চিকিৎসকের উদ্দেশ্য - অর্গানন অব মেডিসিন - প্রথম বর্ষ

 চিকিৎসকের উদ্দেশ্য
(Aim of Physician)
অর্গাননের সূত্রসমূহ (১-৫)





সূত্র-১
চিকিৎসকের একমাত্র মহৎ উদ্দেশ্য
রোগীকে পুনরায় স্বাস্থ্যে আনয়ন করা এবং রোগীর আরোগ্য সাধনই হইল চিকিৎসকের মহৎ এবং একমাত্র উদ্দেশ্য।

সূত্র-২
আদর্শ আরোগ্যের শর্তসমূহ
১) অচিরে, ২) নিরুপদ্রবে, ৩) স্থায়ীভাবে, ৪) স্বাস্থ্যের পুনঃপ্রবর্তন অথবা সর্বাপেক্ষা সরল, বিশ্বাসযোগ্য ও অনিষ্টবিহীন প্রথায় সম্পূর্ণভাবে এবং ৫) সহজবোধ্য বিধানমতে রোগের দূরীকরণ বা ধ্বংস সাধন, আরোগ্যের সর্বোচ্চ আদর্শ।

সূত্র-৩
চিকিৎসাকার্যে পারদর্শী হইবার জন্য চিকিৎসকের গুণাবলী
ক) রোগ হইলে কি আরোগ্য করিতে হইবে, তাহা চিকিৎসককে ভালভাবে বুঝিতে হইবে, অর্থাৎ যে রোগ যে লক্ষণ দ্বারা সূচিত হয় সেই লক্ষণগুলি সম্বন্ধে তাঁহার জানা থাকিতে হইবে রোগ সম্বন্ধে বিশেষ জ্ঞান ও অভিজ্ঞান। খ) কোন ঔষধের কোন কোন লক্ষণ দ্বারা তাহার রোগ দূর করার শক্তি প্রকাশিত হয়, যদি তিনি তাহা পরিষ্কারভাবে বুঝিতে পারেন এবং গ) যাহা রোগীর নিঃসন্দেহে অসুস্থতার কারণ বলিয়া স্থির করিয়াছেন, তাহার সহিত প্রকৃষ্টরূপে নির্দিষ্ট নিয়মানুসারে ঔষধের আরোগ্যকারী শক্তিকে এমনভাবে সাজাইতে পারেন, যাহা দ্বারা রোগ নিরাময় অর্থাৎ ১) ঔষধকে ইহার ক্রিয়াপ্রণালী অনুসারে উপস্থিত রোগের সর্বাপেক্ষা উপযোগী করিয়া প্রয়োগ করিতে ২) সঠিক প্রস্তুত প্রণালী ৩) উপযুক্ত মাত্রা এবং ৪) প্রথম প্রয়োগ ও প্রয়োজন হইলে পুনঃপ্রয়োগের উপযুক্ত সময় জানা ৫) আরোগ্য বিষয় যে সকল বাধা দেখা দেয় তাহা এমনভাবে দূর করা যায় যেন পূনঃপ্রবর্তিত স্বাস্থ্য চিরস্থায়ী হয় প্রভৃতি বিষয়গুলি জানা থাকিলে অহাকে প্রকৃত আরোগ্য কৌশলজ্ঞ চিকিৎসক বলা যায়।
 
সূত্র-৪
প্রকৃত স্বাস্থ্য সংরক্ষক চিকিৎসক
যে সকল বস্তু স্বাস্থ্য ভঙ্গ করিয়া রোগ উৎপাদন করে তাহাদের এবং কি প্রকারে সুস্থ ব্যক্তিদের নিকট হইতে ঐ সকল দূরীভূত করিতে হয়, তাহা যদি চিকিৎসকের জানা থাকে, তবেই তিনি একজন স্বাস্থ্যের রক্ষক।

সূত্র-৫
রোগারোগ্যের জন্য চিকিৎসকের রোগের কারণ সম্পর্কিত জ্ঞান
চিররোগ হোক আর অচির রোগ হোক সব রোগ আরোগ্যের ক্ষেত্রে চিকিৎসককে রোগের প্রধান কারণসমূহ বাহির করিতে হইবে। সেজন্য অচির রোগের উত্তেজক কারণসমূহ এবং চিররোগের পূর্ণ ইতিহাস শুনিয়া উহা হইতে বিশেষ লক্ষণগুলি বাহির করিতে হইবে। ঐ সমস্ত প্রধান কারণগুলি চিররোগের উৎপাদিকা শক্তি। এইসব বিষয় অনুসন্ধান করিবার জন্য রোগীর শারিরীক গঠন, তাহার মানসিক ও চরিত্রগত বিশেষত্বসমূহ, রোগীর জীবিকা, তাহার বাসস্থান, বেশভূষা, সামাজিক ও গার্হস্থ্য তথ্য, দাম্পত্য ক্রিয়া প্রভৃতি সমস্ত বিষয় বিবেচনা করিতে হইবে। 

সম্ভাব্য প্রশ্নাবলী

প্রশ্ন- চিকিৎসকের প্রধান উদ্দেশ্য বা একমাত্র ব্রত কি? বা, অর্গাননের প্রথম সূত্রটি লিখ ও ব্যখ্যা কর।
উত্তর: মহাত্মা হ্যানিমান অর্গাননের প্রথম সূত্রেই বলেন-'The high and only mission of the physician is to restore the sike to health, to cure as it is termed', অর্থাৎ রোগীকে পূর্বস্বাস্থ্যে ফিরাইয়া আনা তথা রোগীর আরোগ্য সাধনই চিকিৎসকের মহৎ ও একমাত্র উদ্দেশ্য।
সূত্রটি সংক্ষিপ্ত হইলেও ইহার অর্থ ব্যাপক। এইখানে Mission, Restore এবং Cure এই তিনটি শব্দের তাৎপর্য জানা প্রয়োজন। Mission শব্দের অর্থ এইখানে লক্ষ্য, ইহা মহান পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ ব্রত। চিকিৎসা কার্যকে পেশা হিসাবে গণ্য করিলেও ইহা Mission এর মতই পবিত্র। Restore বলিতে বুঝি পুনঃস্থাপন। অর্থাৎ যে স্বাস্থ্য রোগীর নষ্ট হইয়াছে ঐ হৃত স্বাস্থ্যে পুনঃস্থাপিত করা। Cure বলিতে আরোগ্য বুঝায়।
অতএব এইখানে মহাত্মা হ্যানিমান চিকিৎসকের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তাঁহার মনোভাব ব্যক্ত করিয়াছেন। রোগীকে নীরোগ করাই চিকিৎসক জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। রোগকাতর মানুষ চিকিৎসকের নিকট আসে সাহায্যের জন্য, রোগযন্ত্রণা হইতে মুক্তি পাইবার জন্য। প্রথমতঃ রোগীর কষ্টের নিরাময় বিধান করা প্রয়োজন। চিকিৎসাবৃত্তি এক মহান ব্রত। যে কোন উপায় অবলম্বন করিয়া যদি মানুষের অমূল্যজীবন রক্ষা করা যায়, মানুষের জীবনে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা আনয়ন করা যায় তাহা অবলম্বন করা প্রকৃত চিকিৎসকের পবিত্র কর্তব্য। রোগীকে সম্পূর্ণ নীরোগ করিতে হইবে, শুধুমাত্র দুই একটি কষ্টকর রোগলক্ষণ দূর করিলে চলিবে না। অর্থাৎ যে পর্যন্ত না রোগী তাহার যে স্বাস্থ্য নষ্ট হইয়াছে উহা ফিরিয়া পায় সে পর্যন্ত বুঝিতে হইবে যে, রোগী নীরোগ হয় নাই। অনেক সময় তীব্র কোন যন্ত্রণা লাঘব হইলেই আমরা মনে করি 'রোগ সারিয়াছে' কিন্তু সার্বিকভাবে রোগী সুস্থ হইয়াছে কিনা তাহা দেখি না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় কোন রোগীর হয়ত জ্বর হইয়াছে 'কিন্তু জ্বরগ্রস্ত রোগীর শুধু গাত্রোত্তাপ নিরসনই চিকিৎসকের উদ্দেশ্য হইতে পারে না। জ্বর নিরসনের পর যদি রোগীর স্বাভাবিক অনুভূতি না থাকে, মুখে বিস্বাদ থাকে, কোষ্ঠ অপরিষ্কার থাকে, বা তরল ভেদ হয়, মাথা ঘোরা, কানে ভোঁ ভোঁ করা প্রভৃতি থাকে, ক্ষুধা না থাকে, ঘুম না থাকে তাহা হইলে জ্বর সারিলেও রোগী এইক্ষেত্রে নীরোগ হয় নাই। চিকিৎসার ফলে যদি রোগীর ভগ্নস্বাস্থ্যই জোড়া না লাগিল তবে আরোগ্যের ভান করা বৃথা। এইরূপ অসার চিকিৎসা প্রতারণার সামিল। এইরূপ ব্যর্থ চিকিৎসা পেশাদারী মাত্র। হ্যানিমান চিকিৎসকগণকে পেশাদারী না হইয়া সেবক হিসেবে চিকিৎসার মহানব্রত সাধনে উদ্বুদ্ধ হওয়ার উপদেশ দিয়াছেন। এইক্ষেত্রে ঔষধ প্রয়োগের পর জ্বর উপশমের সাথে সাথে আরোগ্যপ্রাপ্ত রোগীর মনে প্রফুল্লতা বৃদ্ধি পাইলে, রোগীর ক্ষুধা বৃদ্ধি পাইলে, কোষ্ঠ পরিষ্কার হইলে, সুনিদ্রা হইলে, অর্থাৎ পূর্বের স্বাভাবিক সুস্থাবস্থায় ফিরিয়া আসিলে চিকিৎসকের দায়িত্ব সম্পন্ন হইয়াছে এবং আদর্শ আরোগ্য সাধিত হইয়াছে বুঝিতে হইবে। অনেক সময় এইরূপ দেখা যায় যে, রোগী তথাকথিত আরোগ্য লাভ করিয়া দুঃখের সহিত প্রকাশ করে, এইরূপ অবস্থা অপেক্ষা তাহার জ্বর ভাল ছিল। ইহার দ্বারা স্পষ্টই প্রমাণিত হইতেছে রোগীকে যদি ঔষধ প্রয়োগ করিয়া পূর্বের ন্যায় সুস্থ না করা যায় তবে আরোগ্য সাধিত হইল না এবং রোগীকে পূর্ণরূপে নীরোগ করিতে না পারিলে চিকিৎসকের উদ্দেশ্যও সাধিত হইল না। আরোগ্যের এই সংজ্ঞা দ্বারাই হোমিওপ্যাথি ও অন্যান্য চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রভেদ বুঝা যায়। অতএব রোগীর সুস্থতা সার্বিকভাবে দূরীভূত করিয়া স্বাস্থ্যের পুনঃপ্রবর্তন করাই চিকিৎসকের মহৎ এবং একমাত্র উদ্দেশ্য, ইহা ছাড়া মহত্তর করণীয় আর কিছুই নাই।





প্রশ্ন- চিকিৎসাকে পেশা না বলিয়া জীবনের মহান উদ্দেশ্য বা কর্তব্য বলা হইল কেন?
উত্তর: সচরাচর চিকিৎসকগণ চিকিৎসাকে পেশা হিসাবে গণ্য করেন। অন্যান্য দশটি পেশার মত চিকিৎসা কর্মও একটি পেশা। পেশার বশবর্তী হইয়া মানুষ দুর্নীতি, লোভ-লালসায় নিজেকে ভাসাইয়া দেয়, চরিত্রহীন ও দায়িত্ব-জ্ঞানহীন হইয়া পড়ে, নীতিহীন হইয়া অসৎ আচরণে লিপ্ত হয়। কিন্তু মহান চিকিৎসা কর্মকে তাই সাধারণ পেশা হিসাবে কিছুতেই গণ্য করা যাইবে না।
রোগকাতর মানুষ চিকিৎসকের নিকট আসে রোগযন্ত্রণা হইতে মুক্তি পাইবার জন্য। রোগে মানুষের স্বাস্থ্য বিকৃত হয়, জীবন হয় বিপন্ন। রোগীর জীবন-মরণ চিকিৎসকের হাতেই ন্যস্ত। রোগমুক্তি, স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধার সবকিছুই নির্ভর করে চিকিৎসকের উপর। একজন পীড়িত ব্যক্তি রোগযন্ত্রণা হইতে মুক্তি পাইবার জন্য সর্বস্ব বিক্রী করিতেও পিছ-পা হয় না। চিকিৎসা পেশায় তাই অর্থ উপার্জন করা মোটামুটি সহজ। রোগ হইতে মুক্তির পরিবর্তে রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলিয়া পড়িতেছে আর, এদিকে শুধু পেশার দ্বাবা প্রচুর অর্থ উপার্জন হইতেছে এইরূপ শোচনীয় অবস্থায় হ্যানিমান শুধু নীরব দর্শক হইয়া থাকিতে পারেন নাই। সেজন্য চিকিৎসক জীবনের মহান কর্তব্য ও উদ্দেশ্য কি হইবে সে সম্পর্কে সুষ্পষ্ট অভিমত ব‍্যক্ত করেন।
প্রাচীনপন্থী চিকিৎসকগণ বিসূদশ চিকিৎসা দ্বারা রোগের চাপা দেওয়া ও জীবনীশক্তি নিঃশেষ করা ছাড়া আর কিছুই করিতে পারেন নাই। হ্যানিমান তাই সদৃশনীতির দ্বারা সত্যিকার আরোগ্যসাধন করিয়া দেখাইলেন যে রোগী পুনরায় তাহার হারানো স্বাস্থ্য ফিরিয়া পায়। চিকিৎসার ফলে যদি রোগী পূর্বের স্বাস্থ্যই ফিরিয়া না পায় তাহা হইলে আরোগ্যের ভান করা বৃথা। স্বাস্থ্যের পুনঃস্থাপনই প্রকৃত আরোগ্যের পরিচায়ক। চাপা দেওয়া অবস্থাকে বা কোন একটি বিশেষ উপসর্গ বা কষ্ট দূর করাকে আরোগ্য বলা যায় না, এইরূপ অসার চিকিৎসা প্রতারণামাত্র। ইহা পেশাদারী ব্যর্থ চিকিৎসা। পেশা হিসাবে গণ্য করিলে এই ব্যর্থ চিকিৎসায় নিযুক্ত থাকা যায়। কিন্তু হ্যানিমান চিকিৎসককে পেশাদারী না হইয়া সেবক রূপে চিকিৎসার মহান ব্রত পালনে উপদেশ দিয়াছেন। রোগীকে প্রকৃতভাবে নীরোগ করা এবং তাহার হারানো স্বাস্থ্য পুনঃস্থাপন করাই চিকিৎসকের একমাত্র সহান উদ্দেশ্য। সেজন্যই চিকিৎসাকে হ্যানিমান পেশা না বলিয়া জীবনের মহান উদ্দেশ্য বা কর্তব্য হিসাবে আখ্যায়িত করিয়াছেন।





প্রশ্ন-  পীড়িতকে তাহার পূর্বস্বাস্থ্যে প্রতিষ্ঠিত করিবার অর্থ কি? বা, স্বাস্থ্য পুনঃসংস্থাপনের অর্থ কি?
উত্তর: রোগীকে নীরোগ করা এবং রোগীর যে স্বাস্থ্য নষ্ট হইয়াছে ঐ হৃত স্বাস্থ্যে পুনঃস্থাপিত করাই চিকিৎসক জীবনের একমাত্র ব্রত। যখন পীড়ার উৎপত্তি হয়, তখন দেহ ও মনে নানাবিধ লক্ষণ প্রকাশিত হয়। রোগীকে সম্পূর্ণ নীরোগ করিতে হইবে। শুধুমাত্র দুই একটি কষ্টকর রোগলক্ষণ দূর করিলে চলিবে না। যদি এমন চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় যে উহাতে লক্ষণের আংশিক উপশম হয় তবে সেই চিকিৎসা আদর্শ চিকিৎসা নয়। যে পর্যন্ত রোগী তাহার যে স্বাস্থ্য নষ্ট হইয়াছে উহা ফিরিয়া না পায় সে পর্যন্ত বুঝিতে হইবে যে রোগী নীরোগ হয় নাই। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় কোন রোগীর জ্বর ঔষধে ভাল হইয়াছে অর্থাৎ গাত্রতাপ কমিয়াছে কিন্তু মুখে বিস্বাদ, কোষ্ঠকাঠিন্য, ক্ষুধাহীনতা, তরল ভেদ, অনিদ্রা, মাথাঘোরা, কান ভোঁ ভোঁ করা প্রভৃতি

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ