৈন্যদেরকে দেখিয়া মর্মাহত হন এবং তাহাদের সাহায্যার্থে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের উদ্যোগ নেন। তিনিই এই সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস সোসাইটি একটি বেসরকারী অরাজনৈতিক সংস্থা। যুদ্ধাহত এবং আর্ত-মানবতার সেবায় এই সংস্থা নিয়োজিত। ১৯৬৪ খৃষ্টাব্দে প্রথম জেনেভা কনভেনশনে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যুদ্ধাহত সৈন্যদের সাহায্য ও চিকিৎসা করা ইহার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল। ১৯১৯ সালে লীগ অব দি রেডক্রস সোসাইটি সৃষ্টি করিয়া ইহার কার্যক্রম বৃদ্ধি করা হইয়াছে। ইহার প্রধান কার্যালয় জেনেভাতে। জন্মের পর হইতেই বিশ্বের একটি শক্তিশালী মিশন হিসাবে ইহা কাজ করিয়া আসিতেছে। পৃথিবীর সর্বত্র এই সংস্থার শাখা বিদ্যমান। যুদ্ধাহত সৈনিকদের সেবা ছাড়াও এই সংস্থা এখন ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করিয়া আর্তমানবতার সেবার নিমিত্ত নার্সিং স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রদান, প্রসূতি ও শিশুদের চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রাথমিক চিকিৎসা, শিশু মঙ্গল প্রভৃতি কার্যক্রম চালু করিয়াছে।


প্রশ্ন- জেনেভা ঘোষণা (Declaration of Geneva) কি?
উত্তর : জেনেভা ঘোষণা (Declaration of Geneva)- লন্ডনে বিশ্ব মেডিকেল এসোসিয়েশানের সাধারণ সভায় ১৯৪৯ সালের ১২ই অক্টোবর যে ঘোষণাপত্র গৃহীত হয় তাহাকে জেনেতা ঘোষণা বলা হয়। জেনেভা ঘোষণাটি নিম্নরূপ-
i) আমি স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া ঘোষণা করিতেছি যে, মানবতার সেবায় অমার জীবন উৎসর্গ করিলাম।
ii) বিশ্বস্ততা ও মর্যাদার সাথে আমি আমার পেশায় নিয়োজিত থাকিব।
iii) রোগীর স্বাস্থ্যই আমার প্রধান বিবেচ্য বিষয় হইবে।
iv) আমি আমার শিক্ষকদের, শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করিব।'
v) আমি আমার সর্বময় ক্ষমতা দিয়া চিকিৎসা পেশার সম্মান ও শাশ্বত ঐতিহ্য বজায় রাখিব।
vi) আমার সহকর্মীদের আমি আমার সহোদরের ন্যায় মনে করিব।
vii) আমার রোগী ও আমার কর্তব্যের মাঝে কোন জাতি, ধর্ম, গোত্র, দলীয় রাজনীতি ও সামাজিক বিষয়কে প্রশ্রয় দিব না।
viii) আমার নিকট রোগীর বর্ণিত গোপনীয়তার প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল ও বিশ্বস্ত থাকিব।
ix) জন জন্ম নেওয়ার পর হইতে জীবনের মূল্য সম্পর্কে আমি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করিব।
x) কোনরূপ হুমকি বা ভীতির মুখেও আমি আমার চিকিৎসা বিজ্ঞানকে মানবতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করিব না।


প্রশ্ন- রেড ক্রসের মূলনীতিসমূহ কি কি?
উত্তর : রেড ক্রসের মূলনীতিসমূহ- রেড ক্রসের মূলনীতিসমূহ ১৯৪৯ সালে প্রণীত হয়। নিম্নে রেডক্রসের মূলনীতি সমূহ উল্লেখ করা হইল। যথা-
i) মানবিকতা : মানুষের জীবন রক্ষা করা, মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরস্পরের প্রতি সমঝোতা, সহযোগীতা ও বন্ধুত্ব স্থাপনের মাধ্যমে বিশ্বে ও দেশে 'দেশে শান্তি স্থাপন করা রেডক্রসের প্রধান লক্ষ্য।
ii) স্বেচ্ছাসেবী কাজ: রেডক্রস স্বেচ্ছা শ্রমের ভিত্তিতে গঠিত একটি সাহায্য ও সহযোগীতামূলক সংস্থা। কোনরূপ মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে কোন কাজ করা হয় না।
iii) স্বাধীনতা: রেডক্রস একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা হইলেও যেকোন দেশের রেডক্রস সেই দেশের আইন কানুন দ্বারা প্রভাবিত ও পরিচালিত হয় এতদসত্ত্বেও রেডক্রসের মৌলিকত্ব বা স্বাতন্ত্র বজায় রাখার চেষ্টা করা হয় যাহাতে আন্তর্জাতিক রেডক্রসের মূলনীতির সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া ইহা স্বাধীনভাবে কাজ করিতে পারে।
iv) পক্ষপাতহীনতা: ইহা একটি নিরপেক্ষ সংস্থা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, দেশ, রাজনৈতিক মত পার্থক্য নির্বিশেষে ইহা সকলের জন্যই কাজ করে এবং সবচেয়ে অধিক ক্ষতিগ্রস্তকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সাহায্য করে।
v) নিরপেক্ষতা: ভৌগলিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে বিবাদমান দুইটি গোষ্ঠী বা দলের মধ্যে কাজ করিতে গেলে; আক্রমণকারী বা আক্রান্ত কাহারও পক্ষ অবলম্বন না করিয়া নিরপেক্ষভাবে কাজ করা এই সংস্থার নীতি।
vi) এককত্ব : যেকোন দেশে মাত্র একটি রেডক্রস সংস্থা থাকিবে এবং উহা আন্তর্জাতিক রেডক্রসের সহিত সমন্বয় সাধন করিয়া নিজ দেশে কাজ করিবে।
vii) সার্বজনীনতা : রেডক্রস সারা বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত একটি সংস্থা, সমগ্র পৃথিবীর সকল মানুষের মর্যাদা ও অধিকার এখানে সমান।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ