স্বাস্থ্য রক্ষার বিজ্ঞান - দ্বিতীয় বর্ষ - পঞ্চম অধ্যায়

হাইজিন এন্ড পাবলিক হেলথ

পঞ্চম অধ্যায়
স্বাস্থ্য রক্ষার বিজ্ঞান
Sanitation



প্রশ্ন- পরিবেশ কাহাকে বলে? পরিবেশের উপাদানসমূহ কি কি?
উত্তরঃ পরিবেশ- আমরা ভূমিষ্ট হওয়ার পর হইতে সব সময় জীবিত থাকিবার জন্য যে সব বাহিরের দ্রব্য ও অবস্থার দ্বারা পরিবেষ্টিত হইয়া পুষ্টি ও বর্ধিত হইয়া থাকি তাহাকে পরিবেশ বলে।
পরিবেশের উপাদানঃ পরিবেশের উপাদানসমুহ হইল- রৌদ্র, বায়ু, পানি, খাদ্য, ভূমি, বাসগৃহ, আচ্ছাদন এবং নানাবিধ উদ্ভিদ ও প্রাণী।


প্রশ্ন- স্বাস্থ্য রক্ষার বিজ্ঞান বা স্যানিটেশান বলিতে কি বুঝায়?
উত্তর: স্বাস্থ্য রক্ষার বিজ্ঞান বা স্যানিটেশান- স্যানিটেশান হইল মানুষের জীবন যাপনের ধারা তাই ইহার প্রকৃত উৎস মানুষের অন্তর। জ্ঞানই ইহাকে পোষণ করে এবং পারস্পরিক কর্তব্য এবং মানবিক সংযোগের আদর্শরূপেই ইহা গড়িয়া উঠে। বসবাস ও জীবনযাপনের এই আকাংখিত মনের প্রকাশ ঘটে পরিচ্ছন্ন বাসগৃহ, সুন্দর গৃহ পরিবেশ এবং পরিচ্ছন্ন লোক সমাজের মধ্য দিয়া।


প্রশ্ন- স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ কাহাকে বলে?
উত্তর : স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ- আমাদের জীবন যাত্রার নির্বাহের জন্য দূষিত পরিবেশ বা আবেষ্টনীকে নির্দোষ অবস্থায় পরিণত করিয়া যেখানে প্রচুর মুক্ত বিশুদ্ধ বায়ু, পর্যাপ্ত সূর্যালোক, বিশুদ্ধ পানীয় জলের সরবরাহ, পুষ্টিকর খাদ্য, স্বাস্থ্যকর বসত বাড়ী, রোগ নিবারণের বিষয়ে সুব্যবস্থা আছে, সেখানকার পরিবেশকে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বলে।


প্রশ্ন- স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ রচনায় প্রয়োজনীয় মৌলিক বিষয়গুলি কি কি?
উত্তর : স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ রচনায় প্রয়োজনীয় মৌলিক বিষয়সমূহ-স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ রচনায় প্রয়োজনীয় মৌলিক বিষয়গুলি নিয়ে উল্লেখ করা হইল। যথা-
i) বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি সরবরাহ।
ii) বসতবাড়ী ও বাসগৃহ নির্মাণে স্বাস্থ্যের পরিবেশ রক্ষা করা।
ii) স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে আবর্জনা অপসারণ।
iv) স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে মূলমূত্র অপসারণ।
v) খাদ্য সংরক্ষণ, রন্ধন ও পরিবেশনে বিজ্ঞানসম্মত উপায় অবলম্বন।
vi) বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ।
vii) রোগবাহক জীবজন্তু ও কীট পতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ।
viii) পেশা সম্পর্কিত বিপত্তি নিয়ন্ত্রণ ও কল কারখানা বিপদমুক্ত করা।


প্রশ্ন- স্বাস্থ্যের উপর পরিবেশের প্রভাব বর্ণনা কর।
উত্তর: স্বাস্থ্যের উপর পরিবেশের প্রভাব- আমাদের দেহ, মন ও চরিত্র গঠনের উপর তথা স্বাস্থ্যের উপর পরিবেশের প্রভাব সব চাইতে বেশী। সূর্যকিরণ, পানি, বায়ু, ভূমি, খাদ্য, উদ্ভিদ ও জীবজগৎ, বাসগৃহ, প্রতিবেশীও বন্ধু বান্ধব প্রভৃতি আমাদের পরিবেশের উপাদান। জীবন ধারণের জন্য বায়ু অপরিহার্য। আবার দূষিত বায়ু গ্রহণ মৃত্যুর কারণও হইতে পারে। কয়লা খনি, ইটের ভাটি, কল কারখানা প্রভৃতি হইতে গ্যাস, ধুলাবালি, ধোঁয়া, পাটের আঁশ, তুলা প্রভৃতি বায়ুর সহিত মিশিয়া বায়ুকে দূষিত করে। আবার রোগীর হাঁচি, কাশি ও মলমূত্রের রোগ জীবাণু বায়ুর সহিত মিশিয়া বায়ুকে দূষিত করে। এই দূষিত বায়ু গ্রহণ করিলে সুস্থ ব্যক্তি নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হয়। কাজেই ইহা স্বাস্থ্যের পরিপন্থি। পানি মানুষের জীবন ধারনের জন্য অপরিহার্য। আবার দূষিত পানি মৃত্যুরও কারণ হয়। দূষিত পানি পান করিলে বিভিন্ন সংক্রামক রোগে মানুষ আক্রান্ত হয় ফলে স্বাস্থ্যহানি ঘটে। ভূমি মানুষের আবাসস্থল। ভূমির পরিবেশ স্বাস্থ্য সম্মত না হইলে নানা রোগের কারন হইয়া দাঁড়ায়। সুস্বাস্থ্যের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যের একান্ত প্রয়োজন। পুষ্টিকর খাদ্য না হইলে মানুষের স্বাস্থ্যহানী ঘটে। উদ্ভিদ জগৎ হইতে অধিকাংশ ঔষধ তৈরী হয়। আমরা অসুস্থ হইলে আরোগ্যের জন্য ঔষধ একান্তই প্রয়োজন। প্রতিবেশী ও বন্ধু বান্ধব সৎ ও সহানভূতিশীল না হইলে মানুষ নিকৃষ্ট জীবন যাপন করে ফলে স্বাস্থ্যহানি ঘটে। তাই দেখা যায় যে মানব স্বাস্থ্যের উপর পরিবেশের প্রভাব সবচেয়ে বেশী।
 

প্রশ্ন-  স্বাস্থ্যের পক্ষে সূর্যের অতি বেগুনী রশ্মির উপকারিতা বা প্রভাব বর্ণনা কর।
উত্তর : স্বাস্থ্যের পক্ষে সূর্যের অতি বেগুনী রশ্মির উপকারিতা বা প্রভাব- সূর্যের অতি বেগুনী রশ্মি আমাদের দেহে বহিঃত্বকে অতি সহজেই প্রবেশ করিতে পারে এবং একটি রাসায়ণিক পরিবর্তন সংঘটিত করে। ফলে অভ্যন্তরস্থ আর্গোস্টেরল জাতীয় এক পদার্থ ভিটামিন ডি তে পরিণত হয়। এই ভিটামিন ডি ই শরীরের অস্থি গঠনের ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস যথোচিত সুদৃঢ় করিতে প্রধান সহায়ক। এই কারণে রিকেট নামক ব্যাধি এবং অস্থি অপুষ্টি নামক আর একটি ব্যাধি ইহার দ্বারা প্রতিরোধ ও নিরাময় হয়।
বেগুনী রশ্মি যক্ষ্মা প্রভৃতি ব্যাধি প্রতিরোধ এবং আরোগ্য করে। শরীরের বৃদ্ধি ও কর্মশক্তি বাড়ায়।
ইহার দ্বারা ত্বকের ক্ষতস্থান ও পুরাতন চর্মরোগ আশু আরোগ্য হয়।
গেঁটে বাত, পেশী বাতে ইহার দ্বারা উপকার হয় এবং দেহের অবসন্নতা, স্নায়ু দুর্বলতা অল্প মাত্রাতে সারিয়া যায়।


প্রশ্ন- ভূমি বা মৃত্তিকা হইতে কি কি রোগের সংক্রমণ ঘটে?
উত্তর : ভূমি বা মৃত্তিকা হইতে সংক্রামিত রোগ- ভূমির জীবানুজনিত রোগ দুইভাবে হইয়া থাকে। যথা-
১) প্রত্যক্ষভাবে,
২) পরোক্ষভাবে।
১) প্রত্যক্ষভাবে ভূমির জীবাণুজনিত রোগ :
i) কৃমি- যেমন গোলকৃমি, ফিতাকৃমি, হুককৃমি, সূতাকৃমি, প্রভৃতি মানুষের বা অন্য প্রাণীর মলমূত্রের সাথে বাহির হয় এবং মাটিকে দূষিত করিয়া তাহা হইতে মনুষ্য শরীরে প্রবেশ করে এবং নানারোগ উৎপন্ন করে।.
ii) ধনুষ্টংকার, অ্যানথ্রাক্স প্রভৃতি রোগের জীবাণু গরু, ঘোড়া, কুকুর প্রভৃতি প্রাণীর মল ও চামড়ায় থাকায় ইহারা ভূমির সংস্পর্শে আসে এবং মানবদেহে নানা রোগের সৃষ্টি করে।
২) পরোক্ষভাবে ভূমির জীবাণুজাত রোগ :
i) কলেরা, টাইফয়েড, আমাশয়, উদরাময়, যক্ষ্মা প্রভৃতির জীবাণু রোগীর মলমূত্র ও কফের সহিত নির্গত হইয়া মাটি দূষিত করে এবং সেগুলি মাছি, কীট পতঙ্গাদি, ধুলি ও বায়ু প্রবাহ দ্বারা বাহিত হইয়া মানুষের খাদ্যদ্রব্য দূষিত করে এবং ঐ সব রোগ বিস্তার লাভ করে।
ii) ভূমি বেশী ঠাণ্ডা ও আর্দ্র হইলে রোগের প্রভাব বাড়িয়া যায়। ফলে সর্দি, কাশি, ক্ষয়কাশ, বাত প্রভৃতি রোগের আবির্ভাব ঘটে।


প্রশ্ন- বায়ু কি? ইহা কি কি উপাদানে গঠিত?
উত্তর : বায়ু- বায়ু একপ্রকার মিশ্র বাষ্পীয় পদার্থ। কতকগুলি বাষ্পের ভৌতিক সংমিশ্রণে ইহার উৎপত্তি।
বায়ুর উপাদান- আয়তন হিসাবে বায়ুতে বিভিন্ন উপাদানগুলির শতকরা হার নিম্নে দেওয়া হইল।
অক্সিজেন-                                                ২০.৬০ ভাগ
নাইট্রোজেন-                                             ৭৭.১৬
জলীয় বাষ্প-                                                ১.৪০
আর্গন, হিলিয়াম, নিয়ন প্রভৃতি গ্যাস-        ০.৮০
কার্বন ডাই অক্সাইড                                    ০.০৪
ইহা ছাড়াও বায়ুতে সামান্য মাত্রায় ধুলিকণা, ওজোন, সোডিয়াম ক্লোরাইড, এমোনিয়া (কারখানা অঞ্চলে), হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, হাইড্রোজেন সালফাইড, সালফার ডাই অক্সাইড, প্রভৃতি পদার্থ থাকে।


প্রশ্ন- স্বাস্থ্যের সঙ্গে আবহাওয়ার সম্পর্ক কি?
উত্তর : স্বাস্থ্যের সঙ্গে আবহাওয়ার সম্পর্ক- কোনও নির্দিষ্ট স্থানে বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা, শীতলতা, আর্দ্রতা, শুষ্ক অবস্থা প্রভৃতি প্রকারের সাময়িক পরিবর্তনশীল অবস্থার নাম আবহাওয়া এবং সারা বৎসরের বা গড় আবহাওয়ার নাম জলবায়ু।
আবহাওয়ার সাথে আমাদের একটা ঘনিষ্ট সম্পর্ক আছে। আবহাওয়া আরামপ্রদ হইলে আমাদের দেহ ও মন সুস্থ থাকে। কিন্তু দেশ, কাল ও পাত্রভেদে আবহাওয়ার পার্থক্য ঘটিতে পারে।
গ্রীষ্মকালের উষ্ণ ও শুষ্ক বায়ু শীতকালের বায়ুর চাইতে স্বাস্থ্যপ্রদ হয় না। উষ্ণ বায়ুতে শ্বাসকার্য ধীরে হয়। পরিপাক শক্তি হ্রাস পায়, কর্মশক্তির হ্রাস ঘটে, রক্তাল্পতা দেখা দেয়। শতকরা ৪০ হইতে ৬০ ভাগ জলীয় বাষ্প বায়ুতে থাকিলে স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল আরামপ্রদ। ইহার অধিক হইলে আবহাওয়া আরামপ্রদ হয় না।
আবহাওয়া তথা বায়ুমণ্ডল দূষিত হইলে বিভিন্ন রোগে আক্রমণ করে। পচা নর্দমা, কারখানার দূষিত গ্যাস বায়ুর সাথে মিশিলে ক্ষুধামন্দা, গা বমি ভাব, উদরাময়, ফ্যারিনজাইটিস, টনসিলাইটিস, কলেরা, টাইফয়েড প্রভৃতি রোগ সৃষ্টি হয়। তাই স্বাস্থ্যের সঙ্গে আবহাওয়ার একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে।


প্রশ্ন- নিঃশ্বাস ও প্রশ্বাস বায়ুর উপাদানের ভারতম্য কিরূপ?
উত্তর : নিঃশ্বাস ও প্রশ্বাস বায়ুর উপাদানের তারতম্য- বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস বায়ু ও প্রশ্বাস বায়ুর উপাদানের তারতম্য নিম্নের তালিকায় দেখানো হইল। যথা-
বায়ুর উপাদান
প্রশ্বাস বায়ুতে
নিঃশ্বাস বায়ুতে
অক্সিজেন গ্যাস            ২১% প্রায়            ১৭% প্রায়
নাইট্রোজেন গ্যাস        ৭৮%                    ৭৮%"
কার্ব ডাই অক্সাইড        ০.০৪%                ৮,৮০%"
জলীয় বাষ্প                সামান্য                    বেশী
উত্তাপ                        সামান্য                    বেশী
বীজাণু ও জৈব পদার্থ    সামান্য                বেশী


প্রশ্ন- বিশুদ্ধ বায়ু ও দূষিত বায়ু কাহাকে বলে?
উত্তর : বিশুদ্ধ বায়ু- যে বায়ুতে পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, জলীয় বাষ্প প্রভৃতি বিদ্যমান থাকে, কিন্তু ধোঁয়া, ধুলিকণা, কোন প্রকার দূষিত গ্যাস বা অন্য কোন দূষিত পদার্থ থাকে না তাহাকে বিশুদ্ধ বায়ু বলে।
দূষিত বায়ু- বায়ুর উপাদানসমূহের বিশেষ মানের আধিক্য হইলে অর্থাৎ উষ্ণতা ৬১০ ফারেনহাইটের বেশী, আর্দ্রতা ৭৪% এর বেশী এবং কার্বন ডাই অক্সাইড ০.০৬% এর বেশী হইলে বায়ুকে অশুদ্ধ বায়ু বলা হয়। বায়ুতে নানা প্রকার গ্যাস, ধুলি ও বীজানুর আধিক্য থাকিলে তাহাকে দূষিত বায়ু বলে।


প্রশ্ন- কি কি কারণে বায়ু দূষিত হয়?
উত্তর : বায়ু দূষিত হওয়ার কারণসমূহ- নিম্নলিখিত কারণে বায়ু দূষিত হইয়া থাকে। যথা-
i) জীবজন্তুর শ্বাসপ্রশ্বাসের দ্বারা বায়ু দুষিত হয়। নিঃশ্বাসের সঙ্গে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস ত্যাগ হয় এবং বায়ুতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়া যয়। কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়িয়া গেলে বায়ু দূষিত হয়।
ii) দহন ক্রিয়া দ্বারা বায়ুতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়া যায় ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন হয়। ইহা ছাড়া দহন ক্রিয়ার ফলে কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস তৈরী হয় যাহার ফলে বায়ু দূষিত হয়।
iii) ধুলাবালি, ধোঁয়া, কালির ঝুল, পাটের আঁশ, জীবাণু এবং অন্যান্য জৈব ও অজৈব পদার্থ দ্বারা বায়ু দূষিত হয়।
iv) মলমূত্র ও পচনশীল বস্তু ইত্যাদির দ্বারাও বায়ু দূষিত' হয়।
v) মানুষের মলমূত্র, থুথু, কফ ইত্যাদিতে নানা প্রকার রোগজীবাণু থাকে। বায়ুর সাথে মিশিয়া গিয়া ইহা বায়ুকে দূষিত করে।
করে। vi) জীবজন্তুর গলিত মৃতদেহ হইতে যে গ্যাস বাহির হয় তাহা বায়ুকে দূষিত
vii) পচাপুকুর জলাভূমি, খোলা নর্দমা, পায়খানা ইত্যাদি হইতে যে সকল দূষিত গ্যাস বাহির হয়, বায়ুর সহিত মিশিয়া ইহা বায়ুকে দূষিত করে।
viii) শিল্পাঞ্চলের কলকারখানা হইতে নানা প্রকার জৈব ও অজৈব পদার্থের রেণু ও নানা প্রকার গ্যাসে উত্থিত হইয়া বায়ু দূষিত করে।
ix) ইট পোড়ার ভাটি, চামড়ার কারখানা, চুনের ভাটি, শ্মশান প্রভৃতি হইতে যে সকল গ্যাস উৎপন্ন হয় তাহা বায়ুকে দূষিত করে।


প্রশ্ন- কিভাবে বায়ু বিশুদ্ধ হয়? বায়ু বিশুদ্ধ হওয়ার প্রাকৃতিক পদ্ধতি কি? 
উত্তর : বায়ু বিশুদ্ধ হওয়ার পদ্ধতি- দুইটি পদ্ধতিতে বায়ু বিশুদ্ধ হয়। যথা-
(ক) প্রাকৃতিক পদ্ধতি,
(খ) কৃত্রিম পদ্ধতি।
(ক) প্রাকৃতিক উপায়ে বায়ু বিশুদ্ধ হওয়ার পদ্ধতি-
i) সূর্যকিরণ দ্বারা : বায়ুতে বহু রোগ জীবাণু ভাসিয়া বেড়ায়। সূর্যকিরণের প্রভাবে বায়ুতে ভাসমান ঐ সকল রোগ জীবাণু মরিয়া যায়। রাস্তায়, গৃহে, প্রান্তরে
বহু ময়লা ও আবর্জনা থাকে। সূর্যকিরণের ফলে বহু গলিত আবর্জনা ও ময়লা শুকাইয়া জীবাণু শূণ্য এবং দুর্গন্ধ মুক্ত হয়।
ii) ঝড় দ্বারা : ঝড়ের গতি বেগ সাধারণ বায়ু অপেক্ষা অনেক বেশী। ঝড়ের ফলে বাতাসে ভাসমান নানা প্রকার ধুলাবালি, দূষিত গ্যাস, আবর্জনা কণা প্রভৃতি বিদূরীত হয়।
iii) বৃষ্টি ও বজ্রপাত দ্বারা ঃ বাতাসে ভাসমান ধূলা, পাট আঁশ, তুলা ও বিষাক্ত গ্যাসসমূহ বৃষ্টির ফলে ধুইয়া মাটিতে পড়ে। আবার বজ্রপাতের ফলে বায়ুতে উপকারী ওজোন (OZONE) গ্যাসের সৃষ্টি হয় ফলে বায়ু বিশুদ্ধ হয়।
iv) গাছপালা দ্বারা ৪ দিনের বেলায় উদ্ভিদেরা পাতার মধ্যে অবস্থিত
- ক্লোরোফিল নামক এক প্রকার সবুজ কণার দ্বারা বায়ু হইতে অ্যামোনিয়া ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস গ্রহণ করে। আর অক্সিজেন গ্যাস বায়ুতে ছড়াইয়া দেয়। এইভাবে প্রাকৃতিক উপায়ে বায়ু বিশুদ্ধ হয়।


প্রশ্ন- বায়ু বিশুদ্ধ হওয়ার কৃত্রিক পদ্ধতি কি?
উত্তর : কৃত্রিম উপায়ে বিশুদ্ধ হওয়ার পদ্ধতি
ⅰ) বাড়ীর চতুষ্পার্শে অপ্রয়োজনীয় ঝোপঝাড়, আগাছা, জংগল, বড় বড় গাছ কাটিয়া দিলে বিশুদ্ধ বায়ু পাওয়া যায়।
ii) ঘরের ও বাইরের নর্দমায় মাঝে মাঝে কলিচুন ও ব্লিচিং পাউডার দিয়া কাঁটা দিয়া ঘষিয়া পরিষ্কার করিলে দূষিত বায়ু বিদূরীত হয়।
iii) এলাকায় সংক্রামক রোগ দেখা দিলে ঘরে ও ঘরের বাইরে ধুপ দিয়া জ্বালিয়া দিলে উহার ধোঁয়ায় বায়ু বিশুদ্ধ হয়।
iv) ঘরে যথাসম্ভব বড় বড় দরজা জানালা রাখিলে, পাকা বাড়ীর ঘরের উপরের দিকে ছাদের নিচে বায়ু চলাচলের জন্য ঘুলঘুলি রাখিলে, গরমের দিনে ঘরের দরজা জানালা খুলিয়া বিজলী পাখা চালাইলে বায়ু কিছুটা বিশোধিত হয়।


প্রশ্ন- বায়ু সঞ্চালন (Ventilation) বলিতে কি বুঝ? বাহ্যিক বায়ু সঞ্চালন কি?
উত্তর: বায়ু সঞ্চালন- কোন আবদ্ধ স্থানের আর্দ্র, উষ্ণ এবং গতিহীন বায়ুর অপসারণ এবং তৎস্থলে শুষ্ক, শীতল ও গতিশীল বায়ু আনয়নকে বা চলাচলকে বায়ু সঞ্চালন বলে। বাহ্যিক বায়ু সঞ্চালন- যখন বাড়ীর চতুর্দিকের বা রাস্তা ঘাটের বায়ু পরিশুদ্ধ করিয়া সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা হয় তাহাকে বাহ্যিক বায়ু সঞ্চালন বলে। শহরের রাস্তাঘাট চওড়া ও সোজা করিয়া এবং স্থানে স্থানে পার্ক তৈরী করিয়া, নর্দমা, ভাষ্টবিন, রাস্তা ঝাঁট দেওয়ার ব্যবস্থা করিয়া আবর্জনা বিদূরীত করিয়া, শহর হইতে শিল্পাঞ্চল দূরবর্তী স্থানে স্থাপন করিয়া, বাড়ী ঘর লাগালাগি না করিয়া প্রতি দুই বাড়ীর মধ্যে উন্মুক্ত জায়গা রাখিয়া বাহ্যিক বায়ু সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা যায়।


প্রশ্ন- আভ্যন্তরীণ বায়ু সঞ্চালন কি?
উত্তর : আভ্যন্তরীণ বায়ু সঞ্চালন- বসতবাড়ী, খনি, কারখানা প্রভৃতির মধ্যে বিশুদ্ধ বায়ু সঞ্চালনকে আভ্যন্তরীণ বায়ু সঞ্চালন বলে। ঘরের উচ্চতা বৃদ্ধি করিয়া ছাদের নিচে মুলামুলি ব্যবস্থা করিয়া, দেওয়ালের নিচে ছোট ছোট ছিদ্রপথ রাখিয়া, ঘরের দরজা জানালাগুলি বিপরীত দেয়ালে মুখামুখিভাবে স্থাপন করিয়া, ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখিয়া, ঘরে বৈদ্যুতিক পাখা চালাইয়া, ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত কাপড় চোপড় ঘরে না রাখিয়া এবং যে সকল স্থানে বহুলোক একত্রিত হয় বা স্বাভাবিক উপায়ে বায়ু সঞ্চালনের ব্যবস্থা সম্ভবপর হয় না সে সকল স্থানে কৃত্রিম উপায়ে বায়ু সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা যায়।

প্রশ্ন-  কিভাবে বায়ু সঞ্চালন করা যাইতে পারে? বায়ু সঞ্চালনের প্রাকৃতিক উপায় বা ব্যবস্থা লিখ।
উত্তর: বায়ু সঞ্চালনের পদ্ধতি- দুই প্রকারে বায়ু সঞ্চালন করা যাইতে পারে।
যথা-
(ক) প্রাকৃতিক উপায়ে এবং
(খ) কৃত্রিম উপায়ে।
প্রাকৃতিক উপায়ে বায়ু সঞ্চালনের ব্যবস্থা- শহরের রাস্তাঘাট চওড়া ও সোজা করিয়া এবং স্থানে স্থানে পার্ক স্থাপন করিয়া অবাধে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা যায়। রাস্তাঘাট সর্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখিতে হইবে এবং নিয়মিতভাবে প্রত্যহ পানি দ্বারা ধোয়া ও রাস্তার ধুলাবালি পরিষ্কার করা উচিত। শহরের বাড়ীগুলি ফাঁকা ফাঁকা জায়গায় তৈরী করা উচিত। বাড়ীগুলির মাঝে ছোট ছোট বাগান বা খোলা জমি থাকা দরকার। শহরের মধ্যে বসবাসের আশে পাশে কোন কল কারখানা স্থাপন করা উচিত নয়। শহর হইতে দূরবর্তী জায়গায় এগুলি স্থাপন করা উচিত।
বসত ঘরের উচ্চতা কমপক্ষে ১০ ফুট এবং ছাদের নিচে ঘুলঘুলির ব্যবস্থা করা উচিত। দেয়ালের নিচে ছোট ছোট ছিদ্র থাকা উচিত। ইহাতে উপরের উষ্ণ বায়ু উপরের ঘুলঘুলি দিয়া বাহির হইয়া যাইবে এবং বাহিরের নির্মল বিশুদ্ধ বায়ু নিচের ছিদ্র দিয়া ঘরে প্রবেশ করিবে। ঘরের দরজা জানালাগুলি বিপরীত দেওয়ালে মুখামুখিভাবে স্থাপন করিতে হইবে যাহাতে বায়ু এক পাশের জানালা দিয়া প্রবেশ করিয়া অন্য জালানা দিয়া সোজা বাহির হইয়া যাইতে পারে। এইভাবে প্রাকৃতিক উপায়ে বায়ু সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা যায়।


প্রশ্ন-  বায়ু সঞ্চালনের কৃত্রিম উপায় বা ব্যবস্থা লিখ।
উত্তর: কৃত্রিম উপায়ে বায়ু সঞ্চালন- যে সকল স্থানে বহু লোক একত্রিত হয় বা স্বাভাবিকভাবে বায়ু সঞ্চালনের ব্যবস্থা সম্ভবপর হয় না সে সকল স্থানে কৃত্রিম উপায়ে বায়ু সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা হয়। যেমন সিনেমা হল, কয়লার খনি, উড়োজাহাজ, নিচতলার সভাকক্ষ প্রভৃতি স্থানে। কৃত্রিম উপায়ে বায়ু সঞ্চালন নিম্নলিখিত তিনটি পদ্ধতিতে করা হয়।
i) প্রপালশন পদ্ধতি (Propultion System): এই পদ্ধতিতে ঘরের একদিকের দেওয়ালের ছিদ্রপথে একপ্রকার বৈদ্যুতিক পাখা বসানো থাকে। এই পাখার সাহায্যে বাহির হইতে বিশুদ্ধ বায়ু টানিয়া ঘরের ভিতরে প্রবেশ করানো হয়। ফলে ঘরের দূষিত বায়ু অন্যদিকের দেওয়ালের ছিদ্রপথে বাহির হইয়া যায়।
ii) এক্সটাকশান পদ্ধতি (Extraction System) : ইহার অর্থ হইল ভিতরের বায়ু বাহির করিয়া দেওয়া এই পদ্ধতিতে ঘরের একদিকের দেওয়ালের ছিদ্র পথে এক প্রকার বৈদ্যুতিক পাখা বসানো থাকে। এই পাখার সাহায্যে ঘরের ভিতরের দূষিত বায়ু টানিয়া বাহির করিয়া দেওয়া হয়। ফলে অন্যদিকের দেওয়ালের ছিদ্রপথে বাহিরের বিশুদ্ধ বায়ু ঘরে প্রবেশ করে।
iii) প্রপালশান ও এক্সট্রাকশান পদ্ধতির সমন্বয় (Combind System) & এই পদ্ধতিতে ঘরের দুই পাশের দেওয়ালের ছিদ্রপথে দুই রকম বৈদ্যুতিক পাখা বসানো হয়। একদিক দিয়া ঘরের ভিতরের দূষিত বাতাস টানিয়া বাহির করা হয় এবং অন্য দিক দিয়া বাহিরের বিশুদ্ধ বাতাস টানিয়া ঘরের ভিতরে প্রবেশ করানো হয়।


প্রশ্ন- বায়ু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা বায়ু শীততাপ নিয়ন্ত্রণ করণ (Air Conditioning) বলিতে কি বুঝ?
উত্তর : বায়ু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা বায়ু শীততাপ নিয়ন্ত্রণ করণ- এক প্রকার যন্ত্র দ্বারা এই ব্যবস্থা করা হয়। যে প্রক্রিয়ার সাহায্যে ঘরের ভিতরের বায়ুকে যে কোন ঋতুতে স্বাস্থ্যের পক্ষে আরামদায়ক করা হয় তাহাকে বায়ু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বলে। যন্ত্রের সাহায্যে ঘরের বায়ুকে বিশুদ্ধ করা, ইহার তাপ ইচ্ছামত কম বেশী করা এবং প্রয়োজন অনুসারে বায়ুর সঞ্চালন গতিকে নিয়ন্ত্রণ করা যাইতে পারে। ইহা প্রপালশান ও এক্সট্রাকশান পদ্ধতি দ্বয়ের সমন্বয়ে গঠিত প্রক্রিয়া। বায়ু শীততাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থিয়েটার, বড় বড় অট্টালিকা, অফিস, জাহাজ, ট্রেন, সিনেমা হল, বাস প্রভৃতিতে প্রচলিত আছে।


প্রশ্ন- বায়ু সঞ্চালনের প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব আলোচনা কর।
উত্তর : বায়ু সঞ্চালনের প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব- বায়ু সঞ্চালনের প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব অপরিসীম। নিম্নে ইহার গুরুত্ব আলোচনা করা হইল। যথা-
i) বায়ু সঞ্চালন না থাকিলে রোগীর হাঁচি, কাশি ও মলমূত্রের রোগ জীবাণু আবদ্ধ হাওয়ায় ভাসিতে থাকে। সুস্থ ব্যক্তি এই রোগ জীবাণুপূর্ণ বায়ু গ্রহণ করিলে ঐ সব রোগে আক্রান্ত হয়।
ii) বায়ু সঞ্চালন না থাকিলে কলকারখানা, কয়লার খনি, ইটের ভাটি, ঘরের উনুন প্রভৃতি হইতে নানা প্রকার গ্যাস, ধুলিকণা, পাট ও তুলার আঁশ, ময়লা আবর্জনা ও নর্দমা হইতে বিষাক্ত গ্যাস আবদ্ধ থাকিয়া বায়ু দূষিত করে। এই দূষিত বায়ু গ্রহণের ফলে নানা পীড়ার সৃষ্টি হয়।
iii) মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তুর নিঃশ্বাস বায়ুর কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও জলীয় অংশ, ঘর্ম প্রভৃতি বাষ্পাকারে বায়ুর সহিত মিশিয়া আর্দ্র ও উষ্ণ করিয়া তোলে। গতিহীন বায়ু অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর হইয়া উঠে। বায়ু সঞ্চালন না থাকিলে সূর্যতাপ ও জীবদেহের উত্তাপে বায়ু আরও গরম হইয়া উঠে। বায়ুর আর্দ্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেহের ঘর্ম বায়ু দ্বারা শোষিত হয় না, ফলে দেহের অভ্যন্তরে গরম আটকাইয়া যায়।
বায়ু সঞ্চালন না থাকিলে দেহের বর্হিভাগ উত্তপ্ত হয়; ত্বকের রক্ত প্রবাহ বেশী হয় এবং দেহের অন্যান্য যন্ত্রের রক্ত সরবরাহ কমিয়া যায়। ফলে শিরঃপীড়া বমি বমি ভাব, হাই উঠা, হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কের দুর্বলতা। ক্ষুধামান্দ্য প্রভৃতি উপসর্গের সৃষ্টি হয়।


প্রশ্ন-  শরীরের বা স্বাস্থ্যের উপর বায়ুর ক্রিয়া ও প্রভাব বর্ণনা কর।
উত্তর : শরীর বা স্বাস্থ্যের উপর বায়ুর ক্রিয়া ও প্রভাব- আমাদের জীবন ধারণের জন্য বায়ুর প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশী। যথা-
i) বাতাসের সাহায্যে আমরা ইচ্ছানুযায়ী স্থিতিশীল ও গতিশীল হইতে পারি।
ii) বাতাসের অক্সিজেন আমাদের রক্তকে পরিষ্কার করে।
iii) বাতাস আমাদের দেহকে শীতকালে উষ্ণ ও গ্রীষ্মকালে শীতল রাখিতে সাহায্য করে।
iv) বাতাস নাসিকা দিয়া দেহের ভিতরে গিয়া অক্সিজেন গ্যাস দান করে এবং আবর্জনা স্বরূপ কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস; রোগজীবাণু ও অতিরিক্ত উত্তাপ নিজের মধ্যে টানিয়া আনিয়া বাহির করিয়া দেয়।
v) বিশুদ্ধ বাতাস আমাদের দেহকে সুস্থ ও সতেজ রাখে।
vi) বাতাস খাদ্য গ্রহণে, দেহের পুষ্টি সাধনে বিশেষভাবে সহায়তা করে।
vii) বাতাসের মধ্য দিয়াই আমরা ক্ষয় কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিমোনিয়া, ডিপথেরিয়া, বসন্ত, হাম প্রভৃতি সংক্রামক রোগের জীবাণু দেহ মধ্যে গ্রহণ করি।


প্রশ্ন- বায়ু চলাচল বর্জিত ঘরে বা ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে অধিকক্ষণ থাকিলে মানুষের কি অসুবিধা ও দৈহিক ক্ষতি হয়?
উত্তর: বায়ু চলাচল বর্জিত ঘরে বা ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে অধিকক্ষণ থাকিলে মানুষের অসুবিধা ও দৈহিক ক্ষতি- যেখানে ভালভাবে বায়ু চলাচল করিতে পারে না এবং বহুলোক ঠাসাঠাসি হইয়া থাকে, ক্রমাগত শ্বাস নেওয়ার ফলে সেই স্থানে বায়ু শীঘ্র দূষিত হইয়া পড়ে। এই রকম দূষিত বায়ু প্রশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করিলে-
i) প্রথমে আলস্য বোধ হয়। ক্রমাগত হাই উঠে, মাথা ধরে বা মাথা ঝিম ঝিম করে এবং অবসাদ আসে।
হাইজিন এন্ড পাবলিক হেলথ ৯৪
ii) অধিক্ষণ দূষিত বায়ু গ্রহণ করিলে রীতিমত মাথা ঘুরিতে থাকে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, অনেক সময় বমি হয়। অবশেষে মানুষ অজ্ঞান হইয়া যায়।
iii) যাহারা বদ্ধ ঘরে ও দূষিত বায়ুর মধ্যে কিছুকাল বসবাস করে বা কাজ করে তাহাদের দেহ শুকাইয়া যায়। কাজে উৎসাহ কমিয়া 'আসে, সর্বদা আলস্য বোধ হয়। সামান্য পরিশ্রমে ক্লান্ত হইয়া পড়ে।


প্রশ্ন- বদ্ধ ঘরে আমরা অস্বস্তি বোধ করি কেন?
উত্তর : বদ্ধ ঘরে অস্বস্তি বোধ করার কারণ- বদ্ধ ঘরে আমরা দারুন অস্বস্তি বোধ করি। ইহার কারণ হইল-
i) বদ্ধঘরের উষ্ণতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়।
ii) বায়ু সঞ্চালন না থাকায় শরীরের উত্তাপে বায়ু আরও উত্তপ্ত হয়। এই উত্তপ্ত হাওয়ায় ত্বকের রক্ত প্রবাহ বেশী হয় এবং দেহের অভ্যন্তরস্থ যন্ত্রের রক্ত সরবরাহ কমিয়া যায়। ফলে শিরঃপীড়া বমি বমি ভাব, হাই উঠা, হৃদপিণ্ড ও মস্তিষ্কের দুর্বলতা, ক্ষুধামান্দ্য প্রভৃতি উপসর্গের সৃষ্টি হয় এবং আমরা অস্বস্তি বোধ করি।
iii) নিঃশ্বাস বায়ুর জলীয় বাষ্প এবং শরীরের ঘর্ম বাষ্পাকারে বায়ুর সহিত মিশিয়া বায়ুর আর্দ্রতা বাড়িয়া যায়। বায়ুর আর্দ্রতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে ঘর্মের জলীয় অংশ বায়ুতে শোষিত হইতে পারে না। সুতরাং শরীরাভ্যন্তরে গরম আটকাইয়া যায় এবং আমরা অস্বস্তি বোধ করি।


প্রশ্ন-  স্বাস্থ্যসম্মতভাবে শ্বাসক্রিয়া চালানোর জন্য কি কি নিয়ম পালন করিতে হয়?
উত্তর : স্বাস্থ্যসম্মতভাবে শ্বাসক্রিয়া চালানোর নিয়ম- স্বাস্থ্যসম্মতভাবে শ্বাসক্রিয়া চালানোর জন্য আমাদের নিম্নলিখিত নিয়মগুলি পালন করিতে হইবে। যথা-
ⅰ) শুধুমাত্র নাসিকা দিয়া ধীরে ধীরে গভীরভাবে নিঃশ্বাস গ্রহণ করিতে হইবে।
ii) যথাসম্ভব বিশুদ্ধ বাতাসে কাজকর্ম ও চলাফেরা করিতে হইবে।
iii) নিদ্রাকালে কখনও বাতি বা অন্য কোন আলো জ্বালাইয়া রাখিতে নাই যাহাতে ঘরের মধ্যে গ্যাসের সৃষ্টি হয়।
iv) নিদ্রাকালে বা জাগরণে ঘরের জানালাগুলি খোলা রাখা উচিত।
v) সমস্ত শরীর ঢাকা বা আঁটসাঁট জামা কাপড় পরিতে নাই।
vi) জামা, কাপড় ইজার প্রভৃতি সব সময় আল্গাভাবে পরা উচিত।
vii) পাটকল, তুলাকল, ধুলাবালি পূর্ণ স্থান এড়াইয়া চলা উচিত।
viii) পিঠ সোজা করিয়া দাঁড়াইতে ও বসিতে হইবে। শোওয়ার সময়ও টানভাবে শোওয়া উচিত।
ix) প্রতিদিন খোলা মাঠে সকালে ও বিকালে কিছুক্ষণের জন্য বেড়ানো উচিত।
x) জনবহুল স্থান ও গুরুভোজন সর্বদা পরিত্যাজ্য।


প্রশ্ন-  বিশুদ্ধ বায়ুর আদর্শমান কি?
উত্তর : বিশুদ্ধ বায়ুর আদর্শমান- যে বায়ুতে অক্সিজেনের পরিমাণ বেশী এবং জলীয় বাষ্প, উত্তাপ, রোগজীবাণু, ধুলি, ধোঁয়া, কার্বনিক এসিড গ্যাসের পরিমাণ অত্যন্ত কম সেই বায়ুকে বিশুদ্ধ বায়ু বলে। বায়ুতে যে পরিমাণ পর্যন্ত কার্বনিক এসিড বা কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস থাকিলে তাহা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হয় না তাহাই বায়ু বিশুদ্ধতার আদর্শমান। এই মান হইল শতকরা ০.০৬ কার্বনিক এসিড গ্যাস। এই গ্যাস বেশী হইলেই বায়ু দূষিত বলিয়া গণ্য হইবে।


প্রশ্ন-  বাসগৃহে জনপ্রতি প্রয়োজনীয় বায়ুর পরিমাণ কত?
উত্তর : বাসগৃহে জনপ্রতি প্রয়োজনীয় বায়ুর পরিমাণ- একজন পূর্ণ বয়স্ক লোক ঘন্টায় ০.৬ ঘনফুট কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস নিঃশ্বাস দ্বারা ত্যাগ করে। ৩০০০ ঘনফুট বায়ুতে এই পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস মিশিলে স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর হয় না। এইজন্য বাসগৃহে জনপ্রতি ঘন্টায় ৩০০০ ঘনফুট বায়ু সরবরাহের ব্যবস্থা থাকা উচিত।


প্রশ্ন- "বায়ুর দূষণ মৃত্যুর কারণ হইতে পারে"- আলোচনা কর।
বা, দূষিত বায়ুর অপকারিতা কি?
উত্তর: দূষিত বায়ুর অপকারিতা- বায়ু ছাড়া আমরা বাঁচিতে পারি না। আবার দূষিত বায়ু গ্রহণ মৃত্যুর কারণও হইতে পারে। অব্যবহৃত পুরাতন কূপের ভিতর বা ভূগর্ভস্থ পয়ঃপ্রণালীতে জৈব পদার্থের পচন ক্রিয়ার ফলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ সেখানে এত বেশী হইতে পারে যে, তাহাতে মৃত্যুও ঘটাইতে পারে। পুরাতন কুপে বা পয়ঃপ্রণালীতে হঠাৎ কেহ নামিলে তাহার মৃত্যু ঘটিবে।
কলকারখানা, কয়লার খনি, ইটের ভাটি, ঘরের উনুন প্রভৃতি হইতে নানা প্রকার গ্যাস, তুলা বা পাটের আঁশ, ধুলিকণা, অপরিষ্কৃত নর্দমা ও ময়লা আবর্জনা হইতে বিষাক্ত গ্যাস বায়ুর সহিত মিশিয়া বায়ু দূষিত করে। এই দূষিত বায়ু গ্রহণের ফলে নানা ব্যাধির সৃষ্টি হয়। আনার জনবহুল বদ্ধ ঘরের বাতাসও দূষিত হয়। রোগীর হাঁচি, কাশি, কথাবার্তা ও মলমূত্রে রোগ জীবাণু বায়ুর সহিত মিশিয়া বায়ু দূষিত করে। এই সকল রোগজীবাণু পূর্ণ দূষিত বায়ু গ্রহণ করিলে সুস্থ ব্যক্তি ঐ সব রোগে আক্রান্ত হয়। আবার বিষাক্ত গ্যাস বায়ুর সহিত মিশিয়া ফুসফুসে প্রবেশ করিয়াও নানা রোগের সৃষ্টি করিতে পারে। ভাই বলা হয় বায়ুর দূষণ মৃত্যুর কারণও হইতে পারে।


প্রশ্ন-  বায়ুবাহিত রোগ কাহাকে বলে? কয়েকটি বায়ুবাহিত রোগের নাম বল।
উত্তর: বায়ুবাহিত রোগ- যে সকল রোগ জীবাণু ও ভাইরাস সাধারণতঃ ধুলাবালির সহিত মিশিয়া বাতাসে উড়িয়া বেড়ায় এবং প্রায়ই প্রশ্বাসের সঙ্গে সুস্থ শরীরে প্রবেশ করে এবং নানা রোগ সৃষ্টি করে, এই সকল রোগকে বায়ু বাহিত রোগ বলে।
কয়েকটি বায়ুবাহিত রোগ- সর্দি, কাশি, হুপিং কাশি, মেনিনজাইটিস, যক্ষ্মা, হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া, ডিপথিরিয়া প্রভৃতি বায়ু বাহিত রোগ।


প্রশ্ন-  জনবহুলতার দোষসমূহ কি কি?
উত্তর : জনবহুলতার দোষসমূহ ঘর হিসাবে জনবহুলতার জন্য বা বৃহৎ আয়তন ঘরে বায়ু চলনের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকিলে বায়ুর দূষণ ঘটে। বন্ধ ঘরে বহু লোকের নিঃশ্বাস বায়ুর উষ্ণতা, আর্দ্রতা, জৈব পদার্থ, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, জীবাণুর পরিমাণ বর্ধিত হয় এবং অক্সিজেনের হ্রাস ঘটে। এই কারণে থিয়েটার, সিনেমা হল, সভাগৃহ, বক্তৃতাস্থল প্রভৃতি স্থানে বহুলোকের সমাগম ঘটিলে নিঃশ্বাস দ্বারা বায়ু দূষিত হয় এবং প্রশ্বাস গ্রহণে কষ্টবোধ হয়। সুতরাং জনবহুল বদ্ধ ঘরে কিছুক্ষণ থাকিল সুস্থ লোকের মাথাধরা, মাথাভার, মাথাঘোরা, বমি বমি ভাব, মনের অশান্তি সৃষ্টি হয়। অধিকক্ষণ এই অবস্থায় থাকিলে অনেকে অজ্ঞান হইয়া মারাও যাইতে পারে। তাহাছাড়া যক্ষ্মা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ব্রংকাইটিস, 'ফ্যারিনজাইটিস, টনসিলাইটিস, ডিপথিরিয়া প্রভৃতি সংক্রামক রোগগ্রস্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি, শ্বাস প্রশ্বাস দ্বারাও সুস্থ লোকের দেহে ঐসব ব্যাধি প্রবেশ করিয়া অসুস্থ করিতে পারে।


প্রশ্ন- পানির উৎসসমূহ কি কি? আলোচনা কর। 
উত্তর : পানির উৎসসমূহ- উৎপত্তি অনুসারে পানির উৎসকে তিন ভাগে ভাগ
করা যায়। যথা-
(১) বৃষ্টির পানি,
(২) ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানি,
(৩) ভূ-গর্ভস্থ পানি।
(১) বৃষ্টির পানি (Rain Water)- প্রকৃতি হইতে প্রাপ্ত পানির মধ্যে বৃষ্টির পানিই সবচাইতে বিশুদ্ধ ও স্বাস্থ্যপ্রদ। কিন্তু প্রথম বৃষ্টির পানি বিশুদ্ধ থাকিতে পারেনা। কারণ প্রথম বৃষ্টিপাতের সময় শূন্যে বাতাসের মধ্যে যে সকল জৈব ও অজৈব পদার্থ থাকে তাহা বৃষ্টির পানির সাথে মিলিত হইয়া ভূপৃষ্ঠে পতিত হয়। বিশুদ্ধ পানি পাইতে হইলে কিছুক্ষণ বৃষ্টিপাতের পর পানি ধারণ করিতে হইবে। বৃষ্টির পানিতে চুনজাতীয় পদার্থ ও ম্যাগনেশিয়া থাকে না বলিয়া উহা কোমল পানি। তবে ইহা পানে সুস্বাদু নয়। রান্না ও কাপড় কাঁচার জন্য ইহা উৎকৃষ্ট।
(২) ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানি (Surface Water)-বৃষ্টির পানি মাটিতে গড়াইয়া যখন কোন জলাশয়ে গিয়া পড়ে তখন আমরা সেই পানিকে ভূপৃষ্ঠস্থ পানি বলি। ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানি নিম্নের উৎস হইতে সংগ্রহ করা যায়। যথা-
i) নদীর পানি।
ii) সমুদ্রের পানি।
iii) বিল ও ডোবার পানি।
iv) পুকুরের পানি।
(৩) ভূ-গর্ভস্থ পানি (Undergound Water)-বৃষ্টির পানি মাটিতে পড়িয়া বেশীর ভাগ পানি মাটিতে প্রবেশ করে। ভূত্বকের পানি যত নিম্নগামী হয় ততই ইহা পরিশ্রত ও বিশুদ্ধ হয়। ভূগর্ভস্থ পানি নিম্নলিখিত ভাবে সংগ্রহ করা যায়।
ⅰ) কূপ (পাতকুয়া, ইন্দারা, কাঁচাকুয়া)।
ii) অগভীর নলকূব্ধ।
iii) প্রস্রবণ বা ঝরণা।
iv) জলজ প্রাণী দ্বারা: জলজ প্রাণী পানিস্থ ময়লা ভক্ষণ করে, ফলে পানি বিশুদ্ধ হয়।
v) থিতানো দ্বারা: পুস্করিণী, রূপ প্রভৃতির স্রোতহীন পানি থিতাইলে যাবতীয় জৈব, অজৈব এবং ধাতব পদার্থ ও রোগজীবাণু ইহার মধ্যে অতি ধীরে ধীরে অধঃস্থ হয়, পানি নির্মল হয়।


প্রশ্ন- পানির খরতা দূরীকরণের অস্থায়ী উপায় কি?
বা, কঠিন পানিকে কোমল পানিতে পরিণত করার অস্থায়ী পদ্ধতি কি?
উত্তর : পানির খরতা দূরীকরণের অস্থায়ী উপায়- নিম্নলিখিত উপায়ে অস্থায়ী পানির খরতা দূর করা যায়। যথা-
(ক) অস্থায়ী খরতা দূরীকরণ: নিম্নলিখিত দুইটি উপায়ে পানির অস্থায়ী খরতা দূরীভূত হয়। যথা-
i) পানি ফুটানো : পানি ফুটাইলে অস্থায়ী কঠিন পানিতে যে দ্রবণীয় ক্যালসিয়াম বা ম্যাগনেশিয়াম বাইকার্বনেট থাকে তাহা অদ্রবণীয় কার্বনেটে পরিণত হইয়া পানি হইতে পৃথক হইয়া যায় ফলে খরতা দূর হয়।
ii) ক্লার্কের প্রক্রিয়া দ্বারা: অস্থায়ী কঠিন পানিতে পরিমাণ মত চুনের পানি মিশাইয়া পানির অস্থায়ী খরতা দূর করা যায়। চুনের পানির সহিত রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে বাইকার্বনেট-গুলি অদ্রবণীয় কার্বনেটে পরিণত হইয়া পানি হইতে পৃথক হইয়া যায়। ফলে পানির খরতা দূর হয়।


প্রশ্ন- পানির খরতা দূরীকরণের স্থায়ী উপায় কি?
বা, কঠিন পানিকে কোমল পানিতে পরিণত করার স্থায়ী পদ্ধতি কি?
উত্তর : পানির খরতা দূরীকরণের স্থায়ী উপায়- নিম্নলিখিত উপায়ে স্থায়ী ভাবে পানির খরতা দূর করা যায়। যথা-
i) স্থায়ী খর পানিতে পরিমাণ মত কাপড় কাচা সোভা অর্থাৎ সোডিয়াম কার্বনেট মিশাইলে পানির স্থায়ী খরতা দূর করা যায়। রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে অদ্রবণীয় ক্যালসিয়াম বা ম্যাগনেশিয়াম কার্বনেট উৎপন্ন হয়।
ii) পারমিউটিট পদ্ধতি: এই পদ্ধতিতে পানির স্থায়ী ও অস্থায়ী উভয় প্রকার খরতা দূর করা যায়। খনিতে সোডিয়াম, এলুমিনিয়াম ও সিলিকনের চার প্রকার জটিল যৌগ পাওয়া যায়। ইহাকে সাধারণভাবে জিওলাইট বলে। ইহার ধর্ম এই যে ইহা সহজেই লবণের ধাতব অংশ প্রতিস্থাপিত করিতে পারে। পারমিউটিট মূলতঃ কৃত্রিম উপায়ে প্রস্তুত জিওলাইট। কঠিন পানিকে এই পারমিউটিটের মধ্য দিয়া চালনা করিলে অদ্রবণীয় ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম পারমিউটিট উৎপন্ন হয়। ফলে পানির খরতা দূর হয়।


প্রশ্ন- পানিতে বিদ্যমান অপদ্রব্যসমূহ কি কি?
উত্তর: পানিতে বিদ্যমান অপদ্রব্যসমূহ- পানিতে দুইধরনের অপদ্রব্যসমূহ দেখিতে পাওয়া যায়। যথা-
ক) দ্রবীভূত অপদ্রব্য-
i) বায়বীয়: অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস, অক্সিজেন, হাইড্রোজেন সালফাইড এবং অ্যামোনিয়া গ্যাস।
ii) বিভিন্ন ধাতব ক্লোরাইড, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের দ্রবণীয় লবণসমূহ।
(খ) অদ্রাব্য অপদ্রব্য-
i) অজৈব: বালি, বিভিন্ন অদ্রবণীয় লবন, কাদা কণা প্রভৃতি।
ii জৈব: বিভিন্ন উদ্ভিদজাত অপদ্রব্য, প্রাণীদেহ নিঃসৃত আবর্জনা, বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কীটের ডিম্বাণু এবং ব্যাকটেরিয়া।


প্রশ্ন- খর পানি ব্যবহারের অসুবিধাসমূহ কি কি?
উত্তর: খর পানি ব্যবহারের অসুবিধাসমূহ- খর পানি ব্যবহারে নিম্নলিখিত অসুবিধা সৃষ্টি হয়। যথা-
i) খর পানিতে অনেক খাদ্য দ্রব্য সহজে সিদ্ধ করা যায় না বলিয়া রান্নায় অসুবিধা হয়।
ii) খর পানিতে ফেনা হয় না তাই কাপড় পরিস্কার করার সময় সাবানের অপচয় হয়।
iii) পানি বেশী খর হইলে বিস্বাদ হইয়া যায়।
iv) খর পানি ব্যবহারে চর্ম প্রদাহের সৃষ্টি হয়।
v) খর পানি ব্যবহারে বিভিন্ন পেটের পীড়া, উদরাময়, গ্যাস্ট্রিক প্রভৃতি দেখা দেয়।
vi) বয়লারে খর পানি ব্যবহার করিলে বয়লারের ভিতরে ক্যাসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম কার্বনেট ও সালফারের স্তর পড়ে। ইহাতে অধিক তাপ প্রয়োগ করিতে হয় এবং বয়লারের আয়ু কমিয়া যায়।


প্রশ্ন- পানিবাহিত ব্যাধি কি? কয়েকটি পানিবাহিত ব্যাধির নাম লিখ।
উত্তর: পানিবাহিত ব্যাধি- যে পানিতে নানা রকম রোগের জীবাণু এবং দূষিত পদার্থ মনুষ্য দেহাভ্যন্তরে প্রবেশ করা হেতু নানাপ্রকার ব্যাধির সৃষ্টি হয় তাহাকে পানিবাহিত ব্যাধি বলে।
"পানিবাহিত ব্যাধিসমূহ- নিম্নে পানিবাহিত ব্যাধিগুলির নাম উল্লেখ করা হইল।
যথা-
i) ভাসমান অজৈব দূষিত পদার্থ দ্বারা-উদরাময়, ক্ষুধামান্দ্য, অজীর্ণ প্রভৃতি।
ii) ভাসমান জৈব দূষিত পদার্থ ও জীবাণু দ্বারা- আমাশয়, উদরাময়, কলেরা, টাইফয়েড, আন্ত্রিকজ্বর, কৃমিরোগ প্রভৃতি।
iii) নানারকম গলিত বা ভাসমান দূষিত পদার্থ দ্বারা-পানিতে অতিরিক্ত ম্যাগনেশিয়াম থাকিলে উদরাময়।
পানিতে লৌহ, দস্তা প্রভৃতি থাকিলে কোষ্ঠকাঠিন্য রোগ। পানিতে সীসা, পারদ প্রভৃতি থাকিলে অম্লশূল, পক্ষাঘাত, রক্ত স্বল্পতা প্রভৃতি রোগ। পানিতে অতিরিক্ত চুন, অভ্র থাকিলে কোষ্ঠকাঠিন্য, অগ্নিমান্দ্য, অজীর্ণ প্রভৃতি রোগ।
iv) নানারকম বাষ্পীয় পদার্থ দ্বারা- পানিতে অতিরিক্ত অক্সিজেন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, অ্যামোনিয়া থাকিলে উদরশূল, অগ্নিমান্দ্য, অজীর্ণ প্রভৃতি রোগ হয়।


প্রশ্ন- গ্রামাঞ্চলে পানি দূষিত হওয়ার কারণ কি?
বা, আমাদের দেশে পুস্করিনী, কূপ প্রভৃতির পানি কিভাবে দূষিত হয়?
উত্তর : গ্রামাঞ্চলে পানি দূষিত হওয়ার কারণ- পুস্করিণী ও কূপের পানি নানাভাবে দূষিত হয় এবং ব্যবহারের অযোগ্য হইয়া পড়ে। বিশেষ করিয়া মানুষ, গাছপালা ও পশুপাখি দ্বারা পানি দূষিত হয়।
i) মানুষের মলমূত্র, পুথু, মানুষ ও পশুদের গায়ের ময়লা, পাট ভিজানো ময়লা, বাসন মাজা, কাপড় কাঁচা প্রভৃতি কারণে পানি দূষিত হয়।
ii) পানিতে রোগীর মলমূত্র, পুথু প্রভৃতি ফেলিলে বা রোগীর ব্যবহৃত জামা কাপড় কাচিলে পানি দূষিত হয়।
iii) শ্যাওলা, কচুরিপানা, পাঁক প্রভৃতি জলজ উদ্ভিদ জন্মিলেও পানি দূষিত হয়।
iv) পানির উপর আলোবাতাস না পৌঁছিতে পারিলে পানি দূষিত হয়।
v) গলিত উদ্ভিদ ও মৃত প্রাণীদেহের কণাসমূহ পানিতে মিশিলে পানি দূষিত হয়।
vi) পুস্করিণী বা কূপের ধারে মলমূত্র ত্যাগ, শৌচকর্ম প্রভৃতি করিলেও পানি দূষিত হয়।
vii) সীসা, দস্তা, নিকেল প্রভৃতি ধাতুর গুঁড়া, কৃমির ডিম, মশা ও মাছির ডিম প্রভৃতি পানিতে থাকিলে পানি দূষিত হয়।
viii) অসাবধানতা বশতঃ কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েড প্রভৃতি রোগের জীবাণু পানিতে মিশিলে পানি দূষিত হয়।
ix) জলাধারের পাশে বা পাড়ে কাঁচা পায়খানা, নর্দমা, কলকারখানা থাকিলে এবং তথাকার অনিষ্টকর গ্যাস, পাট, তুলা প্রভৃতির আঁশ ও ময়লা ধোয়া পানি মিশিয়াও ঐ সব জলাধারের পানি দূষিত হয়।


প্রশ্ন- শহরের পানি দূষিত হওয়ার কারণ কি?
বা, বড় বড় শহরের পানীয় জল কিভাবে দূষিত হয়?
উত্তর : শহরের পানি দূষিত হওয়ার কারণ- শহরের পানি দূষিত হওয়ার কারণসমূহ হইল-
i) পানির যে সমস্ত বড় বড় পাইপের সাহায্যে বিভিন্ন বাড়ীতে পানি সরবরাহ করা হয় সেইসব পানির পাইপ সাধারণতঃ সীসা দ্বারা নির্মিত এবং ঐ পানি অনেক সময় সীসাকে দ্রবীভূত করিয়া ফেলে, তখন ঐ পানি দূষিত হয়।
ii) পানি সরবরাহের পাইপে কোন ছিদ্র যদি থাকে, তবে ঐ পানি মাটির বিভিন্ন দূষিত পদার্থ দ্বারা দূষিত হয়।
iii) কখনও কখনও পানি সরবরাহের পাইপ খালি থাকে এবং পাইপের মধ্যকার চাপ, বাহিরের চাপ অপেক্ষা কম থাকে। সুতরাং দূষিত বায়ু তাহার মধ্যে প্রবেশ করে এবং পানিকে দূষিত করে।
iv) সরবরাহকৃত পানির টাঙ্কিতে বা নলের ভিতর কীটপতঙ্গ পঁচিয়া পানি দূষিত হয়।
v) বিভিন্ন কলকারখানার দূষিত পদার্থসমূহ পানির সহিত মিশিয়া পানিকে দূষিত করে।
vi) শহরের মলমূত্র প্রভৃতি দূষিত পদার্থ নর্দমা দিয়া প্রবাহিত হইয়া পানির সহিত মিশিয়া পানিকে দূষিত করে।


প্রশ্ন- পানি বিশুদ্ধ করার সহজ উপায় বা পদ্ধতি কি? আলোচনা কর। 
বা, কিভাবে অশুদ্ধ পানিকে পানের উপযোগী করা যায়?
উত্তর: পানি বিশুদ্ধ করার সহজ উপায়- নানা উপায়ে পানিকে বিশুদ্ধ করা যায়। তার মধ্যে নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলি অধিক প্রচলিত। যথা-
(ক) ফিটকিরি দ্বারা পানি বিশোধন: যে পানি ঘোলা, তাহা ঘরে আনিয়া স্থিরভাবে রৌদ্রতাপে রাখিয়া দিলে তাহার ভাসমান ময়লাগুলি নিচে থিতাইয়া পড়ে। একটা পরিস্কার সাদা কাপড়ে পানি ছাঁকিয়া নিয়া কিছু ফিটকিরি মিশ্রিত করিলে পানি কিছুটা বিশুদ্ধ হয়।
(খ) পানি ফুটাইয়া বিশুদ্ধকরণ: পানি ছাঁকিয়া লইয়া অন্ততঃ ২০ মিনিটকাল আগুনের তাপে ফুটাইলে তাহার মধ্যস্থ জীবাণুগুলি মরিয়া যায়। সেই পানি ঠাণ্ডা করিয়া পান করা নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য।
(গ) রাসায়নিক পদার্থ মিশাইয়া পানি বিশুদ্ধকরণ: পটাশিয়াম পারামাঙ্গানেট পানিতে গুলিয়া পুকুর বা কূপের মধ্যে ঢালিয়া দিলে পানি অনেকটা নিরাপদ হয়। ইহা ছাড়া আয়োডিন, ব্লিচিং পাউডার, চুন প্রভৃতি দ্রব্য পানিতে মিশাইলেও জীবাণু মরিয়া যায়। আবার ক্লোরোজেন মিশাইলেও পানি জীবাণুশূন্য হয়। অল্প পানিতে সদ্য সদ্য ক্লোরিন মিশাইয়া পানিকে নিরাপদ জীবাণু শূণ্য করার জন্য ইলেক্ট্রোন লাইটিক ক্লোরিন ব্যবহার করা হয়। ক্লোরিন মিশানো পানি সহজে দূষিত হয় না।
(ঘ) কলসী ফিল্টার দ্বারা পানি বিশুদ্ধকরণ: একটি কাঠের বা বাঁশের মঞ্চে উপরি উপরি চারটি কলসী সাজাইয়া রাখা হয়। উপরের তিনটি কলসীর তলায় ছিদ্র করিয়া সলিতা পরাইয়া দেওয়া হয় এবং নীচের কলসীটা ছিদ্রহীন থাকে। উপরের কলসীতে থিতানো পানি, মাঝের দুইটি কলসীর উপরটিতে কাঠ কয়লা এবং নীচেরটিতে বালি ও জামা ইটের টুকরা রাখা হয়। পানি উপরের কলসীতে ঢালিয়া দিলে পানি চুয়াইয়া ক্রমান্বয়ে উপরের কলসী হইতে নীচের কলসীতে পড়িতে থাকে এবং একেবারে নীচের কলসীতে স্বচ্ছ পরিস্কার পানি আসিয়া জমে। মাঝে মাঝে কলসীগুলিতে কয়লা ও বালি বদলাইয়া দিতে হয়।


প্রশ্ন- গ্রামাঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির উৎস কি?
উত্তর: গ্রামাঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির উৎস- গ্রামাঞ্চলে নলকূপ, ইন্দারা, সংরক্ষিত পুকুর, দীঘি, নদী, খাল, বিল, কাঁচাকুয়া প্রভৃতি স্থান হইতে পানি সংগৃহীত করা হয়। তবে বিশুদ্ধ পানীয় ও ব্যবহারের পানি সাধারণতঃ নলকূপ, ইন্দারা ও সংরক্ষিত পুকুর ও সংরক্ষিত ইন্দারা বা কূপ হইতে পাওয়া যায়।


প্রশ্ন- একটি সংরক্ষিত পুকুরের বর্ণনা দাও।
উত্তর : সংরক্ষিত পুকুরের বর্ণনা- সাধারণতঃ পুকুর বা কূপের পানি বিশুদ্ধ রাখা যায় না। কিন্তু সাবধানতার সাহায্যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করিলে পুকুর ও কূপের পানির বিশুদ্ধতা রক্ষা করা যায়। পুকুর সংরক্ষণের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলির প্রতি লক্ষ্য রাখিতে হইবে।
i) উঁচু ও উন্মুক্ত স্থানে পুকুর খনন করা উচিত। যাহাতে বর্ষাকালে পুকুরের পাড় ডুবিয়া না যায় এবং সূর্যের আলো ও বাতাস পানির উপর খেলিতে পারে।
ii) মাটি দিয়া ভরাট করা জমিতে পুকুর খনন করা উচিত নয়।
iii) পুকুর গভীর প্রশস্ত ও চতুষ্কোণ হইতে হইবে।
iv) পুকুরের পাড় হইতে অন্ততঃ একশত ফুটের মধ্যে কোন বাড়ী ঘর থাকা উচিত নয়। বাড়ীর নর্দমার সাথে পুকুরের যাহাতে সংযোগ না থাকে সে বিষয়ে সাবধান থাকা উচিত।
v) পুকুরের পাড় উঁচু ও বাহির দিক ঢালু থাকিবে যাহাতে পাড়ের উপর পতিত বৃষ্টির পানি গড়াইয়া বাহিরে যায়। তাহা হইলে বাহিরের বৃষ্টির পানি গড়াইয়া পুকুরে প্রবেশ করিতে পারিবে না। পুকুরের পাড়ে কোন গাছগাছড়া যাহাতে না থাকে।
তাহা হইলে পানিতে পাতা পড়িয়া পঁচার সম্ভাবনা থাকে না এবং সূর্যের আলো সহজে পুকুরে পড়িতে পারিবে।
vi) পুকুরের পঞ্চাশ ফুটের মধ্যে পায়খানা, আস্তাকুড়, ডোবা, নর্দমা থাকিতে। পারিবে না।
vii) অন্ততঃ দুইশত ফুটের মধ্যে শ্মশান বা কবরস্থান থাকিবে না।
viii) পুকুরে একটি মাচার ঘাট থাকিবে। এ মাচা হইতে পানি তুলিতে হইবে। পুকুরে মানুষ বা জীবজন্তু নামিতে পারিবে না। কাপড় কাচা, বাসন কোসন ধৌত করা, শৌচকর্ম করা প্রভৃতি নিষিদ্ধ করিতে হইবে। পানীয় পানি লওয়া ছাড়া অন্য কোন কাজ পুকুরে করা উচিত নয়।


প্রশ্ন- একটি আদর্শ কূপের বর্ণনা দাও।
বা, কূপ সংরক্ষণের উপায় বর্ণনা কর।
উত্তর : একটি আদর্শ কূপের বর্ণনা- নিম্নে একটি আদর্শ কূপের বর্ণনা দেওয়া হইল। যথা-
i) উঁচু জমিতে কূপ খনন করিতে হইবে। যাহাতে বৃষ্টির পানি বা বন্যার পানি গড়াইয়া কূপের মধ্যে পড়িতে না পারে।
ii) ভরাট জমিতে কূপ খনন করা উচিত নয়। কারণ নানাপ্রকার জৈব পদার্থ দ্বারা জমি ভরাট করা হয়।
iii) কূপের দেওয়াল ইটের হইলে গাঁথুনির ভিতরের দিকে উপরে হইতে তলদেশ পর্যন্ত ১ ইঞ্চি করিয়া সিমেন্টের প্লাষ্টার দিতে হইবে। যদি কূপের দেওয়াল পোড়ামাটির চাক দিয়া তৈরী হয়, তাহা হইলে প্রতি চাকের মধ্যে সিমেন্ট দিয়া আঁটিয়া দিতে হইবে যাহাতে পার্শ্ব দিয়া চুয়াইয়া ভিতরে আসিতে না পারে।
iv) কূপের দেওয়ালের বাহিরের দিকে এঁটেল মাটি দ্বারা ভরাট করিয়া দিতে হইবে।
(v) কূপের দেওয়ালের মাটি বা পাকা অবস্থা অন্ততঃ দুই ফুট উঁচু হইতে হইবে। কূপের চারিদিকে পাকা প্লাটফর্ম করিতে হইবে। প্লাটফর্মটি বাহিরের দিকে ঢালু হইবে এবং অন্তত ১৫ ফুট লম্বা পাকা নর্দমার সহিত সংযুক্ত থাকিবে।
vi) কূপের নিকট ইঁদুরের গর্ত, ডোবা, পচা পুকুর প্রভৃতি থাকিলে ভরাট করিতে হইবে এবং নিকটে গাছ থাকিলে কাটিয়া ফেলিতে হইবে।
vii) কূপের উপর টিনের ঢাকনি দিয়া দিলে উপর হইতে কোন কিছু ভিতরে পড়িতে পারিবে না। পানি তুলিবার জন্য নির্দিষ্ট বালতি ও দড়ি থাকিবে। শিকল দ্বারা কপি কলের সাহায্যেও পানি তোলা যায়।
viii) কূপের পঞ্চাশ ফুটের মধ্যে পায়খানা, আস্তাকুঁড়, নর্দমা, ডোবা প্রভৃতি থাকা ক্ষতিকর। দুইশত ফুটের মধ্যে শ্মশান বা কবরস্থান থাকিবে না।
ix) কূপের নিকট গোসল করা, কাপড় কাঁচা, বাসন মাজা প্রভৃতি কাজ করা যাইবে না। কূপ হইতে পানি তুলিয়া কিছু দূরে এসব কাজ করিতে হইবে। তাহা হইলে কূপের বিশুদ্ধতা রক্ষা পাইবে।


প্রশ্ন-  একটি আদর্শ নলকূপের বর্ণনা দাও।
উত্তর : একটি আদর্শ নলকূপের বর্ণনা- একটি আদর্শ নলকূপের বর্ণনা নিম্নে দেওয়া গেল। যথা-
i) বন্যার পানি যাহাতে নলকূপে প্রবেশ করিতে না পারে সেজন্য ভাল এবং অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে নলকূপ বসানো উচিত।
ii) নলকূপের পাইপের শেষ প্রান্ত অন্ততঃ পক্ষে প্রথম আশোষক স্তর পর্যন্ত পৌঁছায় সেজন্য কমপক্ষে ১০০ ফুট লম্বা পাইপ বসানো উচিত।
iii) নলকূপের ৫০ ফুটের মধ্যে কোন পায়খানা, আস্তাকুঁড়, ডোবা, নর্দমা প্রভৃতি থাকিতে পারিবে না। কবরস্থান নলকূপ হইতে অন্তত দুইশত ফুট দূরে থাকিতে হইবে।
iv) নলকূপের গোড়ার চতুর্দিকে ৬ ফুট পরিধি লইয়া একটা পাকা প্লাটফর্ম। তৈরী করিতে হইবে এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য প্লাটফর্মের সাথে একটি পাকা নর্দমা সংযুক্ত থাকিতে হইবে।
১) নলকূপের পানি, ব্যবহারের সময় খেয়াল রাখিতে হইবে যাহাতে ব্যবহৃত পানি নলকূপের ভিতরে না পড়ে।
vi) নলকূপের পানি পরীক্ষা করিয়া দেখিতে হইবে পানি আর্সেনিক মুক্ত কিনা। পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা অধিক থাকিলে ঐ স্থান হইতে নলকূপ সরাইয়া নিতে হইবে।


প্রশ্ন- ধীর বালি ফিল্টার দ্বারা পানি বিশুদ্ধ করার প্রণালী বর্ণনা কর।
উত্তর : ধীর বালি ফিল্টার দ্বারা পানি বিশুদ্ধ করার প্রণালী- এই প্রক্রিয়ার সাহায্যে বড় বড় শহরের পানি বিশুদ্ধ করা হয়। নদী বা হ্রদ হইতে পানি পাম্প করিয়া আনিয়া একটি বৃহৎ চৌবাচ্চায় ২৪ হইতে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত পানি জমা করিয়া রাখা হয়। এই পানির সাথে ফিটকিরি মিশানো যায়। চৌবাচ্চায় পানি রাখিলে পানি থিতাইয়া যাইবে এবং পানিতে ভাসমান ময়লা ও রোগ জীবাণু অধিকাংশ চৌবাচ্চার তলদেশে জমিবে। সূর্যকিরণ ও বায়বীয় অক্সিজেন দ্বারা জৈব পদার্থ ও রোগজীবাণু অনেকাংশে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে। ইহার পর পানি ফিল্টার বেডে চালু করা হয়।
ফিল্টার বেড- ইহা ইট সিমেন্টের তৈরী পাকা একটি বিরাট চৌবাচ্চা। এই চৌবাচ্চা ১২ফুট গভীর। এই ফিল্টার বেডে নিম্নলিখিতভাবে ইট, পাথরের টুকরা বা ঝামার টুকরা এবং বালি নিম্ন হইতে উর্ধদিকে সাজানো থাকে।
ক) ফাঁক ফাঁক করিয়া দুই সারি ইট সাজানো। ইটের ফাঁকে ফাঁকে পানি যাওয়ার রাস্তা থাকে।
খ) এই ইটের সারির উপর ৬ ইঞ্চি হইতে ১২ ইঞ্চি পুরু পাথরের টুকরা বা নুড়ি।
গ) নুড়ির উপর ৪ইঞ্চি হইতে ৬ইঞ্চি পুরু মোটা বালির স্তর।
ঘ) মোটা বালির উপর ২ হইতে ৩ ফুট পুরু বালির স্তর।
ঙ) ইহার উপর ৪ ফুট হইতে ৫ ফুট ফিল্টার করার জন্য পানি থাকে।
ফিল্টার বেডের কার্যপ্রণালী- প্রথমত ফিল্টার বেডে তিনদিন পানি ধরিয়া রাখিতে হইবে। এই তিনদিনের মধ্যে বালির ফাঁকগুলিতে এক প্রকার শেওলা জাতীয় পিচ্ছিল স্তর পড়ে। এই স্তরকে ভাইটাল লেয়ার বলে। পানি যখন উপর হইতে চুয়াইয়া নিচের দিকে যায় তখন এই স্তরে সমস্ত জীবাণু ও ময়লা আটকাইয়া যায় এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। অতঃপর এই পানি ইটের ফাঁক দিয়া একটি নলপথে বাহির হইয়া একটি চৌবাচ্চায় সঞ্চিত হয়। ইহাই বিশুদ্ধ পানি। ইহার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে কোন সন্দেহ জন্মিলে ইহাতে ক্লোরিণ মিশানো হয়।


প্রশ্ন- দ্রুত বালি ফিল্টার দ্বারা পানি বিশুদ্ধ করার প্রণালী বর্ণনা কর।
উত্তর : দ্রুত বালি ফিল্টার যারা পানি বিশুদ্ধ করার প্রণালী- বর্তমানে এই প্রণালীর সাহায্যে বড় বড় শহরে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয়। ইহাতে ফিল্টার বেড কিছুটা ছোট। প্রথমে একট চৌবাচ্চায় প্রতি গ্যালন পানিতে ১. হইতে ৪ গ্রেন ফিটকিরি মিশ্রিত করা হয়। পরে ঐ পানি থিতানোর জন্য একটি চৌবাচ্চার ভিতর দিয়া ধীরে ধীরে ফিল্টার বেডের দিকে চালিত করা হয়। থিতানোর পর চৌবাচ্চায় ভাসমান ময়লা ফিটকিরির সঙ্গে মিশিয়া নিচে তলানি পড়ে। এখানে বালির ফাঁকসমূহের মধ্যে ফিটকিরিযুক্ত ময়লা বস্তু আটকাইয়া সর পড়ে। এই সর ভাইট্যাল লেয়ারের কাজ করে। সমস্ত জীবাণু ও ময়লা এই সরে 'আটকাইয়া যায় এবং পরিস্কার পানি নলপথে অন্য একটি চৌবাচ্চায় সঞ্চিত হয়। উক্ত শোধন ব্যবস্থা ছাড়াও পানি জীবাণুমুক্ত করার জন্য পানির সহিত ব্লিচিং পাউডার, পটাশ পারমাঙ্গানেট, ক্লোরিন প্রভৃতি মিশাইয়া পানি সরবরাহ করা হয়।


প্রশ্ন-  বড় বড় শহরে (যেমন ঢাকা, চট্টগ্রাম শহর) কিভাবে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয়?
উত্তর: বড় বড় শহরে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের পদ্ধতি- ঢাকা চট্টগ্রামের মত ন্যায় বড় শহরের অদূরে সাধারণতঃ বুড়িগঙ্গা, কর্ণফুলী প্রভৃতি কোন বড় নদীর বা হ্রদের পানি বড় বড় পাম্পের সাহায্যে টানিয়া তুলিয়া কয়েকটি অগভীর পুষ্করিণীকে সেই পানিতে ভর্তি করিয়া ফেলা হয়। এই পুষ্করিণীগুলিকে সেটলিং ট্যাংক বলে। এখানে দিন কয়েক পরে পানির ভাসমান ময়লাগুলি থিতাইয়া গেলে ঐ পানি নলের সাহায্যে নিকটের কয়েকটি বড় বড় পাকা চৌবাচ্চায় ফেলা হয়। সেখানে ইট, পাথর, কাঁকর, বালি প্রভৃতির সাহায্যে পানি ছাঁকিয়া ফিল্টার করার পর প্রয়োজনবোধে ক্লোরিন প্রভৃতি জীবাণুনাশক ঔষধ সংযুক্ত করিয়া পানিকে নির্দোষ করা হয়। এখান হইতে বড় বড় নলের সাহায্যে এই পানি শহরের প্রান্তে একটা কেন্দ্রে উচ্চে অবস্থিত কলাই করা লৌহপাত নির্মিত বিরাট একটি জলাধারে আনিয়া জমা করা হয়। তথা হইতে পাম্প করিয়া ভূমিতলে প্রোথিত অসংখ্য বড়, মাঝারি ও ছোট নলের সাহায্যে শহরের প্রতি রাস্তায় ও বাড়ীতে পরিশুদ্ধ পানি পরিবেশিত হইয়া থাকে।


প্রশ্ন-  দুষিত পানি বলিতে কি বুঝায়? পানির দূষিত পদার্থসমূহ কি কি?
উত্তর : দুষিত পানি- যে পানি পান করিলে আমাদের অনিষ্ট হয় ও স্বাস্থ্যহানি ঘটে এক কথায় তাহাকেই আমরা দূষিত পানি বলিতে পারি। পানিতে নিম্নলিখিত দূষিত পদার্থ থাকিতে পারে।
পানির দুষিত পদার্থসমূহ- পানির দুষিত পদার্থ নিম্নরূপ। যথা-
ক) গলিত উদ্ভিদ পদার্থ- খড়কুটা, লতাপাতা, শৈবাল প্রভৃতি পচিয়া পানিকে দূষিত করে।
খ) গলিত জৈব পদার্থ- মৃত জীবদেহ গলিয়া এবং রোগীর মলমূত্র, আবর্জনা প্রভৃতি মিশিয়া পানিকে দূষিত করে।
গ) কীট পতঙ্গ ও রোগজীবাণু-মশা প্রভৃতি নানাবিধ কীটপতঙ্গের ডিম ও বাচ্চা, টাইফয়েড, আমাশয়, কলেরা প্রভৃতি রোগের জীবাণু দ্বারা পানি দূষিত হয়।
ঘ) ধাতব পদার্থ- পানিতে অনেক রকম ধাতব পদার্থ মিশ্রিত থাকিতে পারে।
অধিক পরিমাণে সীসা, অভ্র, দস্তা, নিকেল প্রভৃতি ধাতব পদার্থ মিশ্রিত থাকিলেও পানি দূষিত হয়।.


প্রশ্ন- পানির ক্লোরিনেশন কাহাকে বলে?
উত্তর: পানির ক্লোরিনেশন- পানিকে নিরাপদ ও জীবাণুশূন্য করার জন্য পানির ক্লোরিনেশন করা হয়। ক্লোরিনের সাহায্যে পানিকে নিরাপদ ও জীবাণুশূন্য করিবার পদ্ধতিকে পানির ক্লোরিনেশন বলে। ফিল্টার করা পরিস্কার পানিতে ক্লোরিন ব্যবহার করিতে হয়।


প্রশ্ন-  ক্লোরিনেশনের বিভিন্ন গদ্ধতিগুলি কি কি?
উত্তর: ক্লোরিনেশনের বিভিন্ন পদ্ধতি-
ক) অধিক পরিমাণে পানি শোধনের জন্য-
i) ক্লোরিন গ্যাস।
ii) ক্লোরামাইন।
iii) পারক্লোবুন।
খ) ব্যক্তিগত ও গার্হস্থ মাত্রায় পানি শোধনের জন্য-
i) ব্লিচিং পাউডার।
ii) ক্লোরিন ও টেবলেট।
iii) ক্লোরিন দ্রবন।
iv) হাইটেস্ট হাইপোক্লোরাইড।


প্রশ্ন-  ক্লোরিনেশনের সুবিধা ও অসুবিধাসমূহ কি কি?
উত্তর : ক্লোরিনেশনের সুবিধা ও অসুবিধাসমূহ নিম্নে প্রদত্ত হইল।
যথা-
ক্লোরিনেশনের সুবিধা-ইহা স্বল্প ব্যয়ে অল্প সময়ে কার্যকরীভাবে পানিকে জীবাণুদূষণ মুক্ত করার নিশ্চিত পদ্ধতি। ইহার প্রয়োগ পদ্ধতি সহজ এবং কোনরূপ প্রাথমিক ট্রিটমেন্ট না করিয়াও এইরূপ পানিকে জীবাণুমুক্ত করা সম্ভব।
ক্লোরিনেশনের অসুবিধা- ক্লোরিনের ঝাঁঝালো গন্ধ এবং বিষাক্ততা অনেক সময় চোখকে উত্যক্ত করে। দ্বিতীয়তঃ নির্বীজনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্লোরিনের পরিমাণের অনির্দিষ্টতা, আয়োডোফর্মের বিশ্রী স্বাদ ও গন্ধ প্রদানের সম্ভাব্যতা এবং পানির রং ও খরত্ব দূরীকরণের অপারগতার কথা উল্লেখ করার মতো। তৃতীয়তঃ পানি ক্লোরিনেশনের ফলে বহু হ্যালোজেন কম্পাউণ্ড তৈরী হইতে পারে, যাহার ফলে অনেকের মতে ক্যান্সারের মত রোগ সৃষ্টি করে বলিয়া অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেন।


প্রশ্ন-  আবর্জনা বলিতে কি বুঝায়? আবর্জনার প্রকারক্তো লিখ।
উত্তর : আবর্জনা- যে জিনিষ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং রোগ সংক্রমণে সহায়তা করে তাহাই আবর্জনা। মানুষের মল ব্যতীত সর্বপ্রকার পরিত্যক্ত, নোংরা অনাবশ্যক জিনিষকে আবর্জনা বলা হয়।
আবর্জনার প্রকারভেদ- আবর্জনা প্রধানতঃ-তিন প্রকারের। যথা-
ক) শুষ্ক আবর্জনা;
খ) আর্দ্র আবর্জনা, 
গ) তরল আবর্জনা।

ক) শুষ্ক আবর্জনা- ছাই, কাগজ, ন্যাকড়া, ইট, পাথর, টিনের টুকরা, পুরাতন লোহা, কাঁচ প্রভৃতি।
খ) আর্দ্র আবর্জনা- মৃত পশুপাখী, তরকারীর অব্যবহার্য অংশ, মাছের আইস, গাছের পাতা, পচা ফলমূল, উচ্ছিষ্ট খাদ্য প্রভৃতি।
গ) তরল আবর্জনা- রান্নাঘর ও গোসলখানার পানি, গোশালার পানি প্রভৃতি।


প্রশ্ন- আবর্জনার উৎসসমূহ কি কি?
উত্তর : আবর্জনার উৎসসমূ- আবর্জনার বিভিন্ন উৎস রহিয়াছে। তন্মধ্যে নিম্নলিখিতগুলি প্রধান। যথা-
i) হাটবাজার
ii) শিল্প কারখানা।
iii) রাস্তাঘাট।
iv) আস্তাবল ও গোশাল।
v) গৃহস্থালী প্রভৃতি।


প্রশ্ন- স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে আবর্জনা ও মলমূত্র দূরীকরণ না করিলে সৃষ্ট অসুবিধাসমূহ কি কি?
বা, অস্বাস্থ্যকর ভাবে আবর্জনা ফেলিলে কি কি অসুবিধা হইতে পারে?
বা, আবর্জনা ও মলমূত্র দূরীকরণ না করিলে কি কি অসুবিধা হইতে পারে?
উত্তর: স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে আবর্জনা ও মলমূত্র দূরীকরণ না করার অসুবিধাসমূহ- স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে আবর্জনা ও মলমূত্র দূরীকারণ না করিলে যেসকল অসুবিধা ও স্বাস্থ্যহানির পরিবেশ সৃষ্টি করে তাহা নিম্নে বর্ণিত হইল। যথা-
i) আবর্জনা ও মলমূত্র হইতে যে দুর্গন্ধ নির্গত হয় তাহাতে আবহাওয়া দূষিত হয় এবং ঘৃণাজনক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ইহাতে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়।
ii) আবর্জনা মলমূত্র একস্থানে জমা থাকিলে তাহার মধ্যে কীটপতঙ্গ ও ইঁদুর বসবাস করে। ইহারা আমাদের খাদ্যদ্রব্যের সংস্পর্শে আসিয়া নানারকম রোগজীবাণু বিস্তার করিতে পারে।
iii) স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে আবর্জনা দূরীকরণ না করিলে তাহা যেখানে সেখানে পড়িয়া থাকে এবং ইহা হাঁসমুরগী, পশুপাখী, কুকুর-বিড়াল এইগুলিকে এদিক সেদিক ছড়াইয়া ছিটাইয়া পরিবেশকে নোংরা করে। ফলে সংক্রামক রোগ বিস্তার লাভ করে।
iv) আবর্জনা ও মলমূত্রের উপর মাছি আসিয়া জমা হয় এবং তথায় ডিম পাড়ে। ইহাতে মাছির বংশবৃদ্ধি ঘটে এবং দ্রুত রোগ বিস্তার লাভ করে।
v) কোন পানীয় জলের নিকটে আবর্জনা ও মলমূত্র থাকিলে ঐগুলি বৃষ্টির পানিতে ধৌত হইয়া পানীয় জলের সাথে মিশিতে পারে। ফলে পানি বাহিত সংক্রামক রোগের সৃষ্টি হয়।
স্তুপীকৃত আবর্জনা বা এখানে সেখানে ছড়াইয়া ছিটাইয়া থাকা আবর্জনা ও জঞ্জাল দৃষ্টিকটু। ইহা পরিবেশের সৌন্দর্যকে বিনষ্ট করে।


প্রশ্ন- গ্রামাঞ্চলে আবর্জনা নিষ্পত্তিকরণ ও দূরীকরণের পদ্ধতি কি কি?
উত্তর : গ্রামাঞ্চলে আবর্জনা নিষ্পত্তিকরণ পদ্ধতি- গ্রামাঞ্চলে আবর্জনা নিষ্পত্তিকরণ ও দূরীকরণের পদ্ধতি নিম্নে উল্লেখ করা হইল।
পল্লীগ্রামে আবর্জনা নিষ্পত্তি করার দায়িত্ব প্রত্যেক গৃহস্থের উপর। গ্রামে সাধারণতঃ আবর্জনা পোড়াইয়া মাটি চাপা দিয়া এবং গর্ত, ডোবা, নিচুজমি ভরাট করিয়া আবর্জনা নিষ্পত্তি করা হয়। পল্লীগ্রামে আবর্জনার সহিত গোবর মিশাইয়া কম্পোষ্টিং সার প্রস্তুত করা যায়। ইহাতে স্বাস্থ্যের ক্ষতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয় না অথচ উত্তম সার তৈরী হয়।
গ্রামাঞ্চলে আবর্জনা দূরীকরণের পদ্ধতি- গ্রামাঞ্চলে তরল আবর্জনা দূরীকরণের জন্য বিশেষ করিয়া বৃষ্টির পানি, ঘরে ব্যবহৃত পানি ও অন্যান্য তরল আবর্জনা নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকিলে গৃহে এবং গৃহের চতুষ্পর্শে পানি জমিয়া বাসগৃহ স্যাঁতস্যাঁতে ও অস্বাস্থ্যকর হইয়া পড়ে। বাসগৃহ শুষ্ক ও স্বাস্থ্যকর রাখিতে হইলে তরল আবর্জনা নিষ্কাশনের জন্য কাঁচা পয়ঃপ্রণালী, সম্ভব হইলে পাকা পয়ঃপ্রণালীর ব্যবস্থা করিতে হইবে।
কাঁচা পয়ঃপ্রণালী পরিষ্কার রাখিলে তাহাতেই কাজ হয়। তবে কূপ, নলকূপ প্রভৃতির সহিত পাকা পয়ঃপ্রণালী থাকা উত্তম। এইসব নর্দমা বা পয়ঃপ্রণালী কোন বড় নর্দমা বা পয়ঃপ্রণালীর সহিত সংযুক্ত করিয়া দিতে হইবে। বড় নর্দমা দূরে কোন খাল, বিল বা ঢালু জমিতে প্রবাহিত করা উচিত।
গোসলখানা, প্রস্রাবখানা রান্নাঘর, কলতলা, গোয়ালঘর প্রভৃতির ধৌতপানি' নিষ্কাশনের জন্য পাকা নর্দমা থাকা ভাল।
ঘরের মেঝে একদিকে ঢালু রাখিতে হইবে এবং ঘর ধোয়া পানি বাহির হইবার পথ থাকিবে। এইপথ আবার আঙ্গিনার নর্দমার সাথে যুক্ত থাকা উচিত।
যেখানে পানি ও তরল আবর্জনা দূর করার মত জায়গা নাই সেখানে সিমেন্টের ঢাকনা বিশিষ্ট পাকা কূপের ব্যবস্থা করিতে হইবে। ইহাকে সেস্পিট বলে। এই কূপ ঝামা বা পাথরের নুড়ি দ্বারা পূর্ণ করিতে হয়। তরল আবর্জনা এই কূপে পড়িবার ব্যবস্থা করিতে হইবে। এই আবর্জনা ভূগর্ভে শোষিত হইয়া যায়। তবে অবশ্যই এই সেস্পিট পুকুর বা কূপ হইতে অন্ততঃ পঞ্চাশ ফুট দূরে থাকিবে।


প্রশ্ন-  শহরাঞ্চলে আবর্জনা দূরীকরণের ব্যবস্থার বর্ণনা দাও।
উত্তর : শহরাঞ্চলে আবর্জনা দূরীকরণের ব্যবস্থার বর্ণনা- শহরের আবর্জনা সংগ্রহ করার জন্য রাস্তার পাশে ডাষ্টবিন রাখা হয়। ডাষ্টবিন সাধারণতঃ টিনের বা ইট সিমেন্ট দ্বারা তৈরী। টিনের ডাষ্টবিন নীচে ও উপরে খোলা। পাকা ডাষ্টবিন স্থায়ীভাবে তৈরী। ইহার ভিতর ময়লা ও আবর্জনা জমা করা হয়। ইহার উপরে ঢাকনা থাকা উচিত নতুবা ইহার মধ্যে মাছি ডিম পাড়িবে। এবং আবর্জনা পঁচিয়া দুর্গন্ধ ছড়াইবে। শহরের প্রত্যেক গৃহ হইতে এবং রাস্তাঘাট ঝাঁট দিয়া আবর্জনা আনিয়া ডাষ্টবিনে জমা করা হয়। পৌরসভা সমস্ত ডাষ্টবিন হইতে আবর্জনা গাড়ীতে উঠাইয়া আবর্জনা নিষ্পত্তিস্থানে লইয়া যায়। যেসব ছোট গলিতে গাড়ী প্রবেশ করিতে পারে না, সেখানে হাতে ঠেলা গাড়ীতে করিয়া আবর্জনা সংগ্রহ করিয়া বড় গাড়ীতে উঠাইয়া দেওয়া হয়।


প্রশ্ন-  শহরের আবর্জনা নিষ্পত্তিকরণের পদ্ধতিসমূহ কি কি?
উত্তর : শহরের আবর্জনা নিস্পত্তিকরণের পদ্ধতিসমূহ- শহরে প্রধানতঃ নিম্নবর্ণিত পদ্ধতিতে আবর্জনা নিস্পত্তি কারনের ব্যবস্থা করা হইয়া থাকে।
i) ভরাট করিয়া কাজে লাগানো- এই পদ্ধতিতে অব্যবহার্য গর্ত, ডোবা, পুকুর বা নীচু জমিতে আবর্জনা ফেলিয়া ভরাট করা হয়। ক্রমশঃ এই আবর্জনা মাটিতে পরিণত হয়। যতদূর সম্ভব লোকালয় হইতে দূরে লইয়া ভরাটের কাজ করিতে হয়। কেননা এইরূপ নিক্ষিপ্ত আবর্জনা দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং মাছি ইঁদুর প্রভৃতির বংশবৃদ্ধির সুযোগ ঘটে। বৃষ্টির সময় এইভাবে আবর্জনা দ্বারা ভরাটের কাজ করা উচিত নয়। কারণ বৃষ্টির পানিতে আবর্জনা গলিয়া নিকটস্থ পানীয় পানির কূপ, পুকুর প্রভৃতির পানি দূষিত করিবে। এই সকল স্থানে ঘর বাড়ী নির্মাণ ও পানীয় পানির কূপ খনন করা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর।
ii) কম্পোষ্টিং পদ্ধতি- আজকাল ছোট ছোট শহরের আবর্জনা নিষ্পত্তির জন্য এই পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। শহর হইতে অন্ততঃ আধামাইল দূরে সারি করিয়া কতগুলি গর্ত খনন করা হয়। 'গর্তগুলি প্রস্থে ৬ ফুট এবং গভীরতা ২ ফুট। প্রথমে ছয় ইঞ্চি পুরু করিয়া আবর্জনা গর্তে ফেলা হয়। পরে ঐ পরিমাণে তরল, মল উহার উপর দেওয়া হয়। আবার আবর্জনা ও তরল মল পর্যায়ক্রমে ফেলিয়া গর্তগুলি পূর্ণ করা হয়। মল ও আবর্জনা জৈব পদার্থ বিশ্লিষ্ট হইবার সময় অত্যাধিক তাপ সৃষ্টি করে, তাই এই তাপে মাছির ডিম ও শুককীট ধ্বংস হয়। প্রথম ১৪ দিনের মধ্যে দুইবার লোহার হাতল দিয়া আবর্জনা মল মিশাইয়া দিতে হয়। একমাস পর আবর্জনা ও মলের কোন চিহ্ন থাকে না। তখন উহা গর্ত হইতে উঠাইয়া অন্যস্থানে এক মাসকাল রাখিয়া দিলে উত্তম সারে পরিণত হয়।
iii) আবর্জনা পোড়াইয়া নিষ্পত্তি করা- অনেক সময় শহরের আবর্জনা একটি বিশিষ্ট চুল্লীর ভিতর পোড়াইয়া নিষ্পত্তি করা যায়। বড় বড় শহরের আবর্জনার পরিমাণ অনেক বেশী হয় তাই যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পোড়ানো শ্রেয়। এই পদ্ধতিতে অনেক সময় দুর্গন্ধ নিঃসৃত হয়।
iv) সমুদ্রে নিক্ষেপ করিয়া নিষ্পত্তি- সমুদ্রের নিকটবর্তী শহরগুলি হইতে আবর্জনা সমুদ্রের তীর 'হইতে অনেক দূরে সমুদ্রগর্ভে নিক্ষেপ' করিয়া আবর্জনা নিষ্পত্তি করা যাইতে পারে। তবে নিক্ষিপ্ত আবর্জনা ঢেউয়ের সাথে তীরে আসিয়া জমা হইতে পারে এবং তাহাতে স্বাস্থ্যহানি ঘটিতে পারে।


প্রশ্ন- পল্লী অঞ্চলে মলমূত্র দূরীকরণ ও নিষ্পত্তি করণের পদ্ধতি বর্ণনা কর। 
উত্তর : পল্লী অঞ্চলে মলমূত্র দূরীকরণ ও নিষ্পত্তি করণের পদ্ধতি- যে সকল ব্যক্তি গ্রামে বাস করেন তাদের অধিকাংশই অনেক সময় মাঠে, ঘাটে বা বাগানে মলত্যাগ করেন। অজ্ঞতা ও দারিদ্রতার জন্য পল্লী অঞ্চলে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা না থাকায় পানিবাহিত রোগের প্রকোপ সেখানে বেশী দেখা যায়। পল্লী অঞ্চলের অল্পসংখ্যক লোক স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার ব্যবস্থা করিলেও তাহাতে রোগ সংক্রমণ বন্ধ হয় না। অল্প খরচে পল্লী অঞ্চলে মলমূত্র নিষ্পত্তির জন্য নিম্নলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইতে পারে।
ⅰ) গর্ত পায়খানা- কূপ, পুকুর, বাসগৃহ ও রান্নাঘর হইতে অন্তত ৫০ ফুট দূরে এইরূপ পায়খানা তৈরী করিতে হইবে। উঁচু জমিতে ৮/৯ ফুট গভীর গর্ত করিয়া উহার উপর বসার জন্য বাঁশের বা কাঠের মাচা তৈয়ার করিতে হয়। মাচার মধ্যস্থলে মল নিচে পড়িবার জন্য ছিদ্র রাখিতে হইবে। চতুর্দিকে বেড়া এবং উপরে চাল দিয়া দিতে হইবে। গর্তের মধ্যে পতিত মল মূত্র ও শৌচের পানি মাটিতে পরিণত হইয়া যায়। অবশ্য এইরূপ ব্যবস্থায় দুর্গন্ধ সৃষ্টি হইতে পারে। কাজেই বেশ কিছু খালি থাকিতেই ঐ গর্ত ভরাট করিয়া অনুরূপ ভাবে আর একটি গর্ত করিয়া পায়খানা তৈরী করিতে হয়।
ii) কুয়া পায়খানা- পাতকুয়ার মত পোড়ামাটির চাকা দ্বারা কুয়া তৈরী করিতে হয়। গর্ত পায়খানার ন্যায় ইহাতে মাচা চাল ও বেড়া দিতে হয়। এই কুয়া ভূগর্ভস্থ পানির নিচে তিনফুট পর্যন্ত যাইবে। ইহাতে মল পানির দ্বারা বিশ্লিষ্ট হইয়া মাটিতে শোষিত হয়। তবে কূপ বা পুষ্করিণী হইতে অন্তত ৫০ ফুট দূরে ইহা করিতে হইবে।
iii) বোরহোল পায়খানা- অগার মেশিন নামক এক প্রকার মেশিন দ্বারা উঁচু জমিতে ১৪ ইঞ্চি হইতে ১৬ ইঞ্চি ব্যাস বিশিষ্ট গর্ত করিতে হয়। এই গর্ত ভূগর্ভস্থ পানির তিনফুট বা তাহারও বেশী নিচে যায়। গর্তের দেয়াল যাহাতে ধ্বসিয়া না পড়ে তাহার ব্যবস্থা করিতে হইবে। উপরে চাল ও চারপাশে বেড়া দিতে হইবে। গর্তের উপরে মধ্যস্থলে ছিদ্রযুক্ত কংক্রীটের বসিবার বেদী তৈরী করিয়া লইতে হইবে। ভূপৃষ্ঠ হইতে ৭ ফুট নীচ পর্যন্ত খালি থাকিতে গর্ত ভরাট করিয়া নূতনভাবে গর্ত করিয়া পূর্বের ন্যায় পায়খানা ব্যবস্থা করিতে হইবে। কূপ বা পুষ্করিণীর ৫০ ফুট দুরে এইরূপ ব্যবস্থা করা উচিত।
iv) খাদ পায়খানা- এইরূপ পায়খানা বাড়ীর সংলগ্ন কোন জমিতে করা যায়। জমিতে ৮/৯ ইঞ্চি প্রস্থ এবং এক হইতে দুই ফুট গভীর খাদ খনন করিতে হইবে। পরিবারের লোক সংখ্যা অনুপাতে খাদ দীর্ঘ করিতে হইবে। খাদের দুই পাড়ে পা রাখিয়া খাদের মধ্যে পায়খানা করিতে হইবে। মূত্র ও শৌচের পানি খাদের মধ্যে পড়িবে। মলত্যাগের পর খাদের পার্শ্বের মাটি টানিয়া মল ঢাকিয়া দিতে হইবে। এইভাবে খাদ পূর্ণ হইয়া গেলে দুই ফুট দূরে আর একটি খাদ খনন করিতে হইবে। চার মাসের মধ্যে মল উত্তম সারে পরিণত হয়। এইরূপ একখণ্ড জমিতে ভাল ফসল ফলে। মলত্যাগের পরই মাটি চাপা দিলে স্বাস্থ্যের ক্ষতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হইতে পারে না।


প্রশ্ন-  শহরের মলমূত্র দূরীকরণের ব্যবস্থা বর্ণনা কর।
উত্তর : শহরের মলমূত্র দূরীকরণের ব্যবস্থা বর্ণনা- শহরে পৌরসভা বা 'মিউনিসিপ্যালিটির উপর স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মলমূত্র দূরীকরণের দায়িত্ব থাকে। তবে এই বিষয়ে জনসাধারণ, সতর্ক না হইলে পৌরসভার পক্ষে সুষ্ঠু ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। শহরের মলমূত্র সাধারণতঃ দুইভাবে দূরীকরণ হইয়া থাকে। যথা-
i) শুষ্ক প্রণালীতে মেথর দ্বারা দূরীকরণ।
ii) পানির সাহায্যে সুরঙ্গ পথে মলমূত্র দূরীকরণ।
i) শুষ্ক প্রণালীতে মেথর দ্বারা মলমূত্র দূরীকরণঃ শহরাঞ্চলে খাটা পায়খানা হইতে মেথর দ্বারা মলমূত্র দূরীকরণের ব্যবস্থা করা হয়। খাটা পায়খানা ইট দ্বারা নির্মিত চার ফুট উঁচু চারকোণের বিশিষ্ট একটি প্রকোষ্ঠ। এই প্রকোষ্ঠের উপরিভাগে পাকা প্লাটফরম তৈরী করা হয় এবং ইহার কেন্দ্রস্থলে মলত্যাগের জন্য একটি ছিদ্র পথ রাখা হয়। বসার সুবিধার জন্য উক্ত ছিদ্র পথের দুই পাশে ইটের বা সিমেন্টের জমানো পাদানি তৈরী করা হয়। ছিদ্রপথে মল নীচে একটি মাটির গামলা বা বালতিতে গিয়া পড়ে। প্রকোষ্ঠের নীচে ইট দ্বারা ঘেরা থাকে। ইহার একদিকে খোলা থাকে বা দরজা থাকে। সেখান হইতে মেথর প্রবেশ করিয়া ময়লা বহনের গাড়ীতে করিয়া মল নিষ্পত্তির স্থানে লইয়া যায়। এইরূপ পায়খানায় প্রস্রাব নিষ্কাশণের জন্য পৃথক নর্দমা থাকা উচিত। খাটা পায়খানা নিয়মিত ভাবে পরিষ্কারের ব্যবস্থা করিলে মোটামোটি স্বাস্থ্যসম্মত।
ii) পানির সাহায্যে সুরঙ্গ পথে মলমূত্র দূরীকরণ : এই ব্যবস্থায় পায়খানার মাঝখানে একটি চিনামাটির মসৃণ গামলা বসানো হয় এবং ঐ গামলার নিচে একটা নল সংযুক্ত থাকে। নলটি এমনভাবে বাঁকা থাকে যে তাহার ভিতর সর্বদা কিছু পানি সঞ্চিত থাকে। আঙ্গিনার ভূগর্ভস্থ আর একটি নলের সহিত পায়খানার নলটি সংযুক্ত করিয়া দেওয়া হয়। আঙ্গিনার নলটি আবার রাস্তার পাশের ভূর্গভস্থ বড় সুড়ঙ্গ পথের সহিত মিলিত করিয়া দেওয়া হয়। তাহার ফলে মল ঐ সুড়ঙ্গ পথ দিয়া দূরে মল নিষ্পত্তির স্থানে চলিয়া যায়। পায়খানার ছাদের উপর একটি পানির চৌবাচ্চা থাকে। উহা হইতে একটি নল পায়খানার গামলার সহিত সংযুক্ত থাকে। মলত্যাগের পর চৌবাচ্চার নলের মুখ খুলিয়া দিলে চৌবাচ্চার পানির স্রোত আসিয়া মলমূত্র ধৌত করিয়া গামলার নিচের নল বাহিয়া আঙ্গিনার নলদিয়া একেবারে রাস্তার পাশের। ভূগর্ভস্থ সুরঙ্গ পথে আসিয়া পড়ে এবং মল নিষ্পত্তির স্থানে চলিয়া যায়। এই ব্যবস্থায় কোন নোংরা পরিবেশ সৃষ্টি হইতে পারে না। এইরূপ পায়খানা শয়ন কক্ষের সহিত সংযুক্ত করিয়া তৈরী করা যায়। ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ হইতে দুর্গন্ধ যাহাতে পায়খানার মধ্যে প্রবেশ করিতে না পারে সেজন্য গামলার নিচের বাঁকা নলে সব সময় পানি জমা থাকে। ঐ পানির স্থান ভেদ করিয়া দুর্গন্ধ পায়খানার মধ্যে প্রবেশ করিতে পারে না। ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ পথ মাঝে মাঝে পরিষ্কার করিতে হয়। তজ্জন্য উহার মধ্যে মানুষ নামিবার পথ থাকে। এই পথকে ম্যানহোল বলে। এই ব্যবস্থা ব্যয় বহুল হইলেও স্বাস্থ্যসম্মত সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবস্থা।


প্রশ্ন-  একটি স্বাস্থ্যপ্রদ পায়খানা বা স্যানিটারী ল্যাট্রিনের বর্ণনা দাও।
উত্তর : একটি স্বাস্থ্যপ্রদ পায়খানা বা স্যানিটারী ল্যাট্রিনের বর্ণনা- এইরূপ পায়খানা সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসম্মত। পায়খানা ঘরের বাহিরে মাটির নীচে কংক্রীটের একটি পাকা চৌবাচ্চা তৈরী করিতে হয়। এই চৌবাচ্চাই সেপটিক ট্যাংক। পায়খানা ঘরের মেঝেতে মলত্যাগের জন্য নল সংযুক্ত একটি সমৃণ চিনামাটির গামলা বসানো থাকে। 'এই গামলার সহিত একটি নল দ্বারা ইহাকে বাহিরের চৌবাচ্চার সহিত সংযুক্ত করা হয়। গামলার নীচে নলটি এমনভাবে বাঁকা হইয়া চৌবাচ্চায় গিয়া পতিত হয় যেন এই বক্রস্থানে নলের ভিতর সর্বদাই কিছু পানি জমা থাকে। ইহার ফলে পানি ভেদ করিয়া মল চৌবাচ্চায় চলিয়া যাইবে, কিন্তু ঐ পানি স্তর ভেদ করিয়া চৌবাচ্চা হইতে মলের দুর্গন্ধ পায়খানা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিতে পারিবে না। পায়খানা ঘরের ছাদে পানির একটি চৌবাচ্চা রাখিতে হয় এবং একটি নল দিয়া পায়খানার গামলার সহিত সংযুক্ত করিয়া দিতে হয়। মলত্যাগের পর শিকল টানিয়া চৌবাচ্চার নলের মুখ খুলিয়া দিলে পানি স্রোতে গামলার মল সেপটিক ট্যাংকের চৌবাচ্চার মধ্যে চলিয়া যায়। উপরে চৌবাচ্চার ব্যবস্থা করিতে না পারিলে গামলায় পানি ঢালিয়া দিলে মল সেপটিক ট্যাংকে চলিয়া যায়। সেপটিক ট্যাংকের চৌবাচ্চাটিকে একটি অসম্পূর্ণ দেওয়াল দিয়া দুই অংশে বিভক্ত করা হয়। প্রথম অংশকে গ্রীট চেম্বার বলা হয়। সেপটিক ট্যাংকের দ্বিতীয় অংশটিই প্রকৃতপক্ষে সেপটিক ট্যাংক। ইহাকে ডাইজেশান চেম্বার বলে। মল প্রথমে গ্রীট চেম্বারে আসিয়া পতিত হয়। মলের সহিত কোন কঠিন পদার্থ থাকিলে উহা এই চেম্বারে জমা হয়। এই চৌবাচ্চায় সব সময় পানি থাকে। যখন মল পানির সহিত গ্রীট চেম্বারে গিয়া পড়ে তখন গলিত মল পানির সহিত অসম্পূর্ণ দেওয়ালের উপর দিয়া উপচাইয়া গ্রীট চেম্বার হইতে অন্য অংশে চলিয়া যায়। এই অংশের উপর পার্শ্ব দিয়া তরল পদার্থ বাহির হইয়া যাওয়ায় আর একটি নল থাকে। এই নল দিয়া তরল পদার্থ বাহির হইয়া গিয়া একটি কূপের মধ্যে পড়ে। এই কূপটি ঝামা দ্বারা পূর্ণ করা থাকে। ইহাকে সোকপিট বলা হয়। এই সোকপিট হইতে তরল পদার্থ ভূগর্ভে শোষিত হয়। সেপটিক ট্যাংকের চৌবাচ্চার পানি দ্বারা মল তরল হয় এবং এক প্রকার জীবাণু দ্বারা বিশ্লিষ্ট হয়। অতঃপর এই তরল পদার্থ ঝামাপূর্ণ সোকপিটের ভিতর দিয়া প্রবাহিত হওয়ার সময় জীবাণুমুক্ত হয়। গ্রামাঞ্চলে ইহা অত্যন্ত উৎকৃষ্ট ব্যবস্থা। ইহাতে দুর্গন্ধ হয় না এবং মাছিও বংশবৃদ্ধি করিতে পারে না।


প্রশ্ন-  মলমূত্র অপসারণের ত্রুটিসমূহ কি কি?
উত্তর : মলমূত্র অপসারণের ত্রুটিসমূহ-গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ লোক মাঠ, ঘাট, বন, বাদাড় ও রাস্তা ঘাটে মলমূত্র ত্যাগ করিয়া থাকে। এই সকল মলমূত্র প্রতিনিয়ত দুর্গন্ধ ছড়ায় ও রোগজীবাণু ছড়ায়। এইসব মল অপসারণের কোন ব্যবস্থা নাই। ছড়াইয়া ছিটাইয়া থাকা মল শুকাইয়া ধূলা বালির সহিত বাতাসে মিশিয়া যায়।
মফস্বল শহরের 'প্রায় বাড়ীতে খাটা পায়খানাগুলি অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় রাখা হয়। পায়খানার মেঝের চারিদিকে বিষ্টার ছিটা ও টুকরা পড়িয়া পাচিয়া যায়। পায়খানার তলদেশে যে দরজা দিয়া মেথর প্রবেশ করে তাহা প্রায় ক্ষেত্রেই ভাঙ্গা বা, খোলা থাকে। তাহাছাড়া মেথরেরা বাটা পায়খানার ময়লা বালতিতে ভরিয়া নিয়া যাওয়ার সময় অসাবধানে রাস্তায় কিছু কিছু ছড়াইয়া ফেলে। ময়লা ফেলিবার জমি শহরের নিকটেই থাকে ফলে সেদিক হইতে বাতাস বহিলে অসহ্য দুর্গন্ধও অনুভূত হয়। এসব খাটা পায়খানায় মল ধারনের টিন বা মাটির পাত্রগুলিকে মাঝে মাঝে মেথরকে দিয়া ফিনাইল দ্বারা পরিষ্কার করানো উচিত।


প্রশ্ন-  বড় বড় শহরে বা মহানগরীতে পানিবাহিত ময়লা অপসারণ পদ্ধতি ও পানি দ্বারা মল বিতাড়ন পদ্ধতি বর্ণনা কর।
উত্তর : বড় শহরে বা মহানগরীতে পানিবাহিত ময়লা অপসারণ পদ্ধতি ও পানি দ্বারা মল বিতাড়ন পদ্ধতি- বড় বড় শহরে বা মহানগরী এলাকার বাড়ীতে, অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এক বা একাধিক ভূনিম্নস্থ নল নর্দমারূপে ব্যবহৃত হয়। ইহা ময়লা পানি বহন করিয়া রাস্তার তলাকার একটা বৃহত্তর নলে পৌছাইয়া দেয়। এই নলগুলিকে ইংরেজীতে ড্রেন বলে। প্রতি বাড়ীতেই তরল ময়লাবাহী ড্রেনের মুখে একটা ঝাঁঝরা লাগানো থাকে, তাহাতে কঠিন ও বড় আকারের ময়লা ও আবর্জনা আসিয়া আটকাইয়া যায়। এইরূপ পায়খানাকে wash down closer নামে অভিহিত করা যায়। পায়খানা ঘরের মেঝেতে একটা ঢেউ খেলানো বাঁকা নলযুক্ত চীনামাটির গামলা বসানো থাকে। এই গামলার মধ্যে মলমূত্র ত্যাগ করা হয়। ঐ বাঁকা নলের সঙ্গে আর একটা লম্বা নল রাস্তার তলদেশে বড় ময়লাবাহী নল পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। গামলার বাঁকা নলের তলায় সর্বদা খানিকটা পানি জমিয়া থাকে বলিয়া নিচ হইতে কোনরূপ দুর্গন্ধ বাহিরে আসিতে পার না। ঐ বাঁকা নলের মাথায় একদিকে একটা ছিদ্র থাকে, তাহার সঙ্গে একটা সরু নলযুক্ত হইয়া লম্বাভাবে ছাদের উপর পর্যন্ত বসানো থাকে। এই নলের মধ্য দিয়া বায়ু আসিয়া বাঁকা নলে সঞ্চিত পানির উভয় দিকের বায়ু চাপের সমতা রক্ষা করে এবং কিছুটা দুর্গন্ধ বাহির করিয়া দেয়।
পায়খানা ঘরের ছাদের কাছে এবং গামলার সরাসরি ৫/৬ হাত উপরে একটি ছোট পানির ট্যাংক লোহার ব্ল‍্যাকেটের উপর বসানো থাকে। ঐ ট্যাংক হইতে একটা নল নামিয়া আসিয়া গামলার মাথার চারিদিকে ঘিরিয়া রহিয়াছে। এইখানে ঐ নলে কয়েকটি ছিদ্রমুখ থাকে। ট্যাংকের মাথায় একটা লোহার হাতল থাকে এবং তাহা হইতে একটি আংটাযুক্ত শিকল ঝুলিতে থাকে। গামলার মধ্যে মলত্যাগের পর আংটা ধরিয়া শিকল টান দিলেই ট্যাংকের তলাকার মুখ খুলিয়া যায় ও ট্যাংকের পানি নল দিয়া নামিয়া আসে এবং সশব্দে ও সবেগে, নলের ছিদ্রগুলির মুখ দিয়া কিছুক্ষণ পানি পড়িয়া ময়লাগুলিকে তলাকার পানিতে ঠেলিয়া দিয়া নিচের ড্রেনে নামাইয়া দেয়। এইভাবে বড় বড় শহরে মল অপসারণ করা হয়।


প্রশ্ন-  ইনসিনারেটর কাহাকে বলে?
উত্তর: ইনসিনারেটর-অনেক সময় শহরের আবর্জনা একটি বিশিষ্ট চুল্লীর ভিতর পোড়াইয়া নিষ্পত্তি করা যায়। আবর্জনা পোড়াইয়া ভস্মে পরিণত করিবার বিশেষ ধরনের চুল্লীকে ইনসিনারেটর বলে। সাদামাটা আকারের একটি ইনসিনারেটর বলিতে লোহার রড দ্বারা তৈরী গ্রেটিং এবং চিমনী সম্বলিত একটি চুল্লী বুঝায়। ইনসিনারেটরের উপর অংশে একটি দরজা থাকে যাহার ভিতর দিয়া আবর্জনা ইনসিনারেটরের মাঝামাঝি ও কিছুটা নিচে অবস্থিত গ্রেটিং এ ন্যস্ত করা যায়।


প্রশ্ন-  ইনসিনারেশন কাহাকে বলে?
উত্তর: ইনসিনারেশন- ইনসিনারেটরের মধ্যে আবর্জনাকে পোড়াইয়া ভস্মীভূত করাকে ইনসিনারেশন বলে।


প্রশ্ন- স্যালেজ কাহাকে বলে?
উত্তর: স্যালেজ রান্নাঘর, বাথরুম, কলতলা, হাতমুখ ধোঁয়ার বেসিন, ঘরের মেঝে ধোঁয়া ইত্যাদির নোংরা পানিকে স্যালেজ বলে।


প্রশ্ন- সিউরেজ কাহাকে বলে?
উত্তর : সিউরেজ ইহা মূলতঃ মলময় পানি। ঘরবাড়ী, কলকারখানা, হাসপাতাল প্রভৃতি হইতে মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তুর মলমূত্র ও স্যালেজকে একত্রে সিউরেজ বলে।
 

প্রশ্ন- স্নাজ কাহাকে বলে?
উত্তর : স্লাজ- সিউরেজ থিতানোর ফলে তলানী হিসাবে যে কর্দমাক্ত ময়লা থিতাইয়া পড়ে তাহাকে স্নাজ বলে।


প্রশ্ন- ক্ষতিকর ব্যবসা কাহাকে বলে? কয়েকটি ক্ষতিকর ব্যবসায়ের নাম বল?
উত্তর : ক্ষতিকর ব্যবসা- যে সকল ব্যবসায় খুব নোংরা পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং সেখান হইতে দুর্গন্ধ নির্গত হইয়া ঐ সব ব্যবসায় কেন্দ্রে নিযুক্ত শ্রমিক এবং - নিকটবর্তী স্থানের জনগণের শারিরীক ও মানসিক স্বাস্থ্যহানি ঘটিয়া থাকে উহাদিগকে ক্ষতিকর ব্যবসায় বলে।
কয়েকটি ক্ষতিকর ব্যবাসায়- যেমন কীটনাশক তৈরীর কারখানা, পশুপালন, কসাইখানা, রক্ত জ্বালানো বা রক্ত শুকানো, অস্ত্র চাঁচা বা ঘষা, চর্বি গলানো, পশু চর্ম পরিষ্কার করা, অস্থি জ্বালানো বা সিদ্ধ করা, কাগজ তৈরীর কারখানা, ধূলিনির্গমনকারী ব্যবসায় (যেমন-সিগারেট তৈরীর কারখানা, পাথরের কারখানা, চাউলের কারখানা) প্রভৃতি।.


প্রশ্ন- ক্ষতিকর ব্যবসায় কিভাবে মানুষের স্বাস্থ্যহানি ঘটায়?
উত্তর : ক্ষতিকর ব্যবসায় যেভাবে মানুষের স্বাস্থ্যহানি ঘটায় ক্ষতিকর ব্যবসায়ের যে সকল দ্রব্য ব্যবহার করা হয় তাহা স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। সংকীর্ণ স্থানে বেশী জীবজন্তু একত্রে রাখিলে এবং সেখানে যদি উপযুক্ত বায়ু সঞ্চালনের বা নর্দমার ব্যবস্থা না থাকে, সেখানে জীবজন্তুর মূত্র, বিষ্ঠা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করে ও মানুষের স্বাস্থ্যহানি ঘটায়। কসাইখানার পশুর রক্ত, মলমূত্র, নাড়িভূড়ি পচিয়া দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয় ও নোংরা পরিবেশ সৃষ্টি করে। ফলে জনসাধারণের স্বাস্থ্যের পক্ষে বিপজ্জনক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। চর্বি গলানো, রক্ত শুকানো, পশুচর্ম পরিষ্কার করা প্রভৃতি ব্যবসা হইতেও দুর্গন্ধ নির্গত হইয়া নোংরা ও দূষিত পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং ঐ সকল ব্যবসায়ে নিযুক্ত শ্রমিক ও নিকটবর্তী স্থানের জনগণের স্বাস্থ্যহানি ঘটায়। ধূলা নির্গমনকারী ও আঁশনির্গমনকারী ব্যবসা হইতে আঁশ, ধুলা, ধোঁয়া নির্গত হইয়া মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসের সাথে ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। এই সকল ক্ষতিকর ব্যবসাও এইভাবে মানুষের স্বাস্থ্যহানি ঘটায়!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ