অর্গানন অব মেডিসিন
প্রশ্ন- হোমিওপ্যাথি কাহাকে বলে?
উত্তর: ইংরেজী Homoeopathy শব্দটি গ্রীক শব্দ Homoeo বা Homoeoios এবং Pathy বা Pathos হইতে উৎপন্ন হইয়াছে। গ্রীক ভাষায় হোমিও মানে সদৃশ, Like, Similar এবং Pathos মানে উপায়, পদ্ধতি বা কষ্টভোগ Means, Method or Suffering। আভিধানিক অর্থে হোমিওপ্যাথি অর্থ হইল 'সদৃশ রোগ' বা 'সদৃশ দুর্ভোগ'।
রোগ নিরাময়ের প্রাকৃতিক নিয়ম Similia Similibus Curantur এর বাক্যগত অর্থ Let like be cured by like অর্থাৎ সদৃশ রোগ সৃজনক্ষম ঔষধ দিয়াই রোগ আরোগ্য সম্ভব। হোমিওপ্যাথি একটি সুসংগঠিত নিয়মতান্ত্রিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং আরোগ্য কলা। যে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মূল সূত্র হইতেছে সুস্থাবস্থায় কোন ঔষধ স্থূল মাত্রায় সেবন করিলে মানুষের দেহ ও মনে যে সকল অসুস্থকর লক্ষণ প্রকায় পায়, ঐ প্রকার লক্ষণযুক্ত প্রাকৃতিক অসুস্থতায় উক্ত ঔষধের শক্তিকৃত সূক্ষ্মমাত্রা প্রয়োগে লক্ষণসমূহ অন্তর্হিত হয়। হোমিওপ্যাথির সংজ্ঞায় বলা যায় 'প্রাকৃতিক রোগের দ্বারা সৃষ্ট মানব শরীরের বিকৃত লক্ষণসমষ্টির দ্বারা অংকিত প্রতিচ্ছবির ন্যায় সুস্থ দেহে পরীক্ষিত অনুরূপ প্রতিচ্ছবি সৃষ্টি করিতে সক্ষম শক্তিকৃত ঔষধের একবার একটিমাত্র ঔষধ প্রয়োগ ব্যবস্থাকে হোমিওপ্যাথি বলে।
বিধিবদ্ধভাবে অনেক হোমিও মনীষী হোমিওপ্যাথির উপর বিভিন্ন সংজ্ঞা প্রদান করিয়াছেন। নিম্নে কয়েকটি সংজ্ঞার উল্লেখ করা হইল।
ডাঃ বোরিকের মতে সদৃশ লক্ষণ ভিত্তিক আরোগ্য পদ্ধতিকে হোমিওপ্যাথি বলে।
ডাঃ এলেনের মতে হোমিওপ্যাথি সদৃশ বিধানভিত্তিক একটি নিয়মভিত্তিক চিকিৎসাশাস্ত্র।
ডাঃ হার্বাট, এ রবার্টস এর মতে আরোগ্যের যে বিজ্ঞান ও কলা প্রকৃতির মৌলিক নিয়ম নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত, তাহাকেই হোমিওপ্যাথি বলে।
ডাঃ এ, ডাইট স্মিথ বলেন হোমিওপ্যাথি একটি বিশেষ আরোগ্য বিজ্ঞান, ডাঃ স্যামুয়েল ফ্রেডারিক হ্যানিমান যাহার বিকাশ সাধন করিয়াছেন এবং যাহা আরোগ্য বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত।
প্রশ্ন- হোমিওপ্যাথি কি বিজ্ঞান ভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি?
বা, হোমিওপ্যাথি প্রকৃত বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসাপদ্ধতি-আলোচনা কর।
উত্তর: হোমিওপ্যাথি যে বিজ্ঞান সম্মত চিকিৎসা পদ্ধতি ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। রোগের ঘটনা সম্পর্কে বিধিবদ্ধ জ্ঞান হইল রোগ বিজ্ঞান। ঔষধ সম্বন্ধে বিধিবদ্ধ জ্ঞানই হইল ভেষজ বিজ্ঞান। আর কোন নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করিয়া রোগের চিকিৎসা ও নিরাময় করার বিধিবদ্ধ জ্ঞানই হইল আরোগ্য বিজ্ঞান। হোমিওপ্যাথির তত্ত্ব ও প্রয়োগ পদ্ধতি সম্পূর্ণরূপে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করিয়া রচিত হইয়াছে। হোমিওপ্যাথি একটি সুসংগঠিত নিয়মতান্ত্রিক চিকিৎসাপদ্ধতি যাহার মূল তত্ত্ব হইল সুস্থাবস্থায় কোন ঔষধ স্কুলমাত্রায় সেবন করিলে মানব দেহ ও মনে যে সকল অসুস্থকর লক্ষণ প্রকাশ পায়, ঐ প্রকার লক্ষণযুক্ত প্রাকৃতিক অসুস্থতায় উক্ত ঔষধের শক্তিকৃত সূক্ষ্মমাত্রা প্রয়োগে রোগলক্ষণ দূরীভূত হইয়া যায়। ইহা প্রাকৃতিক নীতি সম্মত। ইহা গবেষণালব্ধ সত্য যে ঔষধ সুস্থদেহে রোগ সৃষ্টি করিতে পারে সেই ঔষধই অনুরূপ লক্ষণবিশিষ্ট প্রাকৃতিক পীড়া আরোগ্য করিতে পারে। ইহাই 'Similia Similibus Curentur' অর্থাৎ সদৃশ রোগ সৃজনক্ষম ঔষধ দিয়াই আরোগ্য সাধন সম্ভব। বিজ্ঞানের সাধারণ নীতিগুলির সঙ্গে হোমিওপ্যাথি বিধানসমূহ সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। বিজ্ঞানের যে নীতিগুলির সঙ্গে ইহার সামঞ্জস্য আছে সেগুলি হইল-
ক) এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড এক বিরাট শক্তি পিণ্ড বিশেষ। জীব ও জড় এই উভয় পদার্থে সে শক্তি বিদ্যমান।
খ) জড় পদার্থ হইল শক্তিরই স্থূলরূপ। পদার্থ ও শক্তি আপেক্ষিক সূত্রদ্বারা পরস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ ও সম্বন্ধযুক্ত।
গ) পদার্থকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রূপে বিভাজন করা চলে, কিন্তু ধ্বংস করা চলে না।
ঘ) একই পদার্থের যাহা বৃহৎ মাত্রায় কর্মক্ষমতার ক্ষতি বা ধ্বংস সাধন করে
তাহাই ক্ষুদ্রমাত্রায় উদ্দীপন করে।
ঙ) উদ্দীপনায় সাড়া দেওয়া এবং আত্মরক্ষা করার স্বতঃস্ফূর্ত প্রয়াস চালানো সজীব পদার্থের স্বাভাবিক ধর্ম।
চ) আরোহনীতি-কোনরূপ অনুমান বা কল্পনার আশ্রয় না নিয়া বাস্তব ঘটনাসমূহের পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ ও ঘটনাসমূহের মধ্যে সম্পর্কের এক সাধারণ সূত্র আবিষ্কার করা, যাহা প্রতিটি ঘটনার বেলায় প্রযোজ্য এবং সেই সঙ্গে বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ছ) প্রতিটি ক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া বিরামহীনভাবে চলে।
জ) শক্তির প্রবাহ হইল কেন্দ্র হইতে পরিধির দিকে। ভিতর হইতে বাহিরের দিকে।
যুক্তিশাস্ত্রের আরোহনীতি ও অবরোহ নীতি অনুসরণ করিয়া ঘটনাসমূহের মধ্যে কোন সাধারণ নিয়মের আবিষ্কার করা এবং তাহা পুনঃ পুনঃ পরীক্ষা করিয়া তার সত্যতা ও সার্বজনীনতা যাচাই করিয়া নেওয়ার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উপর হোমিওপ্যাথি প্রতিষ্ঠিত। আরোহনীতির মূলকথা হইল ঘটনাসমূহের যথাযথ পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা, ঘটনাসমূহের পরস্পরের সম্পর্ক ও কারণ সম্পর্কে এবং সাধারণ সূত্র আবিষ্কার করা যাহা প্রতিটি ঘটনার বেলায় প্রযোজ্য হইবে। অনরোহ পদ্ধতির মূলকথা হইল কোন নিয়ম যদি সাধারণভাবে এক বিশেষ শ্রেণীতে সত্য বলিয়া প্রতীয়মান হয় তবে সেই শ্রেণীর প্রত্যেকের বেলায়ও সেই নিয়ম প্রযোজ্য হইবে। হোমিওপ্যাথির বিভিন্ন ঔষধ বিভিন্ন সময়ে সুস্থ মানবদেহে প্রয়োগ করিয়া দেখা গিয়াছে যে, ঐ ঔষধগুলি সর্বক্ষেত্রে একই ধরণের দৈহিক ও মানসিক লক্ষণ সৃষ্টি করে। আবার সেই ঔষধের সূন্নমাত্রা সেইরূপ লক্ষণযুক্ত রুগ্নমানুষে প্রয়োগ কবিলে সেই লক্ষণগুলি দূরীভূত হইয়া যায়।
উপরোক্ত আলোচনা হইতে নিঃসন্দেহে প্রমাণ হয় যে হোমিওপ্যাথি প্রতিটি নীতিবিজ্ঞানের রীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। তাই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শাস্ত্র বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপরই শুধু প্রতিষ্ঠিত নয়, ইহা এক বিজ্ঞানসম্মত আরোগ্যবিজ্ঞান।
প্রশ্ন- হ্যানিমান কেন তৎকালীন এলোপ্যাথিক চিকিৎসা বর্জন করেন?
উত্তর: মহাত্মা হ্যানিমান ছিলেন একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠিত এলোপ্যাথিক চিকিৎসক। এলোপ্যাথিক চিকিৎসা প্রথার সাফল্যের সাথে সাথে ইহার কিছু বিষময় ফল হ্যানিমান অনতিবিলম্বে প্রত্যক্ষ করলেন। আজ যে ঔষধ অমোঘ বলিয়া ঘোষিত হইল দুইদিন পরই উহা মানুষের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক বলিয়া পরিত্যক্ত হইল। তাহা ছাড়া যে রোগের জন্য ঔষধ প্রয়োগ করা হইল তাহা হয়ত সারিল কিন্তু অন্য নানারকম জটিল উপসর্গ দেখা দিতে লাগিল। চিকিৎসাবিদ্যার উন্নতির সাথে সাথে বিভিন্ন বিভাগে বিশেষজ্ঞের সৃষ্টি হইল। ফলে মানুষের এক একটি অঙ্গ মানুষের চেয়েও বেশী প্রাধান্য পাইতে লাগিল। রোগ রোগীর না হইয়া তাহার কোন অঙ্গের রোগ বলিয়া আখ্যা পাইল। যন্ত্রণাকাতর যে রোগী চিকিৎসকের উপর বিশ্বাস করিয়া নিজেকে সমর্পণ করিল সেই চিকিৎসকই তাহার উপর গিনিপিগের মত বিভিন্ন ঔষধ ও তত্ত্বের নিত্য নতুন পরীক্ষা শুরু করিলেন। ফলে অনেক বিবেকবান খ্যাতিমান চিকিৎসক এলোপ্যাথিক চিকিৎসাপদ্ধতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হইয়া উঠেন। বিজ্ঞানাচার্য দার্শনিক ও চিকিৎসা শাস্ত্রবিদ স্যামুয়েল হ্যানিমান ছিলেন ইহাদের অন্যতম। তিনি প্রচলিত এই চিকিৎসা প্রথার ভয়াবহ পরিণামের কথা উপলব্ধি করিয়া সখেদে ঘোষণা করিলেন, 'আমি এমন সব ঔষধ প্রয়োগ করছি যেগুলি সম্পর্কে আমি খুব কম জানি। এমন দেহে প্রয়োগ করছি যার অন্তর্নিহিত ক্রিয়া ধারা সম্বন্ধে বলতে গেলে আমি কিছুই জানি না। অতএব মানুষের চিকিৎসার নামে তার বৃহত্তর অনিষ্ট সাধন করা থেকে অব্যাহতি পেতে হলে এই চিকিৎসা বৃত্তি পরিত্যাগ করা ছাড়া আমার আর কোন গত্যন্তর নেই। আমি বিশ্বাস করি আমি যে সমস্ত রোগের চিকিৎসা করেছি সেগুলি বিনা চিকিৎসায় থাকলে বর্তমান অবস্থার থেকে ভাল থাকত।' চিকিৎসা বৃত্তির মাধ্যমে মানব সেবার যে স্বপ্ন তিনি আশৈশব দেখিয়া আসিয়াছেন সেইবৃত্তির সাফল্যের শীর্ষস্থানে আরোহণ করিয়া তিনি ইহা পরিত্যাগ করেন।
প্রশ্ন- সিংকোনা বার্কের উপর কালেন সাহেবের মন্তব্যে হ্যানিমানের প্রতিক্রিয়া কি?
উত্তর: ১৭৯০ খৃষ্টাব্দে হ্যানিমান তখন উইলিয়াম কালেনের মেটিরিয়া মেডিকা গ্রন্থখানা অনুবাদ করিতেছিলেন। তিনি সেখানে লক্ষ্য করিলেন যে, সিংকোনা কম্পজ্বরের ঔযধরূপে ব্যবহৃত হয় সেই ঔষধই বৃহৎ মাত্রায় প্রয়োগ করিলে কম্পজ্বরের সৃষ্টি হয় বলিয়া উল্লেখ আছে। তাঁহার মনে চকিতে এক নতুন সম্ভাবনার কথা উদয় হইল। হ্যানিমান নিজেকে প্রশ্ন করিলেন, তবে কি সদৃশমতে চিকিৎসার দ্বারা রোগ আরোগ্য সম্ভব? তিনি পরীক্ষা করার জন্য কম্পিত হৃদয়ে সিংকোনা সেবন করিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক ধরণের কম্পজ্বর তাঁহাকে জর্জরিত করিয়া ফেলিল। অতঃপর তিনি সিংকোনার সূক্ষ্মমাত্রা সেবন করিয়া রুদ্ধশ্বাসে ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। ধীরে ধীরে যাদুমন্ত্রের মত সমস্ত উপসর্গ অন্তর্হিত হইয়া গেল, ইহা হইতে তাঁহার মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা জন্ম নিল যে, যে ভেষজ রোগ সৃষ্টি করিতে পারে, সেই ভেষজই সেই সেই ধরণের রোগ আরোগ্য করিতে পারে।
প্রশ্ন- শুধুমাত্র সিংকোনা পরীক্ষা করিয়াই কি হ্যানিমান ক্ষান্ত হন?
উত্তর: শুধুমাত্র সিংকোনা পরীক্ষা করিয়াই হ্যানিমান ক্ষান্ত হন নাই। সিংকোনা পরীক্ষার পর বিভিন্ন ঔষধ নিয়া তিনি পরীক্ষা নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা শুরু করেন। একোনাইট স্কুল মাত্রায় প্রয়োগ করিয়া দেখা গেল প্রদাহযুক্ত জ্বরের সূচনা হয়। তার সঙ্গে থাকে পিপাসা, অস্থিরতা ও মৃত্যুভীতি। আবার এমন অবস্থায় একোনাইট সূক্ষ্মমাত্রায় প্রয়োগ করা হইলে সমস্ত উপসর্গ বিলীন হইয়া যায়। এমনিভাবে নাক্স, পালসেটিলা, বেলেডোনা প্রভৃতি ঔষধ পরীক্ষায় একই সত্যের সন্ধান পাওয়া গেল। ভেষজের রোগোৎপাদিকা শক্তিই তাহার আরোগ্যাদায়িকা শক্তি। দীর্ঘ ৬ বৎসর যাবত অবিরাম পরীক্ষা, গবেষণা, সংস্কারমুক্ত যুক্তি, বিরামহীন অনুসন্ধান, বিশ্বস্ত পর্যবেক্ষণের পর হ্যানিমান সেই মহান সত্য সম্বন্ধে নিশ্চিত হইলেন।
প্রশ্ন- ঔষধ যে কৃত্রিম রোগ সৃষ্টি করিতে পারে, সেইরূপ প্রাকৃতিক রোগ আরোগ্য করিতে পারে-বিসবে হ্যানিমান ইহা বুঝিলেন?
উত্তর : হ্যানিমান নিজ সুস্থদেহে সিংকোনা প্রয়োগ দ্বারা কৃত্রিম রোগ সৃষ্টির ক্ষমতা লক্ষ্য করেন এবং সূক্ষ্ম মাত্রায় সিংকোনা সেবন করিয়া ঐ কৃত্রিম রোগ দূরীভূত হওয়ার ঘটনা প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ করেন। ইহার পর একে একে একোনাইট, বেলেডোনা, পালসেটিলা, নাক্স ভমিকা প্রভৃতি ঔষধগুলিও নিজদেহে প্রয়োগ করিয়া এই মহাসত্যের সন্ধান পাইলেন যে, সুস্থ দেহে পরীক্ষিত ভেষজ যে যে রোগলক্ষণ উৎপন্ন করে, উক্ত লক্ষণবিশিষ্ট কোন পীড়ায় ঐ ঔষধসমূহ প্রয়োগ দ্বারা লক্ষণাদি তিরোহিত হয়। ইহা হইতেই তিনি বুঝিলেন যে, ঔষধ যে রূপ কৃত্রিম রোগ সৃষ্টি করিতে পারে ঠিক সেইরূপ প্রাকৃতিক রোগও আরোগ্য করিতে পারে।
প্রশ্ন- ডাঃ হ্যানিমান কর্তৃক চিরন্তন হোমিওপ্যাথির জন্ম, উৎপত্তি বা আবিষ্কার সম্বন্ধে যাহা জান লিখ।
বা, আরোগ্যনীতি 'সিমিলিয়া সিমিলিবাস কিউরেন্টার' আবিষ্কারের কাহিনী সংক্ষেপে বর্ণনা কর।
উত্তর: স্যামুয়েল হ্যানিমান হইলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি সর্বপ্রথম প্রকৃত চিকিৎসাশাস্ত্রের পরিসর ও বিষয়বস্তু সংকেত নির্দেশ করেন। হ্যানিমান ছিলেন একজন প্রথিতযশা এলোপ্যাথিক চিকিৎসক। বার বার তিনি প্রচলিত এলোপ্যাথিক চিকিৎসাপদ্ধতির অনুমান নির্ভর ব্যক্তিগত মত ভিত্তিক অবস্থা, ইহার অসম্পূর্ণতা ও অনির্ভরশীল অবস্থা ভ্রান্ত, ক্ষতিকর ও অবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী উপলব্ধি করেন। এই কারণে তিনি এলোপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতি ধীরে ধীরে বিশ্বাস হারাইয়া ফেলেন এবং রসায়ন বিদ্যা বিষয়ক গবেষণা ও অনুবাদ কার্যে বিশেষভাবে আত্মনিয়োগ করেন। ১৭৯০ খৃষ্টাব্দে একটি সাধারণ ঘটনা হ্যানিমানের জীবনে নতুন এক সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মুক্ত করিয়া দিল। হ্যানিমান তখন উইলিয়াম কালেনের বিখ্যাত মেটিরিয়া মেডিকা জার্মান ভাষায় অনুবাদ করিতেছিলেন। সেখানে তিনি লক্ষ্য করিলে যে, যে সিংকোনা কম্পজ্বরের ঔষধরূপে ব্যবহৃত হয় সেই ঔষধই বৃহৎমাত্রায় প্রয়োগ করিলে কম্পজ্বরের সৃষ্টি হয় বলিয়া উল্লেখ আছে। তাঁহার মানসপটে একে একে ভিড় করিল প্রতীচ্যের এরিষ্টটল, হিপোক্রেটিস, সিডেনহাম, সেলসাস, স্টল ও হলের সদৃশ মতে চিকিৎসানীতির সমর্থনের অংশ। তিনি কম্পিত হৃদয়ে অধিকমাত্রায় সিংকোনা সেবন করিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই এই বিশেষ ধরনের কম্পজ্বর তাঁহাকে জর্জরিত করিয়া ফেলিল। তিনি বিস্ময়ে হতবাক হইয়া গেলেন। অতঃপর তিনি সিংকোনার সূক্ষ্মমাত্রা সেবন করিয়া ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। ধীরে ধীরে নাটকীয়ভাবে সমস্ত কষ্টকর উপসর্গ অন্তর্হিত হইয়া গেল। হ্যানিমান অবশেষে তাঁহার পরীক্ষার সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করেন, 'সবিরাম জ্বরের ঔষধ হিসেবে পেরুভিয়ান বার্ক বা সিংকোনা কাজ করে, কারণ সুস্থ মানুষের শরীরে উহা সবিরাম জ্বরের সদৃশ লক্ষণ সৃষ্টি করিতে পারে।' তারপর বিভিন্ন ঔষধ নিয়া পরীক্ষা নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা শুরু হইল। একোনাইট স্কুলমাত্রায় প্রয়োগ করিয়া দেখা গেল প্রদাহযুক্ত জ্বরের সূচনা হয়, তার সঙ্গে থাকে পিপাসা, অস্থিরতা ও মৃত্যুভীতি। আবার এইরূপ অবস্থায় একোনাইট সূক্ষ্মমাত্রায় প্রয়োগ করা হইলে সমস্ত উপসর্গ বিলীন হইয়া যায়। ভেষজের রোগোৎপাদিক শক্তিই তার আরোগ্যদায়িনী শক্তি। যে ভেষজ যে রোগ সৃষ্টি করিতে পারে, সেই ভেষজই সে ধরণের রোগ আরোগ্য করিতে পারে। বিশুদ্ধ চিন্তা, সংস্কারমুক্ত যুক্তি, বিরামহীন অনুসন্ধান, বিশ্বস্ত পর্যবেক্ষণ আর পুংখানুপুংখ পরীক্ষার পর হ্যানিমান সেই মহাসত্য সম্বন্ধে স্থির নিশ্চিত হইলেন।
১৭৯৬ খৃষ্টাব্দে হ্যানিমান উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করিলেন, 'রোগারোগ্যের শাশ্বত পথের সন্ধান আমি পেয়েছি। যে সত্য সুদীর্ঘকাল রহস্যের তিমিরাবরণে আচ্ছন্ন ছিল আমি তা উদ্ঘাটন করেছি।' সেইপথ প্রকৃতির সঙ্গে সমঝোতার পথ। প্রকৃতির সঙ্গে বিরুদ্ধাচনা করে নির্মল আরোগ্য বিধান সম্ভব নয়। আদর্শ আরোগ্য বিধানের নিমিত্ত প্রকৃতি নির্দিষ্ট একটি মাত্র পথ আছে তা হলো Similia Similibus Curantur-সমঃ সমং সময়তি অর্থাৎ যে ভেষজ সুস্থদেহে যে ধরণের রোগ সৃষ্টি করিতে সক্ষম সেই ধরণের রোগ সেই ভেষজই আরোগ্য করিতে সক্ষম। মৃদু, দ্রুত ও স্থায়ীভাবে আরোগ্য প্রদানের জন্য রোগের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে এমন একটি ঔষধ নির্বাচন করিতে হইবে যাহা যে রোগ নিরাময় করিতে হইবে সেই রোগের সদৃশ একটি রোগ নিজেই উৎপাদন করিতে পারে। নির্মল আরোগ্য বিধানের ইহাই একমাত্র পথ। হ্যানিমানের বহু পূর্বেই হিপোক্রেটিস উল্লেখ করিয়াছেন যে অসদৃশ ও সদৃশ উভয় পদ্ধতিতেই রোগী আরোগ্য লাভ করে। সিডেনহাম, সেলসাস, প্যারাসেলসাস, স্টল, হল, স্টুয়ার্ট প্রভৃতি চিন্তানায়কদের বক্তব্যেও সদৃশ নীতির যথেষ্ট সমর্থন পাওযা যায়। কিন্তু আরোগ্যের একমাত্র নিয়ম হিসাবে ইহাকে কেহই উল্লেখ করে নাই। একমাত্র হ্যানিমান তাহা উল্লেখ করেন এবং পরীক্ষা ও প্রয়োগের মাধ্যমে তাহা প্রমাণও করেন। হ্যানিমান এইসব চিকিৎসা পদ্ধতির নামকরণ করেন হোমিওপ্যাথি। ১৭৯০ খৃষ্টাব্দে হোমিওপ্যাথির আবিষ্কার হইলেও তখন পর্যন্ত তিনি ইহাকে হোমিওপ্যাথি বলিয়া আখ্যায়িত করেন নাই। ১৭৯৬ খৃষ্টাব্দে হাফল্যাণ্ডের জার্নালে এক ঐতিহাসিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, যাহার শিরোনাম ছিল 'On a new principle for ascer-taining the curative properties of Drugs' ইহাতেই তিনি এই সদৃশনীতির আরোগ্যকারী চিকিৎসা পদ্ধতিকে 'হোমিওপ্যাথি' নামে অভিহিত করেন। ১৮১০ খৃষ্টাব্দে অর্গাননের ১ম সংস্করণেও তিনি 'হোমিওপ্যাথি' নাম ব্যবহার করেন।
প্রশ্ন- অর্গানন কাহাকে বলে?
উত্তর: অর্গানন (Organon) শব্দটি গ্রীক ভাষার Ergan শব্দ হইতে লওয়া হইয়াছে। ল্যাটিন ভাষায় ইহাকে বলে Organum, জার্মান ও ইংরেজী প্রতিশব্দ হইল Organ এবং বাংলা ভাষায় ইহার প্রতিশব্দ হইল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বা দেহান্ত্র। অঙ্গ প্রত্যঙ্গসমূহ যেমন চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা প্রভৃতি। অভিধানগত অর্থ করিলে অর্গানন শব্দের অর্থ দাঁড়ায় 'Independent part of body which performs special functions', অর্থাৎ দেহস্থ বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যাহা সুনির্দিষ্ট কর্ম সম্পাদন করিয়া থাকে তাহাকেই অর্গানন বলে।
অর্গানন অব মেডিসিন বলিতে বুঝায় যে সমস্ত অঙ্গ, অংশ অথবা সূত্র চিকিৎসাশাস্ত্রের নির্দিষ্ট কতকগুলি কাজকে নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করিতে সঠিক নির্দেশ দান করে তাহাকে অর্গানন অফ মেডিসিন বলে। অন্য কথায় বলিতে গেলে যে সকল আদেশ, উপদেশ ও কার্যপদ্ধতি একটি সুনির্দিষ্ট নীতিতে রোগীর আরোগ্য সাধন এবং রোগীকে স্বাস্থ্যে পুনঃস্থাপন করিয়া থাকে সে সকল আদেশ, উপদেশ ও কার্য পদ্ধতিকে একত্রিমভাবে অর্গানন অফ মেডিসিন বলা হয়।
গ্রীসের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক Aristotle তাঁহার যুক্তিশাস্ত্রের নাম রাখেন Organon যাহার অর্থ হইল Instrument of thought বা চিন্তা যন্ত্র। অর্থাৎ ইহা হইল বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক গবেষণার ধারাবাহিক নীতিমালামূলক ও নিয়মের একটি পদ্ধতি। মহাত্মা হ্যানিমান হোমিওপ্যাথির এই সংবিধান গ্রন্থে এরিষ্টটলের Organon শব্দটি একই অর্থে হুবহু ব্যবহার করিয়াছেন। হোমিওপ্যাথির অর্গানন গ্রন্থে ২৯১ টি সূত্র আছে।
প্রশ্ন- অর্গানন হোমিওপ্যাথির পরম দিশারী বা অর্গাননকে হোমিওপ্যাথিক সংবিধান বলা হয় কেন?
উত্তর: হোমিওপ্যাথির নিয়মনীতির উৎপত্তি স্থল হইল অর্গানন। ইহাকে হোমিও শাস্ত্রের বেদান্তও বলা যায়। বেদান্ত শাস্ত্রে অধিকার থাকিলে যেমনি প্রতিটি বিষয়ের প্রকৃত তত্ত্ব উপলব্ধি করা যায়, তেমনি অর্গানন ভালভাবে জ্ঞাত হইলে * হোমিওপ্যাথির তত্ত্ব ও তথ্যাদি সম্বন্ধে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। হোমিওবিজ্ঞানে অর্গানন এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়া থাকে। যে চিকিৎসক অর্গাননের উপর যতটুকু দক্ষতা ও পারদর্শিতা অর্জন করিতে পারিবেন, চিকিৎসা বিদ্যায় তিনি ততই সাফল্য লাভ করিবেন। পীড়া কি, মানবদেহে কিভাবে ইহা সংক্রমিত হইয়া মানুষের দেহমনে বিভিন্ন লক্ষণের সৃষ্টি হয়, ঔষধ কি, কিভাবে ঔষধ আরোগ্য কার্য সম্পাদন করে, মানসিক ও দৈহিক কোন লক্ষণে কোন সুনির্দিষ্ট ঔষধ প্রয়োগ করা যাইবে, কতক্ষণ পর পর ঔষধ প্রয়োগ করা যাইবে, পরবর্তী ঔষধ কখন কিভাবে প্রয়োগ হইবে আরোগ্যের পথে প্রতিবন্ধকতাসমূহ কি কি, কিভাবে ঐ সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করা যাইবে ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ের আলোচনা অর্গানন গ্রন্থে আছে। তাই বলা যায় অর্গানন হোমিওপ্যাথির পরম দিশারী বা ইহাকে হোমিওপ্যাথিক সংবিধান বলাই যুক্তিযুক্ত।
প্রশ্ন- অর্গানন অফ মেডিসিন পাঠের প্রয়োজনীয়তা কি?
বা, যখন একজন চিকিৎসক মেটিরিয়া মেডিকার উপর নির্ভর করিয়া ঔষধ নির্বাচন করিতে সক্ষম তখন অর্গানন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কি?
উত্তর: চিকিৎসা শাস্ত্রে বিশেষতঃ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শাস্ত্রে মহাত্মা হ্যানিমান' কর্তৃক লিখিত অর্গানন অব মেডিসিনের গুরুত্ব অপরিসীম। মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ যেমন চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা জিহ্বা প্রভৃতি ছাড়া যেমন মানবদেহ অর্থহীন, তেমনি অর্গানন অব মেডিসিন ছাড়া চিকিৎসা শাস্ত্র মূল্যহীন। অর্গানন পাঠে দেখা যায় ইহাতে আছে চিকিৎসকের দায়িত্ব ও কর্তব্য, চিকিৎসার পদ্ধতি, রোগী পরীক্ষার পদ্ধতি, রোগীকে প্রশ্ন করার পদ্ধতি, রোগের প্রকার ভেদ, জীবনীশক্তির পরিচয়, মানসিক রোগ সৃষ্টির কারণ, সোরা, সিফিলিস ও সাইকোসিসের (ত্রিদোষের) উৎপত্তি ও বিকাশ, একসাথে কয়টি ঔষধ প্রয়োগ করিতে হইবে, ঔষধের প্রয়োগের মাত্রা, ভুল ঔষধ প্রয়োগের পর করনীয় বিষয়, ঔষধ প্রস্তুত প্রণালী, পথ্যাপথ্য প্রভৃতি অবশ্য প্রয়োজনীয় বিষয়াবলী। উক্ত বিষয়সমূহ সম্বন্ধে যদি কোন চিকিৎসক অবহিত না হন, তাহা হইলে চিকিৎসা কার্য সম্পাদন তাহার পক্ষে সম্ভবপর নয়। অর্থাৎ উক্ত বিষয়াবলী সম্বন্ধে সুস্পষ্ট জ্ঞান না থাকিলে তিনি চিকিৎসক পদবাচ্য নহেন। আর এত সব প্রয়োজনীয় বিষয়গুলি একমাত্র অর্গাননের মধ্যেই বিদ্যমান।
অনেক চিকিৎসক অর্গাননের উপর বিশেষ নজর না দিয়া শুধু মাত্র মেটিরিয়া মেডিকা সাহায্যে চিকিৎসা করিয়া থাকেন। মেটিরিয়া মেডিকা একটি ঔষধ কোষমাত্র। ইহাতে ঔষধের পরিচয় পাওয়া যায় বটে কিন্তু ইহার পরীক্ষা নীরিক্ষা, শক্তি বিকাশ ও তত্ত্ব সদৃশ লক্ষণ ভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, রোগ ও রোগী সম্পর্কিত ধারণাসহ উপরোল্লেখিত অর্গাননের বিষয়বস্তু কিছুই মেটিরিয়া মেডিকায় পাওয়া যায় না। মেটিরিয়া মেডিকা পাঠ করিয়া ঔষধ সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন হইবে সন্দেহ নাই, কিন্তু চিকিৎসা সম্বন্ধে কিছুই জানা জানা যাইবে না। অথচ চিকিৎসার নিয়ম নীতি জানা না। থাকিলে পূর্ণ চিকিৎসা হওয়া কিছুতেই সম্ভবপর নয়। হোমিওপ্যাথি উন্নয়নমূখী চিকিৎসা। ইহার উন্নয়ন, উন্নতি, সবকিছুই অর্গানন শিক্ষার উপর নির্ভর করে। অতএব আদর্শ চিকিৎসক হইতে হইলে শুধু মেটিরিয়া মেডিকার জ্ঞান দিয়া ঔষধ নির্বাচন করিলেই চলিবে না। প্রকৃত আরোগ্য ও রোগী চিকিৎসার জন্য অর্গানন শিক্ষা একান্তই অপরিহার্য।
প্রশ্ন- অর্গাননকে প্রধানত কয়টি অংশে ভাগ করা হইয়াছে এবং কি কি?
উত্তর: অর্গাননকে প্রধানতঃ দুই অংশে ভাগ করা হইয়াছে। যথা- ১) আরোগ্য বিজ্ঞান ও ২) আরোগ্য কলা।
আরোগ্য বিজ্ঞান: অর্গাননের এই অংশকে সিদ্ধান্ত পর্ব বলা হয়। ১ হইতে ৭১ নং সূত্রকে আরোগ্য বিজ্ঞান বলা হয়। এই অংশে চিকিৎসকের কর্তব্য, আবশ্যকীয় গুণাবলী, জীবনীশক্তির পরিচয়, প্রাকৃতিক আরোগ্য নীতি, সদৃশ ও বিসদৃশ বিধানের পার্থক্য, ঔষধের আরোগ্যকারী শক্তি প্রভৃতি আলোচনা করিয়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হইয়াছে।
আরোগ্য কলা: অর্গাননের ৭২ নং হইতে ২৯১ নং সূত্রকে আরোগ্য কলা বলে।
এই অংশে স্পীড়ার শ্রেণী বিভাগ, চিররোগ ও অচিররোগ আরোগ্য প্রণালী, রোগলক্ষণ, রোগীলিপি প্রণালী, ঔষধের মাত্রা নিরূপণ, ঔষধ প্রয়োগ প্রণালী, ঔষধ প্রস্তুত প্রণালী, মানসিক ব্যাধি ও উহার চিকিৎসা, পীড়ার হ্রাস বৃদ্ধি, পথ্যাপথ্য, ঔষধ প্রয়োগের উপযুক্ত সময় প্রভৃতি আলোচনা করা হইয়াছে।
প্রশ্ন- অর্গানন সহজে আয়ত্ব করার কৌশল আলোচনা বাদ।
উত্তর: অর্গাননের বিষয়বস্তু সহজে ও অল্প আয়াসে হৃদয়ঙ্গম ও আয়ত্ব করা অত্যন্ত কঠিন। অর্গাননের বিষয়বস্তু যতই জটিল হোক, ইহাকে ভালভাবে হৃদয়ঙ্গম করা প্রয়োজন। বিষয়বস্তুর উপর অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও সুগভীর ধারণা রাখা উচিত। এই জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে অল্প আয়াসে আয়ত্ব করিতে হইলে নিম্নলিখিত কৌশল অবলম্বন করিতে হইবে।
১) অর্গাননের ৬ষ্ঠ সংস্করণে মোট ২৯১টি সূত্র অন্তর্ভূক্ত রহিয়াছে। সূত্রগুলিকে পৃথক পৃথকভাবে মনে রাখার চেষ্টা না করিয়া বরং সমস্ত বইটির বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপে মনে রাখার চেষ্টা করিতে হইবে।
২) প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, পাশাপাশি অবস্থিত অনেক সূত্রেই মোটামুটিভাবে একই বিষয় সম্বন্ধে আলোচনা করা হইয়াছে। সূত্র হিসাবে মনে না রাখিয়া বিষয়বস্তুর প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া হৃদয়ঙ্গম করিতে হইবে।
৩) বিষয়বস্তুর প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া সমস্ত বইটিকে ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামে ভাগ করিয়া নেওয়া উত্তম। অর্গাননের শিরোনামসমূহকে নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করিয়া লইতে হইবে। যেমন-ক) চিকিৎসকের কর্তব্য, খ) রোগীলিপি প্রণালী, গ) রোগ সম্বন্ধে ধারণা, ঘ) আরোগ্যের শর্ত, ঙ) জীবনীশক্তি, চ) আরোগ্যনীতি, ছ) হোমিওপ্যাথি ও এলোপ্যাথির পার্থক্য, জ) রোগীলিপি প্রণালী, ঝ) ঔষধ প্রস্তুত প্রণালী, ঞ) মাত্রা নিরূপণ, ট) মানসিক পীড়া, ঠ) পথ্যাপথ্য, ড) ঔষধ প্রয়োগের উপযুক্ত সময় প্রভৃতি।
৪) প্রতিটি সূত্র পাঠ করার পর সেই সূত্রে কি বলা হইয়াছে সে সম্পর্কে অন্ততঃ ১০/১৫ মিনিট গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত। তবেই ইহার বিষয়বস্তু ভালভাবে হৃদয়ঙ্গম হইবে।
প্রশ্ন- অর্গানন অব মেডিসিনের প্রকাশকাল এবং বিভিন্ন সংস্করণের ইহার নামকরণের পার্থক্য লিখ।
বা, বিভিন্ন নাম পত্রে অর্গাননের টাইটেল পরিবর্তন আলোচনা কর।
বা, হ্যানিমানের জীবদ্দশায় অর্গানন কিভাবে ক্রমান্বয়ে বিকাশ লাভ করে?
উত্তর: এ যাবত ডাক্তার হ্যানিমানের যুগান্তকারী হোমিও মহাগ্রন্থ 'অর্গাননের'
ছয়টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। অর্গানন গ্রন্থের বিভিন্ন সংস্করণের প্রকাশকাল, প্রকাশের স্থান, নাম শিরোনাম ও সূত্র সংখ্যা নিম্নরূপ-
চিকিৎসাপদ্ধতির বিশেষ করিয়া হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাপদ্ধতির বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা হইল 'অর্গানন অফ মেডিসিন'। হ্যানিমান তাঁহার জীবদ্দশাতেই মাত্র ৩২ বৎসরের মধ্যে হোমিওপ্যাথিকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে যতটা সম্ভব বিকশিত ও গতিশীল। করার জন্য অর্গাননের বার বার সংস্কার সাধন করিয়াছেন। কিন্তু নানা কারণে অর্গানন ৬ষ্ঠ বা শেষ সংস্করণ হ্যানিমানের মৃত্যুর (১৮৪৩) ৭৮ বৎসর পর ১৯২১ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। প্রথম সংস্করণে এই গ্রন্থের নাম ছিল 'অর্গানন অব দি র্যাশনাল হিলিং সায়েন্স' ইহার বাংলা অর্থ করিলে দাঁড়ায় 'যুক্তি সঙ্গত আরোগ্য বিজ্ঞানের সংবিধান গ্রন্থ'। এখানে আরোগ্য বিজ্ঞানের পূর্বে যুক্তি সঙ্গত (Rational) কথাটি যোগ হইল কেন এর উত্তরে বলা যায় তদানীন্তন সমাজে একমাত্র প্রতিষ্ঠিত আরোগ্য বিজ্ঞান ছিল এলোপ্যাথিক, হ্যানিমান এলোপ্যাথিক বড় ডাক্তার হইয়াও লক্ষ্য করেন যে এলোপ্যাথিক আরোগ্য বিজ্ঞান অনিয়মতান্ত্রিক ও যুক্তিহীন। তাই বহুদিনের সাধনার ফল যুক্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক হোমিওপ্যাথিক আরোগ্য বিজ্ঞানের পূর্বে Rational কথাটি সংযোগ করিয়া তখনকার দিনের প্রচলিত অন্যান্য আরোগ্য বিজ্ঞানকে অযৌক্তিক প্রমাণ করাই একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল। গ্রন্থখানার দ্বিতীয় সংস্করণের সহিত পার্থক্য এই যে প্রথম সংস্করণের Rational কথাটি বা দিয়া Science কথাটির পরিবর্তন করিয়া Art কথাটি যুক্ত করেন। দ্বিতীয় সংস্করণের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করিতে গেলে বলিতে হয় গ্রন্থের শিরোনাম সাধারণতঃ সংক্ষিপ্ত হওয়াই উচিত। তাই বৃহৎ নামটিকে দ্বিতীয় সংস্করণের সুন্দরভাবে সংক্ষেপ করেন। তবে Rational কথাটি বাদ দেওয়ার কারণ হিসাবে বলা যায় ১৮১০ খৃঃ হইতে ১৮১৯ খৃঃ পর্যন্ত এই নয় বৎসরে হোমিওপ্যাথিক আরোগ্য বিজ্ঞান সত্য বলিয়া অনেকটা প্রমাণিত হইয়াছে এবং প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে। আরোগ্য কার্যে এবং বাস্তবে যাহা যুক্তিসঙ্গত তাহাকে বার বার যুক্তিসঙ্গত বা Rational না, বলাই ভাল। তাই দ্বিতীয় সংস্করণের শিরোনাম হইতে Rational শব্দটি বাদ দেওয়া অযৌক্তিক হয় নাই। দ্বিতীয়তঃ Healing Science এর পরিবর্তে Healing Art বলিলেন কেন? উত্তরে বলা যায় Science শব্দটির অর্থ হইল বিজ্ঞান। অর্থাৎ পরীক্ষার মাধ্যমে সত্য বলিয়া প্রমানিত বিশেষ জ্ঞান। এই জ্ঞান Theoretical ও হইতে পারে আবার Practical ও হইতে পারে। শুধু Science বা বিজ্ঞান শব্দ দিয়া ইহা Practical বা প্রয়োগমুখী কিনা তাহা বুঝানো সম্ভব নয়, Art শব্দটির অর্থ হইল কলাকৌশল। এখানে গঠন, পাঠন ও অভ্যাস সব কিছুরই প্রয়োজন আছে। Art কথাটির দ্বারা এই আরোগ্য বিজ্ঞানটি যে শুধু Theoretical নয় এবং ইহা যে বাস্তব ও প্রয়োগমুখী আরোগ্য বিজ্ঞান তাহাই প্রমাণিত হয়। কাজেই তাঁহার এই নামকরণটি আরও যথার্থ ও যুক্তিপূর্ণ হইয়াছে। ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম সংস্করণেও এই নামকরণটি বহাল রাখা হয়। ৬ষ্ঠ সংস্করণে ইহার নামকরণের পরিবর্তন সাধন করিয়া 'অর্গানন অব মেডিসিন' নাম প্রয়োগ করেন। Healing Art এর পরিবর্তে এখানে হ্যানিমান Medicine নামটি ব্যবহার করেন। Organon of medicine নামটি যেমন শ্রুতি মধুর তেমনি সংক্ষিপ্ত। বাংলা অর্থ করিলে দাঁড়ায় 'চিকিৎসা বিজ্ঞানের সংবিধান গ্রন্থ' এখানে চিকিৎসাবিজ্ঞান (Medicine) বলিতে একটি আরোগ্যকারী বাস্তবধর্মী প্রয়োগমুখী ও যুক্তিসঙ্গত বিজ্ঞান বুঝিয়া থাকি। Healing Art শব্দ দুইটির পরিপূর্ণ অর্থ Medicine শব্দ দ্বারা প্রকাশিত হইতেছে। একমাত্র বৈজ্ঞানিক যুক্তিসম্পন্ন ও বিজ্ঞান ভিত্তিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলিতে হোমিওপ্যাথিকেই বুঝানো হইয়াছে এবং হ্যানিমান ইহাকে Organon of Medicine বলিতে কুণ্ঠিত হন নাই।
প্রশ্ন- 'অর্গানন অব মেডিসিন' ও 'অর্গানন অব হোমিওপ্যাথি'র মধ্যে পার্থক্য কি?
উত্তর: অর্গানন অব মেডিসিন ও অর্গানন অব হোমিওপ্যাথির মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নাই। যদি কেহ অর্গানন অব মেডিসিন এর পরিবর্তে অর্গানন অব হোমিওপ্যাথি বলেন তাহাতে দোষের কিছু নাই। তবে মহাত্মা হ্যানিমান বহু চিন্তা ভাবনা করিয়াই ইহার নাম দিয়েছেন 'অর্গানন অব মেডিসিন'। একমাত্র বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও আরোগ্য বিজ্ঞান বলিতে তিনি হোমিওপ্যাথিকেই বুঝাইয়াছেন। তাই হ্যানিমান ইহার নাম দিয়াছেন 'অর্গানন অব মেডিসিন'। অর্গানন অব হোমিওপ্যাথি বলিলে হোমিওপ্যাথির মহত্ব ও বিরাটত্ব ম্লান হইয়া যায় এবং অপরাপর চিকিৎসা বিজ্ঞানকেও বিজ্ঞানভিত্তিক বলিয়া স্বীকার করিয়া লওয়া হয়।
প্রশ্ন- কখন কাহার দ্বারা অর্গানন অব মেডিসিনের ষষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশিত হয়?
উত্তর: অর্গানন অব মেডিসিনের ষষ্ঠ সংস্করণের পাণ্ডুলিপি তৈরি হয় ১৮৪২ খৃষ্টাব্দে। ১৮৪৩ খ্রীষ্টাব্দে হ্যানিমান মৃত্যুবরণ করেন। হ্যানিমানের জীবদ্দশায় ষষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশিত হয় নাই। এই ষষ্ঠ সংস্করণের পাণ্ডুলিপি প্রথমবার ফ্রাঙ্কো প্রুসিয়ান যুদ্ধের সময় ১৮৭০-৭১ সালে এবং দ্বিতীয় বার ১৮৯৪-১৯১৮ সালের বিশ্বযুদ্ধের সময় হারাইয়া যাওয়ার উপক্রম হয়।
গ্রন্থখানা জার্মান ভাষায় ১৯২০ সালে ডাঃ আর হেল কর্তৃক এবং ১৯২১ সালে আমেরিকা হইতে ডাঃ উইলিয়াম বোরিক কর্তৃক ইংরেজী ভাষায় অনুবাদ করিয়া ইহা প্রকাশিত হয়।
প্রশ্ন- অর্গাননের ৫ম ও ৬ষ্ঠ সংস্করণের মধ্যে পার্থক্য কি?
উত্তর: কোন পুস্তকের সংস্করণ বলিতে বাস্তবতার আলোকে পুস্তকটির বিষয়বস্তুর উৎকর্ষ সাধনের জন্য কিছু কিছু পরিবর্তন, পরিবর্ধন প্রভৃতি বুঝায়। আমরা সকলেই জানি হোমিওপ্যাথির আবিষ্কারক হ্যানিমান ১৮৩৩ সালে তাঁহার জার্মানের কোথেনে অবস্থানকালে অর্গানন ৫ম সংস্করণ সমাপ্ত করেন। আর ইহার দশ বছর পর ১৮৪২ সালে ৬ষ্ঠ সংস্করণের পাণ্ডুলিপি সমাপ্ত করিয়াছেন। তখন তিনি ফ্রান্সের প্যারী নগরীতে গবেষণা ও চিকিৎসারত ছিলেন। আমরা আরও জানি ১৮২৯ সালে অর্গানন ৪র্থ সংস্করণের পর মাত্র ৪ বৎসরের গবেষণা ও অভিজ্ঞতা দিয়া ১৮৩৩ সালে হ্যানিমানকে অর্গানন ৫ম সংস্করণ সমাপ্ত করিতে হইয়াছিল। কিন্তু ৬ষ্ঠ সংস্করণের ক্ষেত্রে তিনি সুদীর্ঘ ১০ বছর সময় পান, তাঁহার আরও পরিণত বয়সে ইহার সাথে যুক্ত হইয়াছে তাঁহার সারা জীবনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা লব্ধ বিরাট অভিজ্ঞতা। অর্গাননের ৫ম সংস্করণের প্রকাশ এবং ৬ষ্ঠ সংস্করণের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতের মাঝখানে সময়ের এই ব্যবধানে মহাত্মা হ্যানিমান তাঁহার একাগ্র সাধনা, গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতায় বহু নতুন তথ্য ও তত্বের আলোকেই ৫ম সংস্করণের অনেক অংশ পরিবর্তন করেন এবং নতুন তথ্য যোগ করেন। কাজেই দুইটি সংস্করণের মধ্যে যে পার্থক্য বিদ্যমান তাহা সকলেরই জানা দরকার। নিম্নে অর্গাননের ৫ম ও ৬ষ্ঠ সংস্করণের পার্থক্যসমূহ সংক্ষেপে বর্ণনা করা হইল।
১. অর্গাননের ৫ম সংস্করণের সূত্র ছিল ২৯৪টি, কিন্তু ৬ষ্ঠ সংস্করণে সূত্র সংখ্যা ২৯১টি। সুতরাং ৫ম সংস্করণ থেকে ৬ষ্ঠ সংস্করণে ৩টি সূত্র কম।
২.. ৫ম সংস্করণে গ্রন্থখানার নাম ছিল 'অর্গানন অফ হিলিং আর্ট' ৬ষ্ঠ সংস্করণে
এর নাম হয় 'অর্গানন অব মেডিসিন'।
৩. ৫ম সংস্করণে ঔষধ প্রস্তুতের জন্য দশমিক ও শততমিক রীতির উল্লেখ করা হইয়াছে। আর ৬ষ্ঠ সংস্করণে উক্ত দুইরীতি ছাড়াও পঞ্চাশ সহস্রতমিক রীতিকে নূতনভাবে সংযোজন করা হইয়াছে।
৪. ৫ম সংস্করণে শততমিক শক্তির ঔষধ প্রয়োগের পর যে ঔষধজনিত প্রচণ্ড অনভিপ্রেত বৃদ্ধি দেখা যাইত, ৬ষ্ঠ সংস্করণে পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির ঔষধ যথাযথ ক্ষুদ্রতম মাত্রায় প্রয়োগ করা গেলে সেইরূপ মারাত্মক বৃদ্ধির কোন ভয় নাই।
৫. ৫ম সংস্করণের ২৯১ নং সূত্রে ঔষধের ক্রিয়া গ্রহণে উপযোগী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্বন্ধে আলোচনা হইয়াছিল। ৬ষ্ঠ সংস্করণে হ্যানিমান সেইখানে পানি ও স্নানের উপযোগীতা সম্বন্ধে আলোচনা করিয়াছেন।
৬. ৫ম সংস্করণের ২৯০ নং সূত্রের বক্তব্য ৬ষ্ঠ সংস্করণের ২৮৪ নং সূত্রে পেশ করা হইয়াছে।
৭. ঔষধের ক্রিয়া গ্রহণ উপযোগী অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্বন্ধে ২৮৯ নং সূত্র ৬ষ্ঠ সংস্কর। বাতিল করিয়া দিয়া সেইখানে ৫ম সংস্করণের ২৯৪ নং সূত্রের মেসমেরিজমবিষয়ক বক্তব্যকেই উহার পাদটীকাসহ উপস্থাপিত করিয়াছেন।
৮. হোমিওপ্যাথিক ঔষধ মানব শরীরে স্নায়ুমণ্ডলীর মাধ্যমে কিভাবে দ্রুততম সময়ে কার্যকরী হয় সে সম্বন্ধীয় ৫ম সংস্করণের ২৮৮ নং সূত্র বাতিল করিয়া ৬ষ্ঠ সংস্করণে ৫ম সংস্করণের ২৯৩ সূত্রটির মেসমেরিজম সম্বন্ধীয় বক্তব্য? পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত, পরিমার্জিত আকারে পেশ করা হইয়াছে।
৯. ৫ম সংস্করণের ২৮৭ নং সূত্র ঔষধের মাত্রাবিষয়ক ছিল। ৬ষ্ঠ সংস্করণে তা বাতিল করিয়া নূতনভাবে লিপিবদ্ধ করা হইয়াছে।
১০. শততমিক ঔষধের মাত্রার পরিমাণ সম্পর্কিত ৫ম সংস্করণের ২৮৬ নং সূত্র বাতিল করিয়া হ্যানিমান উহাকে নূতনভাবে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন।
১১. ঔষধের মাত্রা সম্পর্কিত ৫ম সংস্করণের ২৮৫ নং সূত্র বাতিল করিয়া ৬ষ্ঠ সংস্করণের হ্যানিম্যান নূতনভাবে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। ২৮৫ নং সূত্র যেমন বাতিল, তার আগেকার পাদটীকাও বাতিল। এ পাদটীকার উপর একটি উপ-পাদটীকা আছে তাও নূতন।
১২. ঔষধের মাত্রা সম্বন্ধীয় ৫ম সংস্করণের ২৮৪ নং সূত্র একদম বাতিল করিয়া ৬ষ্ঠ সংস্করণে নূতন বক্তব্য সংযোজিত করা হইয়াছে। এই সূত্রের উপর একটি নূতন পাদটীকাযুক্ত হইয়াছে।
১৩. ৫ম সংস্করণের ২৮৩ নং সূত্র বাতিল করিয়া ৬ষ্ঠ সংস্করণে নূতনভাবে লেখা হইয়াছে।
১৪. ৫ম সংস্করণের ২৮২ নং সূত্র বাতিল করিয়া ৬ষ্ঠ সংস্করণে নূতনভাবে
লিপিবদ্ধ করা হইয়াছে। ৫ম সংস্করণে এই সূত্রে পাদটীকা ছিল না। ৬ষ্ঠ সংস্করণে একটি দীর্ঘ অথচ গুরুত্বপূর্ণ পাদটীকা একবারে নূতনভাবে যুক্ত করা হইয়াছে। পূর্বের সংস্করণের বর্ণিত সোরা, সিফিলিস, সাইকোসিস প্রভৃতি চিররোগের চিকিৎসা সম্বন্ধে উপদেশসমূহ এখানে তিনি সম্পূর্ণ পরিবর্তন করিয়াছেন।
১৫. এই সূত্রে রোগী পর্যবেক্ষণ সম্বন্ধে হ্যানিমান নূতব বক্তব্য রাখিয়াছেন। ৫০ সহস্রতমিক ঔষধের দ্বারা চিকিৎসার ক্ষেত্রে হ্যানিমানের এই সূত্রের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সূত্রে 'হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি' কে বাতিল করিয়া 'ঔষধজ রোগ' বলা হইয়াছে।
১৬. ৫ম সংস্করণের ২৮০ সূত্রে মাত্রার ক্ষুদ্রতা সম্বন্ধে যে বক্তব্য তিনি রাখিয়াছেন ৬ষ্ঠ সংস্করণে এই সূত্রে এই নূতন অংশে তা আরও পরিচ্ছন্নভাবে উপস্থাপন করিয়াছেন।
প্রশ্ন- অর্গানন রচিত না হইলে হোমিওজগতে কি কি অসুবিধা বা সমস্যা সৃষ্টি হইত?
উত্তর : অর্গানন হোমিও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ এবং মহাত্মা হ্যানিমানের সর্বাপেক্ষা মহৎ অবদান। অর্গানন হোমিওপ্যাথির পরম দিশারী। কাণ্ডারীবিহীন তরী যেমন ইন্সিত লক্ষ্যে পৌঁছিতে পারে না, ভুল পথে পরিচালিত হয়, তেমনি অর্গানন রচিত না হইলে হোমিওপ্যাথি সঠিক পথে পরিচালিত হইত না, ভুল পথে পরিচালিত হইয়া লুপ্ত' হইয়া যাইত। অর্গাননে চিকিৎসকের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, চিকিৎসকের জ্ঞাতব্য বিষয়, আদর্শ আরোগ্যের শর্তাবলী, রোগ নিরাময়ে জ্ঞাতব্য বিষয়, ঔষধ সম্পর্কে জ্ঞান, ঔষধ প্রস্তুত প্রণালী, ঔষধ প্রয়োগ প্রণালী, মাত্রানীতি প্রভৃতি লিপিবদ্ধ আছে বলিয়া বিশ্বের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক একই নিয়ম অনুসরণ করিতে পারেন। তাহা না হইলে ভিন্ন ভিন্ন চিকিৎসক ভিন্ন ভিন্ন মনগড়া নিয়মে পরিচালিত হইতেন। ফলে আদর্শ আরোগ্য পদ্ধতি চিরতরে বিলীন হইয়া যাইত।
প্রশ্ন- অর্গাননের উপর আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তা আছে কি?
উত্তর: হোমিওপ্যাথি একটি চিরন্তন সত্য ও সর্বজন স্বীকৃত চিকিৎসা পদ্ধতি। ইহাই একমাত্র চিকিৎসা পদ্ধতি যাহা একটি সুনির্দিষ্ট নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। একবিংশ শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে আসিয়া আজ স্বাভাবিক কারণে প্রশ্ন জাগে হ্যানিম্যান কর্তৃক লিখিত অর্গাননের উপর আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে কি? এই প্রশ্নের উত্তর সেওয়ার পূর্বে হ্যানিমানের জীবদ্দশাতেই অর্গাননের বিভিন্ন সংস্করণ সম্বন্ধে সাম্যে আলোচনা করা প্রয়োজন। ১৮১০ খৃষ্টাব্দে অর্গানন ১ম সংস্করণ প্রকাশিত হয়, যাহার সূত্র সংখ্যা ২৫৯। দ্বিতীয় সংস্করণ ১৭১৯ খৃষ্টাব্দে, ৩য় সংস্করণ ১৮২৪ খৃষ্টাব্দে, ৪র্থ সংস্করণ ১৮২৯ খৃষ্টাব্দে, ৫ম সংস্করণ ১৮৩৩ খৃষ্টাব্দে এবং ৬ষ্ঠ সংস্করণের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত হয় ১৮৪২ খৃষ্টাব্দে। অর্থাৎ ১৮১০ হইতে ১৮৪২ এই ৩৩ বৎসর সময়ের মধ্যেই ইহার ছয়টি সংস্করণ প্রকাশের প্রয়োজন হইয়া পড়ে। ইহার একমাত্র কারণ প্রতিটি সংস্করণের পরবর্তী গবেষণা লব্ধ ফল ও বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়াছে যে পূর্ববর্তী সংস্করণে অনেক অপূর্ণাঙ্গ তথ্য এমনকি ভুল তথ্যও সন্নিবেশিত হইয়াছে। তাই প্রকৃত তত্ত্ব ও তথ্যের আলোকে পূর্ববর্তী সংস্করণের অনেক পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জনের প্রয়োজন হইয়া পড়িয়াছে।
অর্গাননের ৬ষ্ঠ সংস্করণের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত হইয়াছিল ১৮৪২ খৃষ্টাব্দে। আজ হইতে ১৬২ বৎসর পূর্বে। হোমিওপ্যাথি আবিষ্কর্তা হ্যানিমানের জীবদ্দশাতেই গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ নতুন তথ্য ও তত্বের আলোকে মাত্র ৩৩ বৎসরের মধ্যে যে বইটি ৬টি সংস্করণের প্রয়োজন হইয়াছিল, পরবর্তী ১৬২ বৎসর সময়ের মধ্যে ইহার আরও কয়েকটি সংস্করণের প্রয়োজন হইত; কিন্তু পরিতাপের বিষয় হ্যানিমানের মৃত্যুর পর অর্গাননের উপর সূক্ষ্মতর গবেষণারও মৃত্যু ঘটিয়াছে। মহাত্মা হ্যানিমান জীবিত থাকিলে হয়ত ইহার আরও কয়েকটি সংস্করণ প্রকাশিত হইত। এমন হইতে পারে মহাত্মা হ্যানিমান যে সকল বিষয়কে সত্য বলিয়া নির্দেশ করিয়া গিয়াছেন আধুনিক গবেষণা তার দুই একটিকে অপূর্ণাঙ্গ ভুল বলিয়া প্রমাণ করিতেও পারে অথবা আধুনিক গবেষণা হয়ত হ্যানিমানের সূত্রগুলির সাথে আরও নতুন তথ্য ও তত্ত্ব যোগ করিতে পারে; দিতে পারে হোমিও চিকিৎসার আরও সহজ ও সরল পথের নির্দেশ। কাহারও সুদীর্ঘকালের বাস্তব অভিজ্ঞতায় যদি দেখা যায় যে, মহাত্মা হ্যানিমানের অর্গাননের কোন একটি নির্দেশকে একটু পরিবর্তন করিয়া চিকিৎসা পদ্ধতিকে আরও সফল করা যায় তবে সেই অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞানকে বাদ দিয়া অর্গাননের সেই পুরাতন নির্দেশকে আঁকড়াইয়া ধরার কোন সার্থকতা নাই। অর্থাৎ মহাত্মা হ্যানিমান লিখিত অর্গাননের পথ ধরিয়া আরও সূক্ষ্মতর আধুনিক গবেষণার যথেষ্ট প্রয়োজনীয়তা আছে।
0 মন্তব্যসমূহ