হাইজিন এন্ড পাবলিক হেলথ
তৃতীয় অধ্যায়
স্বাস্থ্য শিক্ষা
প্রশ্ন- স্বাস্থ্য শিক্ষা বলিতে কি বুঝ?
উত্তর : স্বাস্থ্য শিক্ষা- শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য এমন দুইটি সামাজিক গুণাগুণ যাহার গুরুত্ব ক্রমশঃই বৃদ্ধি পাইতেছে। সমাজ ও দেশের উন্নয়নের জন্য শিক্ষার সাথে সাথে জনগণের সুস্বাস্থ্যেরও প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে। লোকসমাজ স্বাস্থ্যরক্ষার সবচাইতে বড় হাতিয়ার হইল শিক্ষা। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য এবং সামাজিক স্বাস্থ্য রক্ষার নিয়মকানুন এবং বিধিনিষেধগুলির জ্ঞান অর্জনকে স্বাস্থ্য শিক্ষা বলা হয়।
প্রশ্ন- স্বাস্থ্য শিক্ষার লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কি?
উত্তর : স্বাস্থ্য শিক্ষার লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য- স্বাস্থ্য শিক্ষার মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যসমূহ নিম্নে দেওয়া হইল।
i) স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রথম লক্ষ্য হইল শিক্ষার্থীকে নীরোগ, কর্মক্ষম ও সুস্থ দেহের অধিকারী হওয়ার জন্য নিয়ম কানুন মানিয়া চলিতে শিখানো। সুস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য সমস্ত নিয়ম কানুন ও বিধি নিষেধ মিলিয়া ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য বিকাশের সমগ্র কর্মসূচীটি শিক্ষার্থী যাহাতে আন্তরিকতার সাথে অনুসরণ করিতে পারে তাহার ব্যবস্থা করাই স্বাস্থ্য শিক্ষার লক্ষ্য।
ii) দ্বিতীয়তঃ স্বাস্থ্যকে যাহাতে লোক সমাজের মূল্যবান সম্পদ বলিয়া গণ্য করা হয় তাহা নিশ্চিত করা।
iii) তৃতীয়তঃ শিক্ষার্থীর সামাজিক সম্পর্ক যাহাতে সুশোভন, বাঞ্চিত ও মঙ্গলজনক হয় তাহার জন্য তাহাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান করা।
iv) চতুর্থতঃ শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য অটুট রাখা।
v) পঞ্চমতঃ যৌথ স্বাস্থ্য সংরক্ষণের নীতি ও নিয়ম কানুনাদি সম্বন্ধে শিক্ষার্থীকে অবহিত করিয়া তোলা। নিজ স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য যেমন নিয়ম কানুন
হাইজিন এন্ড পাবলিক হেলথ ৪৮
পালন করা প্রয়োজন, তেমনি অন্যের স্বাস্থ্যের যাহাতে ক্ষতি না হয় সেজন্যও নানা প্রকার বিধি নিষেধ মানিয়া চলিতে শিক্ষা নেওয়া।
vi) স্বাস্থ্য সমস্যাগুলি জনগণ নিজেদের সক্রিয়তা ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাধান করার লক্ষ্যে জনগণের জ্ঞান, দক্ষতা ও মনোভাব গড়িয়া তুলিতে সাহায্য করে।
vii) স্বাস্থ্য সার্ভিসের বিকাশ সাধন ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
প্রশ্ন- স্বাস্থ্য শিক্ষার নীতিসমূহ কি কি?
উত্তর : স্বাস্থ্য শিক্ষার নীতিসমূহ- স্বাস্থ্য শিক্ষা হইল চিকিৎসা শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষার মিলিত রূপ। স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রয়োজনীয় নীতিগুলি নিম্নরূপ। যথা-
ক) উদ্বুদ্ধকরণ: জনগণকে স্বাস্থ্য সম্বন্ধে জানার জন্য আগ্রহ জাগাইয়া তোলা।
খ) বোধশক্তি: জনগণের আক্ষরিক জ্ঞান এবং বোধগম্যের মান বিচার করিয়া
স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রদান করিতে হইবে। আঞ্চলিক ভাষায় যাহাতে শিক্ষার্থী বুঝিতে পারে সেভাবে শিক্ষাদান করিতে হইবে।
গ) জানা হইতে অজানা: জনসাধারণ যতটুকু জানে ঠিক সেখান হইতে আরম্ভকরিয়া নূতন জ্ঞানের দিকে অগ্রসর হইতে হইবে।
ঘ) আগ্রহ ও স্বার্থ : স্বাস্থ্য শিক্ষা জনগণের স্বার্থের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকিকে হইবে। স্বার্থের দিক বিশ্লেষণ করিয়া জনগণের আগ্রহ জাগাইয়া তুলিতে হইবে।
৩) অংশগ্রহণঃ দলগত আলোচনা, কার্যশাখা, প্রশিক্ষণ, প্রভৃতি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জনগণকে সক্রিয়ভাবে জ্ঞানদান করার জন্য এগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চ) পুণঃউপস্থাপন : কোন একটি বিষয়ে জ্ঞানার্জন সকলের পক্ষে একই সময়ে সম্ভবপর নাও হইতে পারে। তাই একটি বিষয় বার বার উপস্থাপন করিয়া সকলের বোধগম্য করিতে হইবে।
ছ) হাতে কলমে শিক্ষা: কোন একটি বিষয় বা কার্যক্রম দেখিয়া বা নিজে করিয়া হাতে কলমে শিক্ষাদান করিতে হইবে।
জ) সুব্যবস্থা: স্বাস্থ্য শিক্ষাদাতার উত্তম চরিত্র ও সু-ব্যবহার তাহার শিক্ষাগত
যোগ্যতার চাইতে বেশী মূল্যবান।
কা) নেতৃত্ব : গ্রামের নেতৃবৃন্দকে জনগণ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস করে। তাই তাহাদিগকে স্বাস্থ্য শিক্ষার গুরুত্ব বুঝাইয়া তাহাদের বিশ্বাস ও সমর্থন আদায় করিতে পারিলে কর্মসূচী বাস্তবায়ন সহজতর হয়।
প্রশ্ন- দৈনন্দিন জীবনে স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা কর।
উত্তর : দৈনন্দিন জীবনে স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (W. H. O) প্রদত্ত স্বাস্থ্যের সংজ্ঞার সাথে সঙ্গতি রাখিয়া বলা যায় যে মানুষের আচরণের প্রভাবে সৃষ্ট ব্যাধিগ্রস্ত রোগীর সংখ্যা হ্রাস করিতে এবং মানুষের শরীরকে মানসিক ও সামাজিক সুস্থতা অক্ষুন্ন রাখিতে স্বাস্থ্য শিক্ষার বিশেষ ভূমিকা রহিয়াছে। মানুষের দৈহিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গের গঠন ও কার্যাবলী সম্বন্ধে জানার জন্য এবং দৈহিক সুস্থতা রক্ষার সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি সম্বন্ধে পরিচিত হওয়ার জন্য স্বাস্থ্য শিক্ষা একান্তই প্রয়োজন।
বর্তমান যুগে অপুষ্টি জনস্বাস্থ্যের প্রধান সমস্যা। পুষ্টির জ্ঞান জনগণকে সর্বোত্তম ও সুষম আহার নির্বাচনে সহায়তা করে। আর স্বাস্থ্য শিক্ষার মাধ্যমেই এই জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব।
দেহকে রক্ষা করিতে হইলে নানাবিধ পীড়া হইতে আত্মরক্ষা এবং পীড়া দ্বারা আক্রান্ত হইলে তাহা হইতে নিরাময় লাভ করার নিয়ম কানুন সম্বন্ধে শিক্ষা লাভ করা প্রয়োজন। এই সকল প্রয়োজনীয় নিয়ম কানুনের সঙ্গে পরিচিত হইতে হইলে পরিকল্পিত স্বাস্থ্য শিক্ষা একান্তই আবশ্যক।
ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য রক্ষা ও পরিবেশগত স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। গোসল, পোশাক পরিচ্ছদ, বিভিন্ন অঙ্গের যত্ন, আলো, বায়ু চলনের প্রয়োজনীয়তা, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে খাদ্য বস্তু সংরক্ষণ, আবর্জনা ও মলমূত্র অপসারণ, প্রভৃতি সম্বন্ধে জ্ঞানার্জন একমাত্র স্বাস্থ্য শিক্ষা দ্বারাই সম্ভব। সংক্রামক ও অন্যান্য পীড়ার আক্রমণ প্রতিরোধ এবং এই বিষয়ে জনগণকে সচেতন করার জন্য স্বাস্থ্য শিক্ষা একান্তই প্রয়োজন।
দেহ ও মন একের সুস্থতা অন্যের উপর নির্ভরশীল। মানসিক স্বাস্থ্য, মানসিক প্রশান্তি রক্ষার কৌশল আয়ত্ব করিতে হইলেও স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সংরক্ষণ করিতে হইলে অন্যের বা গোষ্ঠীর স্বাস্থ্য যাহাতে ক্ষুন্ন না হয় সেজন্যও তাহাকে বহুবিধ নিয়ম মানিয়া চলিতে হইবে। আর তাহা একমাত্র সম্ভব 'স্বাস্থ্য শিক্ষার দ্বারা।
দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং দুর্ঘটনায় প্রাথমিক চিকিৎসা ও করণীয় সম্পর্কে অবহিত হইতে হইলে স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রয়োজন।
উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে নির্দ্বিধায় বলা যায় দৈনন্দিন জীবনে বিশেষতঃ ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে স্বাস্থ্য শিক্ষার বিশেষ, আবশ্যকতা রহিয়াছে।
প্রশ্ন- স্বাস্থ্য শিক্ষার বিষয়বস্তুসমূহ কি কি?
উত্তর : স্বাস্থ্য শিক্ষার বিষয়বস্তুসমূহ- স্বাস্থ্য শিক্ষার বিষয়বস্তু সমূহকে নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
i) মানব জীবতস্তু: স্কুল জীবন হইতেই শিশুদিগকে মানুষের দৈহিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গের গঠন ও কার্যাবলী সম্পর্কে জ্ঞানদানের সাথে সাথে দেহের সুস্থতা রক্ষার সাধারণ নিয়মকানুন ও স্বাস্থ্যবিধি সম্বন্ধে পরিচিত করানো উচিত। খেলাধুলা ও ব্যায়ামের প্রয়োজনীয়তা, বিশ্রাম, গোসল প্রভৃতি সম্পাদনের কৌশল শিক্ষা প্রদান, ধূমপান, মদ্যপানের কুফল ও পরিণতি ব্যাখ্যা করা, হাত, মুখ প্রভৃতি ধোয়ার কৌশল প্রভৃতি ব্যাখ্যা করিয়া বুঝানো উচিত।
ii) পারিবারিক স্বাস্থ্য : পরিবারকে একক ধরিয়া পারিবারিক স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য মা ও শিশুর পরিচর্যা, মানুষের বংশ বৃদ্ধি ও বিকাশ, পরিবার পরিকল্পনা, জনতন্তু, জনবিস্ফোরণ, পুষ্টিতত্ত্ব, প্রভৃতি সম্পর্কে জ্ঞানদান করা উচিত।
' iii) মানসিক স্বাস্থ্য: মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রতিকূল পরিবেশের মোকাবেলা, মানসিক প্রশান্তি রক্ষার কৌশল আয়ত্ব করা, মানসিক রোগ প্রতিরোধ করা, মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার কৌশল আয়ত্ব করা সম্পর্কে শিক্ষাদান ইহার বিষয়বস্তু।
iv) হাইজিন: ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য রক্ষা ও পরিবেশগত স্বাস্থ্য রক্ষা ইহার অন্ত র্গত। হাত মুখ ধৌতকরণ, দাঁত ও মুখের যত্ন, হাত পায়ের যত্ন, চুলের যত্ন, ত্বকের যত্ন, পোশাক পরিচ্ছদ, গোসল, শৌচকর্ম প্রভৃতি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যরক্ষার বিষয়বস্তু। অপরদিকে গৃহের পরিবেশ ও লোক সমাজের পরিবেশ, পরিবেশগত স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়বস্তু। গৃহ পরিবেশের ভিতর আলো, বায়ু চলাচলের প্রয়োজনীয়তা, স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাদ্য সংরক্ষণ, পানি ও সাবানের ব্যবহার প্রভৃতি, আবর্জনা ও মলমূত্র অপসারণ, কীট পতঙ্গ পরিহার প্রভৃতি। লোক সামজ পরিবেশকে স্বাস্থ্যসম্মত রাখা সরকারের দায়িত্ব।
v) সংক্রামক ব্যাধির নিয়ন্ত্রণ : সংক্রামক ব্যাধি এবং অন্যান্য ব্যাধি স্বাস্থ্য
শিক্ষার বিষয়বস্তু। কলেরা, বসন্ত, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, যৌনপীড়া, ডায়াবেটিস, এইডস, মাদকাসক্তি প্রভৃতি পীড়ার উপর প্রাথমিক জ্ঞান দান করিয়া জনগণকে এই সকল রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতন করা।
vi) দুর্ঘটনা প্রতিরোধ: বর্তমান যুগে প্রতি পদে পদে দুর্ঘটনা। রাস্তাঘাট,
বাসস্থান ও কর্মস্থলে সাধারণতঃ দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে। নিরাপদ জীবন যাপন সম্পর্কে শিক্ষাদান এবং দুর্ঘটনা এড়ানো ও দুর্ঘটনায় প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে জ্ঞান দান প্রভৃতিও স্বাস্থ্য শিক্ষার বিষয়বস্তু।
vii) পুষ্টি : জনসাধারণকে সুষম আহার নির্বাচনে পুষ্টিজ্ঞান যথেষ্ট সহায়তা করে। পুষ্টি সম্পর্কিত শিক্ষার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশী। কারণ অপুষ্টি গণস্বাস্থ্যের 'একটি প্রধান সমস্যা
viii) স্বাস্থ্য সার্ভিসের ব্যবহার : সরকার কর্তৃক প্রদত্ত চিকিৎসার সুযোগ
সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করাইয়া উহার সদ্ব্যবহার করার বিষয়ও স্বাস্থ্য শিক্ষার বিষয়বস্তু।
প্রশ্ন- স্বাস্থ্য শিক্ষার পরিধি আলোচনা কর।
উত্তর : স্বাস্থ্য শিক্ষার পরিধি- শুধুমাত্র রোগ নিরাময় করণেই স্বাস্থ্য শিক্ষার কাজ সীমাবদ্ধ নয়। ইহার পরিধি বহুব্যাপক। শারিরীক শিক্ষা, বিনোদনমূলক শিক্ষা, স্বাস্থ্যঘটিত বিভিন্ন বিষয় শিক্ষা, প্রভৃতি স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ স্বাস্থ্য শিক্ষার কর্মসূচীর অন্তর্ভুক্ত। স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ময়লা নিষ্কাশন ও আবর্জনা দূরীকরণ, উপযুক্ত আলো বাতাস, অবাধে বায়ু চলাচলের যথাযথ ব্যবস্থাকরণ, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ গঠন এবং প্রয়োজনীয় খাদ্য, বাসস্থান, পোষাক পরিচ্ছদ, প্রভৃতি সবকিছুই স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপনের জন্য অপরিহার্য। এই সব বিষয় স্বাস্থ্য শিক্ষার আবশ্যকীয় অঙ্গ। রোগ প্রতিরোধ, শারীরিক ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতার সংশোধন এবং জীবন যাপনের জন্য সুষ্ঠু ও আদর্শ পরিবেশের সৃষ্টি স্বাস্থ্য শিক্ষার পরিধির আওতায়। শারীরিক নিরাপত্তা, আত্ম উপলব্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সমাজের হিত সাধন প্রভৃতি বিষয়গুলিও বর্তমানে স্বাস্থ্য শিক্ষার পরিধির অন্তর্ভুক্ত। ব্যক্তির আচরণের মূল উৎস কি, কোন কাজ করার পশ্চাতে শিশু এবং প্রাপ্ত বয়স্কদের কোন ধরণের প্রেরণা থাকে, স্বাস্থ্য সম্মত কোন তথ্যগুলি তাহাদের জানা এবং অনুসরণ করা উচিত প্রভৃতি স্বাস্থ্য শিক্ষার পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত। পরিবেশ বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যক্তি ও জনগণের স্বাস্থ্য সম্বন্ধে শিক্ষার্থীর মনে স্পষ্ট ধারণা তৈরী করা এবং বিভিন্ন প্রকার স্বাস্থ্যসম্মত কাজ করিতে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করা এবং সেজন্য বিভিন্ন তথ্য, সংবাদ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রভৃতি সংগ্রহ করিতে শিক্ষার্থীকে সাহায্য করা প্রভৃতি ইহার অন্তর্ভুক্ত। স্বাস্থ্য শিক্ষার জ্ঞান লাভের ফলে শিক্ষার্থী স্বাস্থ্যঘটিত বিভিন্ন সমস্যাগুলির প্রকৃত সমাধান করিতে শিখে এবং সুষ্ঠ ও স্বাস্থ্যময় জীবন যাপন করিতে সমর্থ হয়।
প্রশ্ন- স্বাস্থ্য শিক্ষায় ডাক্তার ও মেডিকেল ছাত্রের ভূমিকা কি?
উত্তর: স্বাস্থ্য শিক্ষায় ডাক্তার ও মেডিকেল ছাত্রের ভূমিকা- স্বাস্থ্য শিক্ষায় ডাক্তার ও মেডিকেল ছাত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রহিয়াছে। লোক সমাজ চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে ডাক্তার শুধুমাত্র চিকিৎসকই নন, তিনি একজন শিক্ষকও বটে। রোগী চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হইলে ডাক্তার আরোগ্যের নিমিত্তে ঔষধ প্রয়োগ ছাড়াও রোগীকে স্বাস্থ্যরক্ষা, রোগ প্রতিরোধ বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়া থাকেন। মেডিকেল ছাত্ররাও ছাত্রাবস্থায় নিজ বাড়ী ঘরে ও সমাজে স্বাস্থ্য রক্ষা বিষয়ে উপদেশ প্রদান করিতে পারে। তাই স্বাস্থ্য শিক্ষায় ডাক্তার ও মেডিকেল ছাত্রের ভূমিকা অপরিসীম।
প্রশ্ন- প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা বলিতে কি বুঝ?
উত্তর: প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা- প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা বা Primary Health care বলিতে সম্পূর্ণরূপে রোগ প্রতিরোধ বা প্রতিষেধক বুঝায়। প্রত্যেক মানুষ তাহার নিজ নিজ শরীরের অধিকর্তা। দেহ এমন এক জটিল যন্ত্র, যতক্ষণ পর্যন্ত ইহা খারাপ না হয় ততক্ষণ মানুষ এই দেহের কথা চিন্তাই করে না। দেহ সুস্থ রাখিতে হইলে এই দেহযন্ত্রের প্রতিটি অংগের রক্ষণাবেক্ষণ বিশেষ প্রয়োজন। এই রক্ষণাবেক্ষণকেই বলে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা বা প্রাইমারী হেলথ কেয়ার।
প্রশ্ন- প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার উপাদানসমূহ কি কি?
উত্তর : প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার উপাদানসমূহ- প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার উপাদানসমূহ নিম্নে উল্লেখ করা গেল। যথা-
i) প্রাথমিক চিকিৎসা শিক্ষা।
ii) মা ও শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষা।
iii) জন্মনিয়ন্ত্রণ ও জনসংখ্যার আয়তন স্থিতিকরণ।
iv) সুষম খাদ্য সম্পর্কে সকলকে শিক্ষা দেওয়া।
v) সকল শিশুকে রোগ প্রতিষেধক টিকা খাওয়ানো ও দেওয়া।
vi) বিশুদ্ধ পানি পান, 'পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়া, নিয়মিত আহার, নিদ্রা ও বিশ্রাম প্রভৃতি।
প্রশ্ন- প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার গুরুত্ব আলোচনা কর।
উত্তর: প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার গুরুত্ব- প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার গুরুত্বসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হইল। যথা-
i) অনেক সময় দেখা যায় যে সাধারণ দুর্ঘটনায় প্রাথমিক চিকিৎসার অভাবে রোগী মৃত্যুবরণ করে। কাজেই প্রত্যেকেরই প্রাথমিক চিকিৎসার জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। এই প্রাথমিক চিকিৎসা শিক্ষা প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
ii) প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার দ্বারা আমরা স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি পান, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, মলমূত্র ত্যাগ ও নিষ্কাশন প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করিতে পারি।
iii) প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার জ্ঞানের অভাবে অনেক মা গর্ভাবস্থায় মারা যায়। অতিরিক্ত রক্তপাত, এক্লাম্পশিয়া, রক্তশূণ্যতা ও জন্ডিসের কারণে বহু মা এবং ইনফেকশানের কারণে নবজাত শিশু মৃত্যুবরণ করে। প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার জ্ঞান লাভের ফলে এই সকল অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
iv) প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যায় সকল শিশুকে ৬টি রোগের প্রতিষেধক টিকা দেওয়া হয়। এই ৬টি রোগ হইল পোলিও, যক্ষ্মা, টিটেনাস, ডিপথিরিয়া, হুপিং
হাইজিন এন্ড পাবলিক হেলথ ৫০
ক্ষুন্ন না হয় সেজন্যও তাহাকে বহুবিধ নিয়ম মানিয়া চলিতে হইবে। আর তাহা একমাত্র সম্ভব 'স্বাস্থ্য শিক্ষার দ্বারা।
দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং দুর্ঘটনায় প্রাথমিক চিকিৎসা ও করণীয় সম্পর্কে অবহিত হইতে হইলে স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রয়োজন।
উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে নির্দ্বিধায় বলা যায় দৈনন্দিন জীবনে বিশেষতঃ ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে স্বাস্থ্য শিক্ষার বিশেষ, আবশ্যকতা রহিয়াছে।
প্রশ্ন- স্বাস্থ্য শিক্ষার বিষয়বস্তুসমূহ কি কি?
উত্তর : স্বাস্থ্য শিক্ষার বিষয়বস্তুসমূহ- স্বাস্থ্য শিক্ষার বিষয়বস্তু সমূহকে নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
ⅰ) মানব জীবতস্তু : স্কুল জীবন হইতেই শিশুদিগকে মানুষের দৈহিক অঙ্গ
প্রত্যঙ্গের গঠন ও কার্যাবলী সম্পর্কে জ্ঞানদানের সাথে, সাথে দেহের সুস্থতা রক্ষার সাধারণ নিয়মকানুন ও স্বাস্থ্যবিধি সম্বন্ধে পরিচিত করানো উচিত। খেলাধুলা ও ব্যায়ামের প্রয়োজনীয়তা, বিশ্রাম, গোসল প্রভৃতি সম্পাদনের কৌশল শিক্ষা প্রদান, ধূমপান, মদ্যপানের কুফল ও পরিণতি ব্যাখ্যা করা, হাত, মুখ প্রভৃতি ধোয়ার কৌশল প্রভৃতি ব্যাখ্যা করিয়া বুঝানো উচিত।
ii) পারিবারিক স্বাস্থ্য: পরিবারকে একক ধরিয়া পারিবারিক স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য
মা ও শিশুর পরিচর্যা, মানুষের বংশ বৃদ্ধি ও বিকাশ, পরিবার পরিকল্পনা, জনতত্ত্ব, জনবিস্ফোরণ, পুষ্টিতত্ত্ব, প্রভৃতি সম্পর্কে জ্ঞানদান করা উচিত।
iii) মানসিক স্বাস্থ্য : মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রতিকূল পরিবেশের মোকাবেলা, মানসিক প্রশান্তি রক্ষার কৌশল আয়ত্ব করা, মানসিক রোগ প্রতিরোধ করা, মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার কৌশল আয়ত্ব করা সম্পর্কে শিক্ষাদান ইহার বিষয়বস্তু।
iv) হাইজিন : ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য রক্ষা ও পরিবেশগত স্বাস্থ্য রক্ষা ইহার অন্ত র্গত। হাত মুখ ধৌতকরণ, দাঁত ও মুখের যত্ন, হাত পায়ের যত্ন, চুলের যত্ন, ত্বকের যত্ন, পোশাক পরিচ্ছদ, গোসল, শৌচকর্ম প্রভৃতি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যরক্ষার বিষয়বস্তু। অপরদিকে গৃহের পরিবেশ ও লোক সমাজের পরিবেশ, পরিবেশগত স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়বস্তু। গৃহ পরিবেশের ভিতর আলো, বায়ু চলাচলের প্রয়োজনীয়তা, স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাদ্য সংরক্ষণ, পানি ও সাবানের ব্যবহার প্রভৃতি, আবর্জনা ও মলমূত্র অপসারণ, কীট পতঙ্গ পরিহার প্রভৃতি। লোক সামজ পরিবেশকে স্বাস্থ্যসম্মত রাখা সরকারের দায়িত্ব।
v) সংক্রামক ব্যাধির নিয়ন্ত্রণ: সংক্রামক ব্যাধি এবং অন্যান্য ব্যাধি স্বাস্থ্য
শিক্ষার বিষয়বস্তু। কলেরা, বসন্ত, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, যৌনপীড়া, ডায়াবেটিস, এইডস, মাদকাসক্তি, প্রভৃতি পীড়ার উপর প্রাথমিক জ্ঞান দান করিয়া জনগণকে এই সকল রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতন করা।
vi) দুর্ঘটনা প্রতিরোধ : বর্তমান যুগে প্রতি পদে পদে দুর্ঘটনা। রাস্তাঘাট,
বাসস্থান ও কর্মস্থলে সাধারণতঃ দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে। নিরাপদ জীবন যাপন সম্পর্কে শিক্ষাদান এবং দুর্ঘটনা এড়ানো ও দুর্ঘটনায় প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে জ্ঞান দান প্রভৃতিও স্বাস্থ্য শিক্ষার বিষয়বস্তু।
vii) পুষ্টি : জনসাধারণকে সুষম আহার নির্বাচনে পুষ্টিজ্ঞান যথেষ্ট সহায়তা কবে। পুষ্টি সম্পর্কিত শিক্ষার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশী। কারণ অপুষ্টি গণস্বাস্থ্যের একটি প্রধান সমস্যা।
viii) স্বাস্থ্য সার্ভিসের ব্যবহার : সরকার কর্তৃক প্রদত্ত চিকিৎসার সুযোগ সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করাইয়া উহার সদ্ব্যবহার করার বিষয়ও স্বাস্থ্য শিক্ষার বিষয়বস্তু।
প্রশ্ন- স্বাস্থ্য শিক্ষার পরিধি আলোচনা কর।
উত্তর: স্বাস্থ্য শিক্ষার পরিধি- শুধুমাত্র রোগ নিরাময় করণেই স্বাস্থ্য শিক্ষার কাজ সীমাবদ্ধ নয়। ইহার পরিধি বহুব্যাপক। শারিরীক শিক্ষা, বিনোদনমূলক শিক্ষা, স্বাস্থ্যঘটিত বিভিন্ন বিষয় শিক্ষা, প্রভৃতি স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ স্বাস্থ্য শিক্ষার কর্মসূচীর অন্তর্ভুক্ত। স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ময়লা নিষ্কাশন ও আবর্জনা দূরীকরণ, উপযুক্ত আলো বাতাস, অবাধে বায়ু চলাচলের যথাযথ ব্যবস্থাকরণ, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ গঠন এবং প্রয়োজনীয় খাদ্য, বাসস্থান, পোষাক পরিচ্ছদ, প্রভৃতি সবকিছুই স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপনের জন্য অপরিহার্য। এই সব বিষয় স্বাস্থ্য শিক্ষার আবশ্যকীয় অঙ্গ। রোগ প্রতিরোধ, শারীরিক ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতার সংশোধন এবং জীবন যাপনের জন্য সুষ্ঠু ও আদর্শ পরিবেশের সৃষ্টি স্বাস্থ্য শিক্ষার পরিধির আওতায়। শারীরিক নিরাপত্তা, আত্ম উপলব্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সমাজের হিত সাধন প্রভৃতি বিষয়গুলিও বর্তমানে স্বাস্থ্য শিক্ষার পরিধির অন্তর্ভুক্ত। ব্যক্তির আচরণের মূল উৎস কি, কোন কাজ করার পশ্চাতে শিশু এবং প্রাপ্ত বয়স্কদের কোন ধরণের প্রেরণা থাকে, স্বাস্থ্য সম্মত কোন তথ্যগুলি তাহাদের জানা এবং অনুসরণ করা উচিত প্রভৃতি স্বাস্থ্য শিক্ষার পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত। পরিবেশ বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যক্তি ও জনগণের স্বাস্থ্য সম্বন্ধে শিক্ষার্থীর মনে স্পষ্ট ধারণা তৈরী করা এবং বিভিন্ন প্রকার স্বাস্থ্যসম্মত কাজ করিতে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করা এবং সেজন্য বিভিন্ন তথ্য, সংবাদ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রভৃতি সংগ্রহ করিতে শিক্ষার্থীকে সাহায্য করা প্রভৃতি ইহার অন্তর্ভুক্ত। স্বাস্থ্য শিক্ষার জ্ঞান লাভের ফলে শিক্ষার্থী স্বাস্থ্যঘটিত বিভিন্ন সমস্যাগুলির প্রকৃত সমাধান করিতে শিখে এবং সুষ্ঠ ও স্বাস্থ্যময় জীবন যাপন করিতে সমর্থ হয়।
প্রশ্ন- স্বাস্থ্য শিক্ষায় ডাক্তার ও মেডিকেল ছাত্রের ভূমিকা কি?
উত্তর: স্বাস্থ্য শিক্ষায় ডাক্তার ও মেডিকেল ছাত্রের ভূমিকা- স্বাস্থ্য শিক্ষায় ডাক্তার ও মেডিকেল ছাত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রহিয়াছে। লোক সমাজ চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে ডাক্তার শুধুমাত্র চিকিৎসকই নন, তিনি একজন শিক্ষকও বটে। রোগী চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হইলে ডাক্তার আরোগ্যের নিমিত্তে ঔষধ প্রয়োগ ছাড়াও রোগীকে স্বাস্থ্যরক্ষা, রোগ প্রতিরোধ বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়া থাকেন। মেডিকেল ছাত্ররাও ছাত্রাবস্থায় নিজ বাড়ী ঘরে ও সমাজে স্বাস্থ্য রক্ষা বিষয়ে উপদেশ প্রদান করিতে পারে। তাই স্বাস্থ্য শিক্ষায় ডাক্তার ও মেডিকেল ছাত্রের ভূমিকা অপরিসীম।
প্রশ্ন- প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা বলিতে কি বুঝ?
উত্তর : প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা- প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা বা Primary Health care বলিতে সম্পূর্ণরূপে রোগ প্রতিরোধ বা প্রতিষেধক বুঝায়। প্রত্যেক মানুষ তাহার নিজ নিজ শরীরের অধিকর্তা। দেহ এমন এক জটিল যন্ত্র, যতক্ষণ পর্যন্ত ইহা খারাপ না হয় ততক্ষণ মানুষ এই দেহের কথা চিন্তাই করে না। দেহ সুস্থ রাখিতে হইলে এই দেহযন্ত্রের প্রতিটি অংগের রক্ষণাবেক্ষণ বিশেষ প্রয়োজন। এই রক্ষণাবেক্ষণকেই বলে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা বা প্রাইমারী হেলথ কেয়ার।
প্রশ্ন- প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার উপাদানসমূহ কি কি?
উত্তর : প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার উপাদানসমূহ- প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার উপাদানসমূহ নিম্নে উল্লেখ করা গেল। যথা-
i) প্রাথমিক চিকিৎসা শিক্ষা।
ii) মা ও শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষা।
iii) জন্মনিয়ন্ত্রণ ও জনসংখ্যার আয়তন স্থিতিকরণ।
iv) সুষম খাদ্য সম্পর্কে সকলকে শিক্ষা দেওয়া।
v) সকল শিশুকে রোগ প্রতিষেধক টিকা খাওয়ানো ও দেওয়া।
vi) বিশুদ্ধ পানি পান, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়া, নিয়মিত আহার, নিদ্রা ও বিশ্রাম প্রভৃতি।
প্রশ্ন- প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার গুরুত্ব আলোচনা কর।
উত্তর: প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার গুরুত্ব- প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার গুরুত্বসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হইল। যথা-
i) অনেক সময় দেখা যায় যে সাধারণ দুর্ঘটনায় প্রাথমিক চিকিৎসার অভাবে রোগী মৃত্যুবরণ করে। কাজেই প্রত্যেকেরই প্রাথমিক চিকিৎসার জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। এই প্রাথমিক চিকিৎসা শিক্ষা প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
ii) প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার দ্বারা আমরা স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি পান, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, মলমূত্র ত্যাগ ও নিষ্কাশন প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করিতে পারি।
iii) প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার জ্ঞানের অভাবে অনেক মা গর্ভাবস্থায় মারা যায়। অতিরিক্ত রক্তপাত, এক্লাম্পশিয়া, রক্তশূণ্যতা ও জন্ডিসের কারণে বহু মা এবং ইনফেকশানের কারণে নবজাত শিশু মৃত্যুবরণ করে। প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার জ্ঞান লাভের ফলে এই সকল অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
iv) প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যায় সকল শিশুকে ৬টি রোগের প্রতিষেধক টিকা দেওয়া হয়। এই ৬টি রোগ হইল পোলিও, যক্ষ্মা, টিটেনাস, ডিপথিরিয়া, হুপিং কাশি ও হাম। এই টিকা দেওয়ার ফলে শিশুরা উক্ত ৬টি সংক্রামক রোগ হইতে নিরাপদ থাকে।
v) সবুজ শাক সবজীর মধ্যে ভিটামিন এ প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান থাকে। নিয়মিত শাকসবজী খাইলে শিশুরা অন্ধত্বের হাত হইতে রক্ষা পায়। প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার জ্ঞান থাকিলে স্বল্প মূল্যে খাদ্যের ব্যবস্থা করা সম্ভব।
প্রশ্ন- কিভাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা জ্ঞান বা প্রাইমারী হেলথ কেয়ার শিক্ষা দেশের জনসাধারণের মধ্যে প্রসার করা যায়?
উত্তর: প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা জ্ঞান বা প্রাইমারী হেলথ কেয়ার শিক্ষা দেশের জনসাধারণের মধ্যে প্রসারে করণীয়- দেশের জনসাধারণের মধ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা জ্ঞান প্রসার করিতে হইলে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। যথা-
i) বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মাঝে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা জ্ঞানের প্রসার ঘটাইতে হইলে প্রতিটি বিদ্যালয়ের ৮ম হইতে ১০ম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের পাঠ্যসূচীতে প্রাইমারী হেলথ কেয়ার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করিয়া বাস্তাব শিক্ষা দান করিতে হইবে।
ii) প্রত্যেক গ্রামে যে সকল ক্লাব আছে বা প্রয়োজন বোধে নূতন ক্লাব বা যুব সংঘ গঠন করিয়া উহার সদস্যগণ সপ্তাহে ১দিন বা ২দিন প্রতি রাড়ী বাড়ী গিয়া জনসাধারণকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা সম্পর্কিত জ্ঞান শিক্ষা দিতে হইবে।
iii) সকল ডাক্তার এবং মেডিকেল ছাত্রছাত্রীরা প্রাইমারী হেলথ কেয়ার হাতে কলমে শিক্ষা গ্রহণ করিতে হইলে অন্ততঃ ছয়মাস গ্রামাঞ্চলে গিয়া প্রাইমারী হেলথ কেয়ার শিখিতে হইবে।
iv) জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যম রেডিও, টেলিভিশন, সিনেমা, পত্রপত্রিকা এবং পোষ্টার, প্লাকার্ড ও সভা সমিতির মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা সম্বন্ধে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করিতে হইবে এবং শিক্ষিত করিয়া তুলিতে হইবে।
প্রশ্ন- ব্যক্তি বলিতে কি বুঝ? ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য বলিতে কি বুঝ?
উত্তর : ব্যক্তি ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য- ব্যক্তি বলিতে একটি পৃথক এবং স্বাধীন সত্বাকে বুঝায়। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য বলিতে কোন বিশেষ ব্যক্তির বা নিজের আহার, নিদ্রা, বিশ্রাম, পোষাক পরিচ্ছদ, পানীয় প্রভৃতি দ্বারা নিয়মিত অভ্যাস করিয়া সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকিয়া দীর্ঘজীবন লাভ করা বুঝায়।
প্রশ্ন- ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য রক্ষার্থে কি কি নিয়মাবলী মানিয়া চলা উচিত?
বা, ব্যক্তিস্বাস্থ্য রক্ষার অবশ্য পালনীয় অভ্যাসগুলির নাম কর।
বা, কি কি মৌলিক বিষয়ের উপর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য রক্ষা নির্ভরশীল?
বা, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যনীতি সম্বন্ধে আলোচনা কর।
উত্তর: ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যনীতি- ব্যক্তিগত চেষ্টার দ্বারা স্বাস্থ্য রক্ষার যে সব বিধি-
বা নিয়ম পালন করা হয় তাহাই ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যনীতি। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য রক্ষার্থে নিম্নলিখিত নিয়মাবলী অবশ্যই পালন করিতে হইবে। যথা-
i) অভ্যাস: মানুষ অভ্যাসের দাস। ভাল অভ্যাস মানুষের দেহ ও মনকে সুস্থ ও সবল রাখে এবং সহজ ও সরল পথে পরিচালিত করিতে সহায়তা করে। বদঅভ্যাস ও কুঅভ্যাস মানুষকে বিপথে পরিচালিত করিয়া স্বাস্থ্যহীন ও দুর্বল করিয়া ফেলে। সুতরাং বদ অভ্যাস ত্যাগ করিয়া সদ্-অভ্যাসগুলি পালন করিতে হইবে। ব্যক্তিস্বাস্থ্য রক্ষার অবশ্য পালনীয় অভ্যাসগুলি হইল প্রত্যুষে শয্যাত্যাগ, মলমূত্র ত্যাগ ও হাত মুখ ধৌতকরণ, প্রতিদিন স্নান করা, নির্দিষ্ট সময়ে আহার ও নিদ্রা, সুস্থ মনে রুচিকর সুষম খাদ্য গ্রহণ, পরিমিত ভোজন, খাদ্য ও পানীয়ের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে সতর্ক থাকা, আহারের পূর্বে ভালভাবে হাত মুখ ধৌত করা, আহারের সময় পানি পান না করিয়া অন্ততঃ আহারের আধঘন্টা পর পানি পানের অভ্যাস করা প্রভৃতি।
ii) নিদ্রা ও বিশ্রাম : শরীর ও মনকে বিশ্রাম দিবার জন্য নিদ্রার প্রয়োজন। দৈনন্দিন জীবনে পরিশ্রমের ফলে আমাদের শরীরের ক্ষয় হয়। তাই আমরা অবসাদগ্রস্ত' হই। এই ক্ষয় পূরণের জন্য এবং কর্মোদ্যম পুনোর্জীবিত করার জন্য পূর্ণ বিশ্রামের প্রয়োজন। নিদ্রাকালে আমাদের শরীর ও মন বিশ্রাম পায়। যাহারা কঠিন পরিশ্রম করেন তাহাদিগকে ২/৩ ঘন্টা পরিশ্রম করার পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে হইবে। তাহাছাড়া প্রত্যহ নিয়মিত ভাবে ৭/৮ ঘন্টা সুনিদ্রার প্রয়োজন।
iii) পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাঃ শরীরের বৃদ্ধি এবং পুষ্টির জন্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের আহার্য, পানীয় ও শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য বায়ু বিশুদ্ধ ও নির্মল হওয়া আবশ্যক। আমাদের দেহ হইতে ঘর্ম নিৎসারিত হয় তাই দেহের চর্ম সর্বদা পরিষ্কার রাখিতে হইবে। দেহাভ্যন্তরস্থিত দূষিত পদার্থ ঘর্ম ও মলমূত্রের সহিত নির্গত হয়। লোমকূপের মুখ যাহাতে বন্ধ না হয় সেজন্য ত্বক সর্বদা পরিষ্কার রাখিতে হইবে। ত্বকের উপর সঞ্চিত ময়লা চর্মরোগের জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরী করে। দেহের কোন কোন অংশে যেমন বগল, কুঁচকিতে ঘর্ম জমা হইয়া দুর্গন্ধের সৃষ্টি করে। প্রত্যহ অন্ততঃ একবার স্নান করিতে হইবে। স্নানের সময় ত্বক ভালভাবে রগড়াইতে হইবে। সপ্তাহে অন্ততঃ ২দিন সাবান দিয়া ত্বক পরিষ্কার করিতে হইবে। গরম পানিতে স্নান চর্মের পক্ষে উত্তেজক, ইহাতে রক্ত সঞ্চালনের বৃদ্ধি ঘটে। প্রতিদিন ঘুম হইতে উঠার পর মুখ, জিহ্বা ও দাঁত উত্তমরূপে পরিষ্কার করিতে হইবে। প্রত্যেকবার আহারের পর মুখ ও দাঁত ভালভাবে ধৌত করিতে হইবে। খাদ্যাংশ যাহাতে দাঁতের ফাঁকে জমা না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখিতে হইবে। কখনও নখে ময়লা জমিতে দিতে নাই। চুলে মাঝে মাঝে সাবান দিতে হইবে ও চিরুনী দ্বারা নিয়মিত আঁচড়াইতে হইবে।
iv) বাসগৃহের পরিচ্ছন্নতা: বাসগৃহ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকিলে মনের প্রফুল্লতা বৃদ্ধি পায়। ঘরের মধ্যে যাহাতে আলো বাতাস প্রবেশ করিতে পারে সেজন্য দরজা জানালা উন্মুক্ত রাখিতে হইবে। রাত্রিতে জানালা খুলিয়া শয়ন করা স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী। ঘরের মেঝে পরিষ্কার রাখিতে হইবে। ঘরের আশে পাশে যাহাতে ময়লা আবর্জনা বা পানি জমিতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকিতে হইবে। সম্ভব হইলে বাসগৃহের পাশে ফুলের বাগানের ব্যবস্থা করা ভাল।
v) পোষাক পরিচ্ছদ: শীত ও উত্তাপ হইতে দেহকে রক্ষা করার জন্য ঋতু অনুসারে সময়োপযোগী পোষাক পরিচ্ছদ ব্যবহার করিতে হইবে। তাহা ছাড়া সৌন্দর্যবৃদ্ধির জন্য এবং শ্লীলতা রক্ষার জন্যও পোষাক পরিচ্ছদের প্রয়োজন। পোষাক পরিচ্ছদ যাহাতে অপরিষ্কার না থাকে সেজন্য সপ্তাহে অন্ততঃ দুইবার ব্যবহৃত পোষাক সাবান দিয়া ভালভাবে কাচিয়া নিতে হইবে। শিশুদের পোষাক নরম, হালকা, গরম ও ঢিলা হওয়া আবশ্যক। আবহাওয়া অনুসারে সুতী অথবা পশমী পোষাক ব্যবহার করা উচিত। আটসাট পোষাক পরিধান করা দেহের পক্ষে ক্ষতিকর।
vi) ব্যায়াম : শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সঞ্চালিত না করিলে দেহের কর্মক্ষমতা লোপ পায়। তাই সব বয়সের স্ত্রী পুরুষের পক্ষে ব্যায়াম অত্যাবশ্যক। পরিণাক শক্তির বৃদ্ধির জন্য শরীরের প্রত্যেক অঙ্গ নিয়মিতভাবে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। ব্যায়ামের ফলে দেহ ঘর্মাক্ত হয়, শরীরের অভ্যন্তরস্থ দূষিত ক্লেদ নিঃসৃত হওয়ার সুযোগ পায়। ব্যায়ামের সময় আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত চলিতে থাকে এবং তাহার ফলে যথেষ্ট পরিমাণ অক্সিজেন আমাদের দেহে প্রবেশ করে এবং রক্ত পরিষ্কার করে। শ্বাসতন্ত্র, সঞ্চালন তন্ত্র, মাংসপেশীতন্ত্র, ত্বকতন্ত্র, প্রস্রাবতন্ত্র ও খাদ্য পরিপাকতন্ত্রের উপর ব্যায়ামের কার্যকারিতা অনেক। প্রত্যুষে ও বিকালবেলা ব্যায়ামের উপযুক্ত সময়। মুক্ত বাতাসে ও খালি গায়ে ব্যায়াম করা উচিত। নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস করিলে মন দৃঢ় ও সংযত হয়।
vii) আমোদ-প্রমোদ: আমাদের দেহের সহিত মনের সম্পর্ক নিবিড়। মন প্রফুল্ল রাখার জন্য নির্দোষ আমোদ প্রমোদের প্রয়োজন। মন প্রফুল্ল না থাকিলে বর্জনীয়। গানবাজনা, হাডুডু, কপাটি খেলা প্রভৃতিতে আমোদ প্রমোদ উপভোগ করা যায়।
viii) কুঅভ্যাস-ধুমপান, নেশাগ্রহণ বর্জন : ভাল অভ্যাস যেমন স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী তেমনি খারাপ অভ্যাস স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। ধুমপান একটি ক্ষতিকর অভ্যাস। তামাকে নিকোটিন নামক একপ্রকার মারাত্মক বিষ থাকে। ধুমপায়ীদের ফুসফুস নিকোটিন বিষে ক্ষতিগ্রস্থ হইয়া পড়ে। ধুমপানে হজমশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পায়। ওষ্ঠ, জিহ্বা ও কণ্ঠনালীতে ক্যান্সার 'হইবার আশংকা থাকে। অতএব ধুমপানের অভ্যাস না করাই ভাল।
রাত্রিজাগরণ, মদ্যপান, যেখানে সেখানে পানাহার করা প্রভৃতি কুঅভ্যাস স্বাস্থ্যর পক্ষে ক্ষতিকর। কুচিন্তা ও কুসংসর্গ শরীর ও মনের পক্ষে ক্ষতিকর। অতএব পরিত্যজ্য।
প্রশ্ন- স্বাস্থ্যপ্রদ বাসগৃহ নির্মাণের জন্য কোন কোন বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখিতে হইবে?
উত্তর : স্বাস্থ্যপ্রদ বাসগৃহ নির্মাণ- স্বাস্থ্য ও মানসিক শক্তি অনেকাংশে বাসগৃহের উপর নির্ভর করে। সুন্দর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন গৃহ শরীর ও মন প্রফুল্ল রাখে। স্বাস্থ্যপ্রদ গৃহ নির্মাণ করিতে হইলে নিম্নালিখিত বিষয়গুলির প্রতি লক্ষ্য রাখিতে হইবে।
ⅰ) গৃহের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচন।
ii) বাড়ীর নক্সা।
iii) বাড়ীর মালামাল ও জিনিষপত্রাদি।
iv) গৃহে আলো বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা।
v) গৃহের ভিত্তি ও আদ্রতা নিবারক স্তর।
vi) স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ও গোসলখানা।
vii) পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা।
viii) পানি সরবরাহের ব্যবস্থা।
ix) ব্যবহৃত পানি ও আবর্জনা দূরীকরণের ব্যবস্থা।
প্রশ্ন- একটি আদর্শ স্বাস্থ্যপ্রদ বাড়ীর স্থান নির্বাচন সম্বন্ধে আলোচনা কর।
উত্তর: একটি আদর্শ স্বাস্থ্যপ্রদ বাড়ীর স্থান নির্বাচন- বাসগৃহ নির্মাণের জন্য এমন একটি স্থান নির্বাচন করিতে হইবে যাহাতে তাহা স্বাস্থ্যের পক্ষে কোনরূপ ক্ষতিকর না হয়। স্থান নির্বাচনের পক্ষে নিম্নলিখিত বিষয়গুলির প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা উচিত। যথা-
ক) গৃহের স্থান শুষ্ক, গরম, আলো বাতাসমুক্ত হইবে এবং ইহার পারিপার্শ্বিক অবস্থাও ভাল হইতে হইবে।
খ) নির্মল পানীয় জল সরবরাহ ও আশু ময়লা নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখিতে হইবে।
গ) বাসস্থানের ভূমি চতুর্দিকের জমি হইতে উঁচু; শুকনা ও ঢালু হইবে যাহাতে পানি নিষ্কাশন হইতে পারে।
ঘ) জমি শোষক হওয়া উচিত। শোষক জমি অর্থাৎ যে জমিতে কাঁকর, বালি বা পাথর বেশী থাকে, সেই জমিতে বাড়ি নির্মান করা উচিত।
ঙ) নদীর চর ও পর্বতের পাদদেশ বাসস্থানের জন্য উপযুক্ত স্থান নয়। নিচু জমি বা জলাভূমি ভরাট করিয়া তাহার উপর গৃহ নির্মাণ করা উচিত নয়।
চ) কবর স্থান, শ্মাশন, কসাইখানা, কলকারখানা, মৃত জীবজন্তু ফেলিবার ভাগাড়ের নিকট বা যেখানে খুব গোলযোগ হয় সেখানে বাসগৃহ নির্মাণ করা দেহ ও মনের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর।
হাইজিন এন্ড পাবলিক হেলথ ৫৯
ছ) স্থান নির্বাচনের সময় জমির দক্ষিণ ও পূর্বদিক খোলা আছে কিনা এবং সেখানে উপযুক্ত বাতাস ও সূর্যালোক প্রবেশ করিতে পারে কিনা সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখিতে হইবে।
প্রশ্ন- একটি আদর্শ স্বাস্থ্যপ্রদ বাড়ীর নকশা ও মাল মসলা সম্বন্ধে আলোচনা কর।
উত্তর: একটি আদর্শ স্বাস্থ্যপ্রদ বাড়ীর নকশা- বাসগৃহ যাহাতে স্বাস্থ্যপ্রদ হয়
সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখিতে হইবে এবং তজ্জন্য গৃহ নির্মাণের পূর্বে একটি নক্সা তৈরী করিতে হইবে। নকসা তৈরীর সময় নিম্নলিখিত বিষয়গুলির উপর লক্ষ্য রাখিতে হইবে।
বসতবাড়ীতে যাহাতে অবাধে আলোবাতাস প্রবেশ করিতে পারে তজ্জন্য জমির অন্ততঃ এক তৃতীয়াংশ উন্মুক্ত থাকিবে। ছেলেমেয়েদের খেলাধুলার জন্য কিছু খোলা জায়গা ও সবজী বা ফুল বাগানের জন্য কিছু জমি থাকা ভাল। প্রয়োজনীয় শয়ন কক্ষ নির্মাণ করিতে হইবে। শয়নকক্ষ ছাড়াও গৃহে খাওয়ার ঘর, পড়ার ঘর, বৈঠকখানা, বান্না ঘর ইত্যাদি থাকিতে হইবে। পায়খানার নিকটে রান্নাঘর থাকিবে না। রান্না ঘর হইতে যাহাতে সহজে ধোঁয়া নির্গত হইতে পারে সেজন্য অনেকগুলি জানালা রাখিতে হইবে এবং চিমনির ব্যবস্থা রাখিতে হইবে। বাসগৃহ হইতে পানি ও তরল আবর্জনা দূরীকরণের জন্য উপযুক্ত নর্দমা রাখিতে হইবে।
গৃহ নির্মাণের মাল মসলা- পাকাবাড়ী নির্মাণ করিতে ইট, বালু, সিমেন্ট রড ইত্যাদি ব্যবহার করিতে হয়। প্রথম শ্রেণীর ইট, সিমেন্ট, চুন সুরকী ব্যবহার করা উচিত, অন্যথায় ইহা ভূমি হইতে পানি শোষণ করিবে এবং গৃহ আর্দ্র হইয়া উঠিবে। পাকা বাড়ী ঠাণ্ডা, আরামপ্রদ ও নিরাপদ।
পল্লীগ্রামে বসতবাড়ী সাধারণত টিন, ছন, বাঁশ, কাঠ প্রভৃতি দ্বারা তৈরী হয়। এইসব বাড়ীতে আগুন লাগার ভয় থাকে। কোন কোন অঞ্চলে মাটি দ্বারাও বাসগৃহ নির্মাণ করা হয়। অতিবৃষ্টিতে মাটির ঘর ধ্বসিয়া যাইবার সম্ভাবনা থাকে।
প্রশ্ন- একটি আদর্শ স্বাস্থ্যপ্রদ বাড়ীতে আলো বাতাস প্রবেশের জন্য কি ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে?
উত্তর : গৃহে আলো বাতাস প্রবেশের জন্য নিম্নলিখিত ব্যবস্থাসমূহ গ্রহণ করিতে হইবে- বাসগৃহের পূর্ব ও দক্ষিণ দিক খোলা রাখিতে হইবে। তাহা হইলে গৃহে যথেষ্ট বাতাস ও সূর্যালোক প্রবেশের সুযোগ পাইবে। শহরের প্রত্যেক বাড়ীর সম্মুখে কিছু খোলা জায়গা রাখিতে হইবে। গৃহের পশ্চাৎভাগে দশ ফুট ও পার্শ্বে অন্ত তঃ চার ফুট জায়গা খালি রাখিতে হইবে। একগৃহের সহিত অন্য গৃহ সংলগ্ন করিয়া নির্মাণ করিলে গৃহগুলিতে আলো বাতাস প্রবেশ করিতে পারিবে না। প্রত্যেক কামরায় অন্ততঃ একদিকের দেওয়ালের পার্শ্বদেশ উন্মুক্ত থাকিবে। প্রত্যেক ঘরের মেঝের আয়তনের অন্ততঃ এক পঞ্চমাংশ জানালা দরজা থাকিবে। এক দেওয়ালের জানালা অপর দেওয়ালের জানালার সোজাসুজি করিতে হইবে, তাহা হইলে একদিক।
দিয়া বাতাস প্রবেশ করিয়া সমস্ত ঘরের মধ্য দিয়া প্রবাহিত হইয়া যাইতে পারিবে।
ইহা ছাড়াও প্রত্যেক দেওয়ালের উপরে ঘুলঘুলি রাখিতে হইবে।
প্রশ্ন- একটি আদর্শ স্বাস্থ্যপ্রদ বাড়ীর বুনিয়াদ ও আর্দ্রতা নিবাক স্তর কেমন হওয়া উচিৎ?
উত্তর : গৃহের বুনিয়াদ ও আর্দ্রতা নিবারক স্তর- পাকা গৃহের বুনিয়াদ সব
সময় মজবুত করিতে হইবে। বুনিয়াদও দেওয়াল ভেদ করিয়া যাহাতে আর্দ্রতা দেওয়ালে ও মেঝেতে উঠিতে না পারে সেজন্য বুনিয়াদের উপরে যেখান হইতে দেওয়াল আরম্ভ হয়, সেখানে আর্দ্রতা নিবারক স্তর তৈরী করিতে হইবে। এই স্তরের উপর দেওয়াল গাঁথিতে হইবে। আর্দ্রতা নিবারক স্তর শ্লেট, দুই ইঞ্চি পুরু এসফল্টে স্তর, দস্তার পাত, আলকাতরা মাখানো ইট, সিমেন্ট ও পাথরের নুড়ি বা ঝামার টুকরা দ্বারা তৈরী করা যায়। মেঝেতেও যাহাতে আর্দ্রতা উঠিতে না পারে সেজন্য আর্দ্রতা নিবারক স্তর করিতে হইবে।
প্রশ্ন- একটি আদর্শ স্বাস্থ্যপ্রদ বাড়ীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা আলোচনা কর।
উত্তর : একটি আদর্শ স্বাস্থ্যপ্রদ বাড়ীর পানি সরবরাহের ব্যবস্থা- গৃহে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকিতে হইবে। শহরে প্রায়ই পাইপের মাধ্যমে প্রতি গৃহে পানি সরবরাহ করিবার ব্যবস্থা আছে। এই পানি সংরক্ষণের জন্য ঢাকনাযুক্ত চৌবাচ্চা নির্মাণ করিতে হইবে। যেখানে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নাই, সেখানে গভীর নলকূপ স্থাপন করিতে হইবে। গ্রামে পানি সরবরাহের জন্য নলকূপই সর্বাপেক্ষা নিরাপদ। যেখানে নলকূপের ব্যবস্থা নাই সেখানে সংরক্ষিত কূপ অথবা পুষ্করিনীর ব্যবস্থা করিতে হইবে।
প্রশ্ন- একটি আদর্শ স্বাস্থ্যপ্রদ বাড়ীর পায়খানা ও গোসলখানা কেমন হওয়া উচিৎ?
উত্তর : একটি স্বাস্থ্যপ্রদ বাড়ীর পায়খানা ও গোসল খানা- শহরে যদি সুড়ঙ্গপথে মলমূত্র দূরীকরণের ব্যবস্থা থাকে, তাহা হইলে শয়ন কক্ষের সাথে পায়খানা তৈরী করা যায়। মেথর খাটা পায়খানা সর্বদা শয়নগৃহ ও রান্নাঘর হইতে দূরে হইতে হইবে এবং মলমূত্র দূরীকরণের সুব্যবস্থা করিতে হইবে। গ্রামে বসতবাটীর সাথে সেপটিক ট্যাংক পায়খানা তৈরী করা সর্বাপেক্ষা ভাল ব্যবস্থা। ইহা সম্ভব না হইলে বোরহোল বা কৃয়া বা গর্ত পায়খানা করিতে হইবে। এই পায়খানাগুলি শয়নকক্ষ হইতে অন্ততঃ পঁচিশ ফুট এবং কূপ বা পুকুর হইতে পঞ্চাশ ফুট দূরে হইতে হইবে। পায়খানা, প্রস্রাবখানা ও গোসলখানার সহিত অবশ্যই নর্দমার ব্যবস্থা রাখিতে হইবে।
প্রশ্ন- একটি আদর্শ স্বাস্থ্যপ্রদ বাড়ীর ব্যবহৃত পানি ও আবর্জনা দূরীকরণের ব্যবস্থাপনা লিখ।
উত্তর : একটি আদর্শ স্বাস্থ্যপ্রদ বাড়ীর ব্যবহৃত পানি ও আবর্জনা দূরীকরণের
ব্যবস্থাপনা- গৃহ হইতে যাহাতে রান্না ঘরের তরল আবর্জনা, বৃষ্টির পানি, গোসলখানায় ব্যবহৃত পানি সহজে নিষ্কাশিত হইতে পারে তাহার সুবন্দোবস্ত করিতে হইবে। শহরের বাড়ীতে পাকা নর্দমা করিয়া রাস্তার নর্দমার সহিত সংযুক্ত করিয়া দিতে হইবে। নর্দমার পানি যাহাতে আটকাইয়া নোংরা পরিবেশ সৃষ্টি করিতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখিতে হইবে। গ্রামাঞ্চলে নর্দমার পানি জমিতে প্রবাহিত করিবার ব্যবস্থা করা যায়। শহরাঞ্চলে শুষ্ক ও আর্দ্র আবর্জনা দূরীকরণের ব্যবস্থা আছে। পল্লীগ্রামে গৃহস্থরা নিজ প্রচেষ্টায় আবর্জনা দূরীকরণের ব্যবস্থা করিবেন।
প্রশ্ন- পল্লী গ্রামে স্বাস্থ্যসম্মত বাসগৃহ নির্মাণ করিতে কি কি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখিতে হইবে?
বা, পল্লী অঞ্চলে স্বাস্থ্যকর বাসগৃহ নির্মাণ পদ্ধতি আলোচনা কর।
উত্তর : পল্লীগ্রামে গৃহ নির্মাণ করিতে হইলে নিম্নলিখিত কয়েকটি বিষয়ের প্রতি
দৃষ্টি দিতে হইবে। যথা-
i) বসতবাড়ী যেন চতুষ্পার্শ্বের জমি হইতে একটু উঁচু ও চারিদিকে ঈষৎ ক্রম ঢালু হয় যাহাতে বৃষ্টির পানি কোথাও না জমিয়া গড়াইয়া যাইতে পারে।
ii) জলাভূমি, গর্ত বা পুকুর ভরাট করা জমি, এঁটেল মাটিযুক্ত পলি পড়া জমি, বন্যা হয় এমন নদী তীর বা পাহাড়ের পাদদেশে বসতবাড়ী করা উচিত নয়।
iii) যে জমির অভ্যন্তরে ভূগর্ভস্থ পানি অন্ততঃ ১০ ফুট নীচে আছে, গৃহ নির্মাণের জন্য সেরূপ স্থান নির্বাচন করা উচিত।
iv) বাসভূমির চতুর্দিকে খানিকটা ফাঁকা জমি থাকা দরকার। তাহা না থাকিলে দক্ষিণ ও পূর্বদিকে খানিকটা স্থান মুক্ত রাখা উচিত।
v) ধান, আখ বা পাট ক্ষেতের কাছে গৃহ নির্মাণ করিতে নাই।
vi) কলকারখানা, ভাগাড়, কসাইখানা, শ্মশান, গোরস্থান প্রভৃতি হইতে 'বাসভূমি দূরে থাকা প্রয়োজন।
vii) কাঠের ঘর, মাটির ঘর বা বেড়া দেওয়া ঘর যে কোন ঘরই হোক না কেন তার দেওয়াল যেন অন্ততঃ ১২ ফুট উঁচু হয়। বাড়ীতে একটা ছোটখাট উঠান রাখা উচিত।
viii) রান্না ঘর, খাওয়ার ঘর ও ভাঁড়ার ঘর হইতে শয়ন কক্ষগুলিতে স্বতন্ত্র রাখা উচিত। গোয়ালঘর, আস্তাবল ও মলমূত্র ত্যাগের জায়গাগুলি বাসগৃহ হইতে দূরে থাকা বাঞ্চনীয়। প্রত্যেক বড় শয়নকক্ষে যেন অন্ততঃ তিনজোড়া এবং ছোট শয়নকক্ষে দুইজোড়া জানালা ও একজোড়া দরজা ঋজু করিয়া বসানো থাকে।
ix) পল্লী গৃহের অনতি দূরে একটা উত্তম জলাশয় অথবা নলকূপ আছে কিনা এবং প্রতিবেশী হিসাবে একজন ভাল চিকিৎসক ও জ্ঞানী ব্যক্তি আছেন কিনা তাহা দেখা দরকার।
প্রশ্ন- মেন্টাল হাইজিন বা মানসিক স্বাস্থ্য বিজ্ঞান কাহাকে বলে?
উত্তর: মেন্টাল হাইজিন বা মানসিক স্বাস্থ্য বিজ্ঞান- স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের যে শাখায় মানসিক স্বাস্থ্য সংরক্ষণ এবং উহার উন্নতি সাধনের কলাকৌশল সম্বন্ধে আলোচনা করা হয় তাহাকে মেন্টাল হাইজিন বলে।
প্রশ্ন- মানসিক স্বাস্থ্যের লক্ষণ কি?
উত্তর: মানসিক স্বাস্থ্যের লক্ষণ- মানসিক স্বাস্থ্যের লক্ষণ হইল মনের প্রশান্তি, আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা, শৃংখলাবোধ, ধৈর্য্য, অল্পে তুষ্টি, কৃতজ্ঞতা, দায়িত্ববোধ প্রভৃতি।
প্রশ্ন- মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ কি?
উত্তর : মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ- যে ব্যক্তি মানসিক ভাবে অসুস্থ সে বিভিন্ন ধরণের মানসিক রোগ লক্ষণ প্রকাশ করে। নিম্নে মানসিক অসুস্থতার লক্ষণসমূহ উল্লেখ করা হইল। যথা-
i) সর্বদা উৎকণ্ঠিত থাকা ও দুশ্চিন্তা করা।
ii) অহেতুক ভীত ও শংকিত থাকা।
iii) অহেতুক অসুখী থাকা ও দুশ্চিন্তা করা।
iv) সামান্য ব্যাপারে অত্যধিক ভীতিগ্রস্ত হওয়া এবং ঘাবড়াইয়া যাওয়া।
v) কোন অজ্ঞাত কারণে মনোযোগে অপারগতা।
vi) নিয়মিতভাবে নিদ্রা না হওয়া।
vii) অতি সহজে মেজাজ বিগড়াইয়া যাওয়া।
viii) মনের ভাবের পরিবর্তনশীলতা।
ix) সব সময় রূঢ় আচরণ।
x) লোকজনের সাথে মেলামেশায় অনীহা।
xi) সকল বিষয়েই হতাশা ও নৈরাশ্য, কোন কাজে উৎসাহ না থাকা।
xii) নিজের সন্তান সন্ততিদের প্রতি উদাসীনতা।
xiii) অহেতুক ভয় ও দুশ্চিন্তায় ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া ও মলত্যাগ করা।
xiv) দৈহিক কোন কারণ ছাড়া একাধিক স্থানে ব্যথা বেদনার উপস্থিতি।
প্রশ্ন- মানসিক রোগের কারণসমূহ কি কি?
বা, মনোবিকারের কারণসমূহ কি কি?
উত্তর : মানসিক রোগের কারণসমূহ- মানসিক রোগ বা মনোবিকারের জন্য কোন একটি বিশেষ কারণকে দায়ী করা যায় না। ইহার একাধিক কারণ রহিয়াছে। নিম্নে ইহাদের বর্ণনা দেওয়া হইল।
ⅰ) শারীরিক কারণ : সকল মনোবিকারের একটি শারীরিক ভিত্তি আছে একথা বলা যায় না। তবে কিছু কিছু মানসিক রোগের দৈহিক কারণ মস্তিষ্কে আংশিক ক্ষয় ক্ষতির রূপ গ্রহণ করে। মস্তিষ্কে আঘাত বা রাসায়নিক পরিবর্তনের জন্য মস্তিষ্কের ক্রিয়া ব্যাঘাত প্রাপ্ত হওয়ায় মনোবিকার ঘটিতে পারে। ইহা ছাড়া শারিরীক ব্যাধির লক্ষণগুলি ক্রমশঃ বিলীন হইয়া অর্থাৎ শারীরিক ব্যাধি হইতে ক্রমে ক্রমে মানসিক ব্যাধি উৎপন্ন হয়।
ii) বংশগত কারণ : মানসিক বৃত্তির স্বল্পতা এবং কতকগুলি মানসিক ব্যাধি যেমন- উন্মত্ততা বংশগত বলিয়া মনে করা হয়। বস্তুতঃ বংশগত ভাবে এইরূপ মানসিক বিকৃতির উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুত হইয়া থাকে বটে, কিন্তু উপযুক্ত পরিবেশ না পাইলে শুধুমাত্র বংশগত দোষের জন্য মানসিক বিকার ঘটে না। সাধারণতঃ আমরা যে সকল মানসিক বিকার লক্ষ্য করি যেমন- হিষ্টিরিয়া, বাতিকগ্রস্ততা, দুশ্চিন্তাগ্রস্ততা প্রভৃতি রোগের ক্ষেত্রে বংশগত প্রভাব শুধুমাত্র প্রবণতা সৃষ্টি করিতে পারে, কিন্তু অনুকূল পরিবেশ না পাইলে মনোবিকার ঘটে না।
iii) মানসিক কারণ: মানসিক ব্যাধি সৃষ্টিতে রোগীর মন স্বাভাবিক ভাবে কাজ করে না, অর্থাৎ মনের বিভিন্ন ক্রিয়ার মধ্যে স্বাভাবিক সমন্বয়ের অভাব ঘটে। মানসিক রোগ সৃষ্টিতে যে সকল সামাজিক ও পরিবেশগত কারণসমূহ গুরুত্বপূর্ণ সেগুলি হইল- হতাশা, ব্যর্থ প্রেম, উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, অসুখী বিবাহ, দারিদ্রতা, নিষ্ঠুরতা, নিরাপত্তার অভাব, অবহেলা প্রভৃতি। এই মাজিক পরিবেশ পরিস্থিতিই ব্যক্তির মনোভাব নির্ধারণ করে।
iv) মনস্তাত্বিক কারণ ও মনোসমীক্ষার মাধ্যমে মনের তিনটি স্তরের সন্ধান মিলে। যথা-
(ক) কেন্দ্রীয় অন্তস্থল: ইহাকে জৈবিক মন বলে। জীবন্ত দেহে ইহার অস্তিত্ব মিলে। জৈবিক ও ভাবাবেগ সম্পর্কিত নিরাপত্তার জন্য ইহার প্রয়োজন।
(খ) অহংঃ নিজ ও পরিবেশ সম্বন্ধে চেতনাবোধকেই অহং বলে।
(গ) অতি অহং : ইহাকে বিবেক বলে। শৈশবে পিতামাতা এবং পরবর্তী পর্যায়ে শিক্ষক, বইপত্র এবং অন্যান্য উৎসজাত তথ্য হইতে সমাজে ভাল মন্দ জ্ঞানের সমষ্টি হইতেই ইহার উৎপত্তি। মনের এই তিনটি স্তরের মধ্যে অহরহ দ্বন্দ চলিতেছে এবং এই দ্বন্দ হইতেই মানসিক পীড়ার উৎপত্তি।
v) সোরা মায়াজম : যাবতীয় চির অচির রোগের কারণ হইল সোরা। সোরা দোষ মানবের মনকে প্রথমে কলুষিত করে এবং মানসিক বিকৃতি সৃষ্টি করে।
প্রশ্ন- বিভিন্ন প্রকার মানকি বিশৃংখলার বিবরণ দাও।.
বা, মানসিক বিশৃংখলার প্রকার ভেদ লিখ।
উত্তর : মানসিক বিশৃংখলার প্রকারভেদ- মানসিক বিশৃংখলা প্রধানতঃ ৪
প্রকারের। যথা-
i) গুরুতর মনোবিকার বা সাইকোসিস : সাধারণতঃ উন্মত্ততাই এই শ্রেণীর ব্যাধির প্রধান লক্ষণ। ইহাতে সম্পূর্ণ মনটাই আক্রান্ত হয়। রোগী ক্রমশঃ বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান হারাইয়া ফেলে। কোন কোন সাইকোটিক রোগী খুব উগ্র হইয়া পড়ে আবার কেহ কেহ ক্রমশঃ নিজের মধ্যে তন্ময় হইয়া পড়ে। এইরূপ অবস্থা হইলে যত শীঘ্র রোগীকে মানসিক হাসপাতালে পাঠানো যায় ততই ভাল।
ii) বুদ্ধি বৃত্তির স্বল্পতা : এই প্রকার মানসিক বিকৃতি প্রকৃত পক্ষে বুদ্ধিবৃত্তির ত্রুটির জন্য হয়। স্বাভাবিক বুদ্ধি অপেক্ষা যাহাদের বুদ্ধি কম, তাহাদের মানসিক বুদ্ধি অল্প বয়সেই থামিয়া যায়। মানসিক বৃত্তির স্বল্পতার সর্বনিম্ন ক্রম হইতেছে নির্বোধ। ইহা হইতে উন্নত ক্রম হইতেছে স্বল্প বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি। ইহাদের অপেক্ষা একটু উচ্চক্রমের বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি হইল দুর্বল বুদ্ধি সম্পন্ন।
iii) সামান্য প্রকারের মানসিক ব্যাধি : সামান্য প্রকারের মানসিক ব্যাধি প্রকৃতপক্ষে নিজের অবস্থার সহিত মনের সঠিক সমন্বয় সাধনের ব্যর্থতার জন্য হইয়া থাকে। সমাজে বহু লোক আছেন যাহারা অবস্থার সহিত খাপ খাওয়াইতে পারে না। ইহাদের মধ্যে যাহাদের রোগ জটিল আকারের তাহাদের মধ্যে কিছু অদ্ভুত লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং লক্ষণ হিসাবে রোগের বিভিন্ন নামকরণ করা হইয়াছে। যেমন- হিষ্টিরিয়া, বাতিকগ্রস্ততা, স্নায়বিক উন্মত্ততা ইত্যাদি। সামান্য প্রকারের মানসিক পীড়াগ্রস্ত ব্যক্তি বুঝিতে পারে যে তাহার পীড়া মনের, তাই সে সব সময় স্বাভাবিক হইতে চেষ্টা করে। এইরূপ রোগীর মনের বা ব্যক্তিত্বের সবখানি আক্রান্ত হয় না, কেবলমাত্র কিছু অংশ তাহার চেতন মনের নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলিয়া যায়। রোগ জটিল হইলে মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। মৃদু প্রকারের বিশৃংখলার ক্ষেত্রে অপরের সহানুভূতি পাইলে রোগী সুস্থ হয়।
iv) অপরাধ প্রবণতা : অপরাধ প্রবণতা এক ধরণের মানসিক বিকার। মনোবিজ্ঞানীদের মতে অপরাধ প্রবণতা ইচ্ছাকৃত বা সুচিন্তিত নয়। এইরূপ ব্যক্তির। ইতিহাস অনুসন্ধান করিলে হয়ত দেখা যাইবে যে, কোন দুঃসহ সামাজিক চাপ বা পেখনের প্রতিক্রিয়া হিসাবে তাহার মধ্যে অপরাধ করার প্রবৃত্তি জন্মলাভ করিয়াছে। অনেক সময় অপরাধ প্রবণতা অন্তর্ধন্য হইতে রক্ষা পাইবার উপায় হিসাবেও আসিয়া পড়ে। একই অবস্থার চাপে কাহারো মধ্যে নিউরোসিস দেখা দেয় আবার কেহ সমাজের প্রতি বৈরী ভাবাপন্ন হইয়া পড়ে। এইরূপক্ষেত্রে ভাল ব্যবহার বা সহানুভূতি দ্বারা তাহাদিগকে সুস্থ ও স্বাভাবিক করা যায়।
প্রশ্ন- মানসিক বিকৃতি প্রতিরোধের উপায়সমূহ কি কি?
উত্তর: মানসিক বিকৃতি প্রতিরোধের উপায়সমূহ- প্রতিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ করিলে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যার অনেকখানি সমাধান হয়। সুশিক্ষা, ভালভাবে শিশুর লালন পালন করা, গৃহের উন্নত পরিবেশ, উন্নত সামাজিক পরিবেশ ও দৃষ্টিভঙ্গী প্রভৃতির উপর ইহা নির্ভর করে। প্রতিরোধক ব্যবস্থা হিসাবে নিম্নলিখিত উপায়গুলি অবলম্বন করিতে হইবে।
(১) শিশুর মনের উপর বংশগত প্রভাব কমবেশী থাকে। তাই শিশুর জন্মের পূর্বে মাতাপিতার শরীর ও মনের সুস্থতা রক্ষা করিতে হইবে।
(২) মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করিতে হইলে শারিরীক সুস্থতার প্রয়োজন। তাই মন হইতে দুশ্চিন্তা দূর করিতে হইবে। মানসিক অশান্তি সৃষ্টিকারী ঘটনাসমূহ পরিহার করিতে হইবে। অতিরিক্ত দৈহিক ও মানসিক পরিশ্রম ত্যাগ করিতে হইবে এবং শরীর ও মনকে বিশ্রাম দিতে হইবে।
(৩) শৈশবকাল হইতে, শিশুর মনে দ্বন্দ সৃষ্টি করিতে পারে এইরূপ ঘটনাবলী এড়াইয়া চলিতে হইবে। মানসিক স্থিতিশীলতার জন্য শিশুর পক্ষে অপরের নিকট হইতে স্নেহ যত্ন পাওয়া দরকার। শিশুদের প্রতি বড়দের আচরণ-কোমল ও সুসম্মত হইতে হইবে। শিশুকে সাহায্য, সহানুভূতি ও উৎসাহ দ্বারা শিক্ষা প্রদান করিতে হইবে। সমালোচনা বা বিদ্রুপ করা তাহার পক্ষে ক্ষতিকর।
(৪) শিশুর স্বাভাবিক ক্ষমতার উপর অতিরিক্ত লেখাপড়ার চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়। ইহা তাহাদের পক্ষে ক্ষতিকর।
(৫) শিশুদের প্রকৃতিতে অবাঞ্ছিত কোন বৈশিষ্ট্য দেখিতে পাইলে তাহা ভালদিকে পরিচালিত করিয়া দিতে হইবে।
(৬) যৌন চেতনা সম্পর্কে আমাদের পুরাতন দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন করিতে হইবে। শিশু সুলভ কোন যৌন চেতনা দেখিলে তাহা সাংঘাতিক অপরাধ বলিয়া মনে করিলে উহা শিশুর মানসিক বৃদ্ধির পক্ষে ক্ষতিকর হইবে।
(৭) পূর্ণ বয়স্ক কোন মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তির পূর্ব ইতিহাস অনুসন্ধান করিলে, তাহার শিশু কালের কোন স্নায়বিক গোলযোগের সন্ধান পাওয়া যাইবে। অতএব শৈশবকালে মাতাপিতা, শিক্ষক, চিকিৎসক শিশুর প্রতি লক্ষ্য রাখিলে ভবিষ্যতের অনেক দুর্ভোগ হইতে রক্ষা পাওয়া যাইবে।
প্রশ্ন- অর্গাননের আলোকে মানসিক ব্যাধি সম্বন্ধে ডাঃ হ্যানিম্যানের অভিমত কি?
উত্তর : অর্গাননের আলোকে মানসিক ব্যাধি সম্বন্ধে ডাঃ হ্যানিম্যানের অভিমত- হ্যানিম্যানের অর্গাননের ২১৪-২১৯ সূত্রের আলোকে বলা যায় মানসিক ও চিত্তের যে সব ব্যাধি রহিয়াছে সেসব ব্যাধির শারীরিক ও বাহ্যিক লক্ষণ ও থাকে। চিকিৎসাক্ষেত্রে মানসিক লক্ষণকে সাধারণ রোগের অবস্থা হইতে পৃথক কিছু বলিয়া ধরা হয় না। বিকার গ্রস্ত, উন্মাদনা প্রভৃতিকে মানসিক রোগ বলিয়া ধরা হইলেও উহার শারিরীক লক্ষণসমূহ প্রথমে দেখা না গেলেও তাহারা যে কোন প্রকার স্কুল বিকৃতির সহিত সম্পর্কবিহীন তাহা মনে করা ভুল। প্রায়ই ভীতিজনক শারিরীক রোগসমূহ রূপান্তরিত হইয়া তাহাদের উৎপত্তি হয়। স্কুল দৈহিক বিকৃতিপূর্ণ লক্ষণসমূহ সূক্ষ্ম মনোময় কোষে পরিণত হয়। এখানে দৈহিক বিকৃতিসমূহ দ্রুত প্রচ্ছন্নতায় উপনীত হয় ও মানসিক বিকৃতি এবং চিত্তের উদ্বিগ্নতা প্রধান লক্ষণ হিসাবে দেখা দেয়। আর এক প্রকার মানসিক রোগ সোরাবীজ হইতে উদ্ভুত এবং তাহা একতরফা লক্ষণরূপে প্রকাশ পায় ও অন্যান্য লক্ষণ সুপ্ত থাকে।
প্রশ্ন- মানসিক রোগ চিকিৎসা ক্ষেত্রে কি কি বিশেষ ব্যবস্থা ও যত্ন. অবলম্বন করিতে হয়?
উত্তর: মানসিক রোগ চিকিৎসার ব্যবস্থাপনা- মানাসক রোগ চিকিৎসা ক্ষেত্রে রোগীর প্রতি অত্যন্ত সতর্কতা ও নিষ্ঠা সহকারে যখন যেমন দরকার তখন তেমন ভাব প্রদর্শন করা উচিত। যেমন রোগী যদি ক্ষিপ্ত হয় তাহা হইলে চিকিৎসক ও সেবাকারীগণ বিরক্তহীন সাহস, ধৈর্য্য ও ধীর সংকল্প প্রদর্শন করিতে হইবে। রোগীর করুন অনুযোগের প্রতি আত্মীয় পরিজন ও চিকিৎসকের দৃষ্টিভংগীমায় নির্বাক সহানুভূতি প্রদর্শন করিতে হইবে। বিরক্তিকর ও ঘৃণা ব্যবহারে এবং ঐরূপ কথাবার্তায় সম্পূর্ণ অবহেলা প্রদর্শন করা উচিত। রোগীকে তাহার আচরণের জন্য তিরষ্কার না করিয়া শুধুমাত্র চতুষ্পার্শ্বের দ্রব্যাদি নষ্ট ও ক্ষতি নিবারণ করার চেষ্টা করা উচিত। সবকিছু এমনভাবে সাজাইয়া রাখিতে হইবে যাহাতে দৈহিক শাস্তি বা উৎপীড়ন জাতীয় কিছু করার দরকার না হয়। আর কোন কোন ক্ষেত্রে ঔষধ প্রয়োগে যেখানে বল প্রয়োগ সঙ্গত হইতে পারে সেখানে নির্বাচিত ঔষধের স্বল্পমাত্রা পানির সাথে দেওয়া যাইতে পারে, ফলে বল প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না।
প্রশ্ন- মানসিক ব্যাধির চিকিৎসা পদ্ধতি বর্ণনা কর।
উত্তর: মানসিক ব্যাধির চিকিৎসা পদ্ধতি- হ্যানিম্যানের অর্গাননের ২২৮-২৩০ নং সূত্রে হ্যানিমান মানসিক ব্যাধির চিকিৎসা সম্বন্ধে যে উপদেশ প্রদান করেন তাহার সার সংক্ষেপ নিম্নে প্রদত্ত হইল। যথা-
১। মানসিক পীড়াগ্রস্ত রোগীর আচার আচরণ যদি অশোভন হয় এবং অশ্লীল কথা বার্তা বলে তবে তাহার প্রতি অমনোযোগ ও অবহেলা প্রদর্শন করিতে হইবে।
২। সকল প্রকার উত্তেজনার প্রভাব হইতে রোগীকে দূরে রাখিতে হইবে।
৩। রোগীর প্রচণ্ড উন্মত্ততায় রোগীর সম্মুখে শান্তভাব, ভয়শূন্যতা ও দৃঢ়তার গরিচয় দিতে হইবে।
৪। বেশী বাচালতার প্রলাপে সামান্য মনোযোগ প্রদর্শন করিয়া নীরবে শুনিয়া যাইতে হইবে।
৫। রোগী ধ্বংসাত্মক আচরণ করিলে বা ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি দেখিলে জিনিষপত্র হাতের নাগালের বাহিরে রাখিতে হইবে যাহাতে রোগী কোন অনিষ্ট করিতে না পারে। তাহার খারাপ আচরণের জন্য তিরষ্কার করা সঙ্গত হইবে না।
৬। রোগীর সাথে প্রতিবাদ করা, পুনঃ তর্ক যুক্তি উত্থাপন করা, কঠিন ভাবে সংশোধনের চেষ্টা করা, গালাগালি করা প্রভৃতি আচরণ করা ঠিক নয়। কারণ এইগুলি রোগীর পক্ষে ক্ষতিকর।
হাইজিন এন্ড পাবলিক হেলথ ৬৯
৭। কোন ঔষধ সেবন করানোর জন্য সামান্য বল প্রয়োগ সমর্থিত হইলেও হোমিওপ্যাথিক ঔষধ সেবন করানোর জন্য তাহার দরকার হয় না।
৮। এমনভাবে রোগীর চিকিৎসা পরিচালিত করিতে হইবে যাহাতে রোগীর প্রতি কোন প্রকার উৎপীড়ন বা দৈহিক শান্তি প্রয়োগ করা না হয়।
৯। চিকিৎসক ও পরিচর্যাকারীদেরকে এমনভাব দেখাইতে হইবে যাহাতে রোগীর কাণ্ডজ্ঞান আছে এইরূপ ভাব প্রকাশ করে।
শুধুমাত্র ঔষধের ব্যবস্থা করিলেই চিকিৎসকের কাজ শেষ হইবে না, রোগীর মনুষ্যত্ব ফিরাইয়া আনিতে বন্ধুর মত কর্তব্য পালন করিতে হইবে। যে সকল মানসিক পীড়া মানসিক কারণ হইতে উদ্ভুত তাহা যদি দীর্ঘ দিনের না হয় তবে মনস্তাত্ত্বিক আচরণ দ্বারা তাহা প্রশমিত করা যায়। রোগীর যাহাতে আত্মপ্রত্যয় ফিরিয়া আসে, জীবনের গ্লানিময় প্রভাব কাটাইয়া যাহাতে জীবনকে উন্নতির পথে পুনর্গঠিত করিতে পারে। পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে খাপ খাওয়াইয়া যাহাতে নিজের জীবন যাত্রা স্বাভাবিক ও সহজ করিতে পারে সেই ব্যবস্থা করিতে হইবে। সোরার সাময়িক বিস্ফোরণ বশতঃ যে সব মনোরোগ সৃষ্টি হইয়াছে সেগুলির ক্ষেত্রে একিউট ঔষধ প্রথমে প্রয়োগ করিয়া লক্ষণের তীব্রতাকে দমন করার পর সোরা দোষ নাশক ঔষধ প্রয়োগ করিয়া চিকিৎসা করিতে হইবে।'
প্রশ্ন- স্কুল হেলথ বা বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের স্বাস্থ্য বলিতে কি বুঝ?
উত্তর: স্কুল হেল্থ বা বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের স্বাস্থ্য- স্কুল হেল্থ মানব সভ্যতার অগ্রগতি, ব্যক্তিগত জীবনের উন্নতি, সমাজের কল্যাণ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের শিক্ষা ব্যবস্থার মানের উপর নির্ভরশীল। বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ্য না রাখিলে, ভবিষ্যতের নাগরিকদের ছাত্র জীবনে যদি দূষিত বায়ু, খারাপ খাদ্য, স্বল্প আলো এবং সুস্থ অসুস্থ একত্রে মিশ্রণের মধ্যে রাখা যায়, তাহা হইলে দৈহিক ও মানসিক উন্নতি আশা করা যায় না। তাই ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিক স্বাস্থ্য ও মানসিক বৃত্তির উন্নতি কল্পে শিক্ষাদানের ব্যবস্থার সাথে সাথে বিদ্যালয়ের পরিবেশও স্বাস্থ্যের অনুকুল হওয়া প্রয়োজন। তাই প্রত্যেক বিদ্যালয়ে ছাত্র ছাত্রীদের দেহ মন ও সুস্থ ও সবল হইয়া গড়িয়া উঠার জন্য একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্মাণ করা দরকার। ইহাই সামগ্রিকভাবে স্কুল হেল্থ।
প্রশ্ন- স্কুল হেল্থ বা বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের স্বাস্থ্য সম্বন্ধে আলোচনা কর।
বা, বিদ্যালয় গৃহে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনীয় শর্তসমূহ বর্ণনা কর।
উত্তর : বিদ্যালয় গৃহে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনীয় শর্তসমূহ-বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের সুস্থ ও সবল ভাবে গড়িয়া তোলার জন্য নিম্নলিখিত ব্যবস্থাগুলি গ্রহণ করিতে হইবে। যথা-
i) বিদ্যালয় গৃহ ঃ বিদ্যালয় গৃহ স্বাস্থ্যকর স্থানে নির্মাণ করিতে হইবে। এমন স্থানে হইবে যাহাতে ছাত্র ছাত্রীরা সহজে যাতায়াত করিতে পারে। উঁচু স্থানে গৃহ নির্মাণ করা উচিত যাহাতে পার্শ্বস্থ ভূমির পানি বর্ষাকালে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে না আসিতে পারে। বিদ্যালয় গৃহের চতুর্দিকে খোলা থাকিবে যাহাতে প্রচুর পরিমাণে আলো বাতাস প্রবেশ করিতে পারে। শ্রেণী কক্ষগুলি আলাদা আলাদা থাকিবে। বিদ্যালয় মেঝে যাহাতে স্যাঁত সেঁতে না থাকে। বিদ্যালয়ের সংলগ্ন খেলার মাঠ থাকিবে।
ii) পায়খানা ও প্রস্রাবখানা: ছাত্র ছাত্রীদের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনমত যথেষ্ট প্রস্রাবখানা ও পায়খানা নির্মাণ করিতে হইবে। যেখানে পানি দ্বারা ময়লা দূরীকরণের ব্যবস্থা আছে, সেখানে পায়খানা ও প্রস্রাবখানা বিদ্যালয়ের সংলগ্ন পৃথক স্থানে করা যায়। কিন্তু শ্রেণী কক্ষের খুব নিকটে না হওয়ায়ই বাঞ্ছনীয়। সেরূপ -ব্যবস্থা না থাকিলে বিদ্যালয় গৃহ হইতে প্রস্রাবখানা ও পায়খানা অন্ততঃ ৫০ ফুট দূরে থাকা উচিত। প্রতি ১০০ জন ছাত্র ছাত্রীর জন্য ৪/৫টি করিয়া পৃথক পৃথক প্রস্রাবখানা ও পায়খানা থাকা উচিত। শৌচকর্মের জন্য প্রয়োজনীয় পানির ব্যবস্থা রাখিতে হইবে।
iii) পানি সরবরাহ : বিদ্যালয়ে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকিতে হইবে। শহরে পাইপযোগে, অন্যত্র নলকূপের ব্যবস্থা থাকা উচিত। প্রত্যেক নলকূপ হইতে পানি সংগ্রহ করিয়া ড্রামে ভর্তি করিতে হইবে। ড্রামে টিপকল থাকা বাঞ্ছনীয়, নলকুপের পানি আর্সেনিক পরীক্ষা করিয়া আর্সেনিক মুক্ত হওয়া করা উচিত।
iv) আসবাবপত্র : বিদ্যালয়ের আসবাবপত্রের মধ্যে ছাত্র ছাত্রীদের বসিবার বেঞ্চ ও ডেস্ক প্রধান। এইগুলি এমনভাবে তৈরী করিতে হইবে যেন বিভিন্ন বয়সের ছাত্র ছাত্রী স্বাভাবিকভাবে ও সহজে উহাতে বসিয়া লেখাপড়া করিতে পারে। ডেক্সগুলির উচ্চতা ছাত্রদের বয়স অনুপাতে হইবে। ছাত্র ছত্রীদের বসার ভংগীর প্রতি শিক্ষকদের লক্ষ্য রাখিতে হইবে। বেশী নত ও কুঁজো হইয়া বসিলে দৃষ্টিশক্তির ক্ষীণতা জন্মে, বক্ষদেশ সংকুচিত হয় ও শ্বাস প্রশ্বাসে বিঘ্ন হয়। শিক্ষকদের জন্য বসিবার চেয়ার ও টেবিল ছাড়া প্রতিটি শ্রেণী কক্ষে একটি ব্লাকবোর্ড থাকিবে।
v) আহার বা টিফিনের ব্যবস্থা : প্রতিটি বিদ্যালয়ে ছাত্র ছাত্রীদের জন্য মধ্যাহ্ন ভোজনের ব্যবস্থা থাকা উচিত। মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য ব্যবস্থা করিতে না পারিলে সামান্য দুধ, ফলমূল, হালকা খাবারের ব্যবস্থা উচিত।
vi) খেলার মাঠ : শিক্ষাদানের সাথে সাথে ছাত্র ছাত্রীদের দেহমন যাহাতে সুস্থ ও সবল থাকে সেজন্য খেলাধূলার জন্য খেলার মাঠ ও খেলার সরঞ্জাম দরকার। খেলার মাঠ স্কুলের সংলগ্ন থাকাই ভাল। বিদ্যালয়ে একটি ব্যায়মাগারও থাকা উচিত।
vii) ছাত্রাবাস : যে সকল ছাত্র ছাত্রীর পক্ষে বাড়ী হইতে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করা সম্ভব নয় তাহাদের জন্য হোস্টেলের ব্যবস্থা থাকা উচিত। হোস্টেল যথাসম্ভব বিদ্যালয়ের সন্নিকটে হইবে। প্রত্যেক ছাত্র ছাত্রীর জন্য পৃথক পৃথক কামরা, প্রতি কামরায় আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকা উচিত। পানি সরবরাহ ও মলমূত্র নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকিবে। প্রত্যেক হোস্টেলের জন্য খেলার মাঠ, ব্যায়ামাগার চিকিৎসক ও একজন স্বাস্থ্য পরিদর্শক থাকিবেন।
viii) ছাত্র ছাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা: প্রত্যেক ছাত্র ছাত্রী বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই তাহাদের স্বাস্থ্যের পূর্ণ পরীক্ষা হওয়া দরকার। সংক্রামক ব্যাধির প্রতিষেধক ব্যবস্থাও করিতে হইবে। স্বাস্থ্য পরীক্ষার উদ্দেশ্য হইল শিশুকালে সতর্কতা অবলম্বন করিলে ভবিষ্যতে অনেক শারীরিক অসুস্থতা এবং ব্যাধি হইতে নিস্কৃতি পাওয়া যায়।
প্রশ্ন- বিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য পরিদর্শকের কর্তব্যসমূহ কি কি?
উত্তর : বিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য পরিদর্শকের কর্তব্যসমূহ- বিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য পরিদর্শকের কর্তব্যসমূহ নিম্নরূপ হইতে হইবে। যথা-
ক) প্রত্যেক ছাত্র ছাত্রীর বয়স, উচ্চতা, ওজন, দৈহিক পুষ্টি, মানসিক অবস্থা, চক্ষু, দাঁত, কান, গলকক্ষ, হৃদপিণ্ড, ফুসফুস ও অন্যান্য তন্ত্রগুলি পরীক্ষা করিয়া একটি কার্ডে লিখিয়া রাখিতে হইবে।
হাইজিন এন্ড পাবলিক হেলথ ৭২
খ) সংক্রামক ব্যাধি হইতে ছাত্র ছাত্রীদের রক্ষার ব্যবস্থা করিতে হইবে।
গ) কোন ছাত্রের শারীরিক ত্রুটি থাকিলে তাহার প্রতিবিধানের ব্যবস্থা করিতে হইবে।
ঘ) বিদ্যালয়ে আলো, বাতাস, পানি সরবরাহ ও প্রস্রাব পায়খানা প্রভৃতির স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ব্যবস্থার নিশ্চয়তা সম্পর্কে তত্বাবধান করিতে হইবে।
ঙ) বিদ্যালয় ও গৃহের সাথে সংযোগ সাধন করা। কাহারো শরীরে কোন রোগ আছে জানিতে পারিলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
চ) বিদ্যালয়ে ও গৃহে স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপন সম্পর্কে শিক্ষা দান করা।
প্রশ্ন- আমাদের দেশের বিদ্যালয়সমূহের স্বাস্থ্য সমস্যাগুলি কি কি?
উত্তর : আমাদের দেশের বিদ্যালয়সমূহের স্বাস্থ্য সমস্যাসমূহ- আমাদের দেশে বিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য সমস্যাগুলি নিম্নে বর্ণিত হইল। যথা-
১। বিদ্যালয় গৃহগুলি অধিকাংশই হাট বাজার, কারখানা, স্টেশন বা যানবাহন চলাচলের রাস্তার নিকট অবস্থিত।'
২। অনেক বিদ্যালয় গৃহ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে স্থাপিত। অনেক বিদ্যালয় অঙ্গণে বর্ষায় পানি উঠে।
৩। বহু বিদ্যালয়ে উন্মুক্ত আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নাই।
৪। অনেক বিদ্যালয় গৃহে ছাত্র ছাত্রীদের জন্য পায়খানা ও প্রস্রাবখানার ব্যবস্থা নাই। যদিও থাকে তাহার পরিবেশ পরিস্থিতি অত্যন্ত নোংরা। পানি সরবরাহের ব্যবস্থা একেবারেই অপ্রতুল।
৫। বিদ্যালয়ে বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা নাই। পানীয় জল পরীক্ষার জন্য কোন ব্যবস্থা নাই।
৬। শ্রেণীকক্ষগুলি অধিকাংশই প্রশস্ত নয়, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নও নয়। ধারণ ক্ষমতার বেশী ছাত্র ছাত্রী এক একটি শ্রেণী কক্ষে লেখাপড়া করে।
৭। বিদ্যালয়ের আসবাবপত্রের অপ্রতুলতা লক্ষ্য করার মত। ছাত্র ছাত্রীদের বয়স অনুপাতে বসিয়া লেখা পড়া করার মত বেঞ্চ ও ডেস্কের ব্যবস্থা নাই।
৮। অনেক বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ নাই। ছাত্র ছাত্রীদের মানসিক বিকাশের কোন সুযোগ নাই।
৯। ছাত্র ছাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার কোন ব্যবস্থা নাই। বেশীর ভাগ বিদ্যালয়েই ফার্স্ট এইডের কোন ব্যবস্থা নাই। সুস্থ্য ও অসুস্থ ছাত্র ছাত্রী নির্ধারণের কোন ব্যবস্থা নাই।
১০। দেহ-মন বিকাশের জন্য কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা ও অন্যান্য ব্যবস্থা নাই।
প্রশ্ন- আমাদের দেশের বিদ্যালয়সমূহের স্বাস্থ্য সমস্যাসমূহের কিভাবে সমাধান করা যায়?
উত্তর : বিদ্যালয়সমূহের স্বাস্থ্য সমস্যাসমূহ সমাধানের উপায়সমূহ- আমাদের দেশে বিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য সমস্যাগুলির সমাধান নিম্নে বর্ণিত হইল। যথা-
১। বিদ্যালয় গৃহ হাট বাজার, কবর, শ্মশান, কল কারখানা ও যানবাহন চলাচলের রাস্তা হইতে দূরে থাকিতে হইবে।
২। স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিদ্যালয় গৃহ নির্মাণ করিতে হইবে। যাহাতে প্রচুর আলো বাতাস গৃহে পাওয়া যায়।
৩। সাধারণ মাঠ হইতে বিদ্যালয় গৃহ উঁচু স্থানে থাকিতে হইবে যাহাতে বর্ষায় প্রাঙ্গণে পানি না উঠে।
৪। পর্যাপ্ত পরিমাণে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ও প্রস্রাব খানার ব্যবস্থা থাকা উচিত। সাথে সাথে ময়লা পরিষ্কারের জন্য পর্যাপ্ত পানি সরবরাহের বা নলকুপের ব্যবস্থা করা উচিত।
৫। বিদ্যালয়ে বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা থাকিতে হইবে।
৬। প্রশস্ত শ্রেণী কক্ষ থাকিতে হইবে। শ্রেণী কক্ষে আলো বাতাস প্রবেশের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকিতে হইবে।
৭। ছাত্র ছাত্রীদের বসার জন্য বয়স অনুপাতে ডেস্ক ও বেঞ্চ থাকিতে হইবে। ছাত্র ছাত্রীরা যাহাতে শিরদাঁড়া সোজা করিয়া বসিতে পারে সেভাবে বেঞ্চ ও ডেস্ক তৈরী করা বাঞ্ছনীয়।
৮। ছাত্র ছাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকিতে হইবে। প্রত্যেক বিদ্যালয়ে একজন স্বাস্থ্য পরিদর্শক থাকিবেন। সংক্রামক রোগের হাত হইতে ছাত্র ছাত্রীদেরকে রক্ষার ব্যবস্থা করিতে হইবে। সুস্থ ও অসুস্থ শিশু চিহ্নিত করণের ব্যবস্থা থাকিতে হইবে।
৯। দেহ-মন বিকাশের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকিতে হইবে।
প্রশ- শ্রম স্বাস্থ্য বিজ্ঞান কাহাকে বলে?
উত্তর: শ্রম স্বাস্থ্য বিজ্ঞান- শ্রমিকেরা শিল্পের উৎপাদনের মূল চাবিকাঠি। 'তাই শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার প্রতি যথেষ্ট লক্ষ্য রাখা উচিত। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের যে, শাখায় শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় আলোচনা করা হয় তাহাকে শ্রম স্বাস্থ্য বিজ্ঞান বলে।
প্রশ্ন- শ্রমিকদের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য যে সকল নিয়ম পালন করা দরকার সে সম্পর্কে আলোচনা কর।
উত্তর: শ্রমিকদের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য পালনীয় কর্তব্যসমূহ- শ্রমিকদের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য যে সকল নিয়ম পালন করা প্রয়োজন তাহা নিম্নে বর্ণিত হইল। যথা-
(১) কর্ম সময় নির্ধারণ ১ শ্রমিকদের কর্ম সময় নির্ধারণ করিয়া দেওয়া উচিত। শিশু শ্রমিক ও নারী শ্রমিকদের কর্ম সময় হ্রাস করিতে হইবে। ১৮ বৎসরের নিচের শ্রমিকদের উত্তেজক ধুলাবালি ও বিষাক্ত বাষ্পের মধ্যে কাজে নিয়োগ করা উচিত নয়।
(২) আলো বাতাসের ব্যবস্থা : শ্রমিকগণ যেখানে কাজ করে তথায় পর্যাপ্ত পরিমাণে আলো ও মুক্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করিতে হইবে। কম আলোতে কাজ করিলে দৃষ্টি শক্তির ক্ষতি হইতে পারে। শিল্প এলাকার বায়ু সর্বদা দূষিত থাকে। তাই কৃত্রিম উপায়ে বায়ু সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা উচিত। বিশুদ্ধ বায়ু সঞ্চালনের ব্যবস্থা না থাকিলে শ্রমিকগণ অবসাদগ্রস্ত হইবে এবং দৈহিক ও মানসিক ক্ষমতার হ্রাস ঘটিবে।
(৩) স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পরিদর্শন: প্রত্যেক সপ্তাহে, পক্ষে বা মাসে একবার করিয়া শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ও উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করিতে হইবে।
হাইজিন এন্ড পাবলিক হেলথ ৭৫
(৪) পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা : কারখানার অঙ্গন সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখিতে হইবে। কাজের সময় শ্রমিকদের দেহে ময়লা জমে তাই প্রতিদিন কাজ করার পর অবশ্যই দেহ পরিষ্কার করার ব্যবস্থা রাখা উচিত।
(৫) বিপদের প্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান: কারখানায় কোথায় কোথায় কি ধরণের বিপদের সম্ভবনা আছে তাহা শ্রমিকদের অবগত করাইতে হইবে। অন্যথায় বিপদের সম্মুখীন হইতে হইবে।
(৬) স্যাঁতসেঁতে স্থানে কাজ না করা: স্যাঁতসেঁতে ও আর্দ্র স্থানে কাজ করা উচিত নয়। কারণ এইরূপ অবস্থায় দেহের প্রয়োজনীয় তাপ রক্ষিত হয় না। ফলে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যহনি ঘটে এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। তাই কাজের স্থান সর্বদা শুষ্ক থাকিতে হইবে।

0 মন্তব্যসমূহ